একজন চামিন্দা ভাস!

নিজের নামকে সারা বিশ্বে আলোকিত করার জন্য কি প্রয়োজন? অবশ্যই এমন কিছু করে দেখাতে হবে যাতে করে পুরো পৃথিবীর মানুষ তাঁকে স্মরন করেন। আচ্ছা এমন যদি হয় শুধু মাত্র নাম দিয়েই নামী-দামি হওয়া যায়! তাহলে ব্যাপারটা কেমন হয়? অদ্ভুত মনে হয় কি? আচ্ছা এমন একজনের কথা বলি তাহলে। উনার পুরো নাম লিখতে অর্ধ শতকের উপর ক্যারেক্টারের প্রয়োজন হয়, ইনফ্যাক্ট ৫২ টি বর্ণমালা প্রয়োজন উনার নাম লিখতে। পুরো নাম Warnakulasuriya Patabendige Ushantha Joseph Chaminda Vaas। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নামের খেলোয়াড় যে তিনিই। যদিও এই নামের জন্যই উনি বিখ্যাত নন! ক্রিকেটে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্যই স্মরণীয় হয়ে আছেন ভাস।

যদিও ক্রিকেটার হবার কোন স্বপ্নই ছিল না তাঁর। ক্যাথলিক ধর্মের অনুসারী ভাসের ইচ্ছা ছিল পাদ্রী হবার। ঈশ্বরের ইচ্ছা অবশ্য ছিল ভিন্ন। চার্চের প্রিস্ট হিসাবে নয় বাইশ গজের প্রিস্ট হিসাবেই ভাসকে দেখতে চেয়েছিলেন ঈশ্বর। গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভাস বলেছিলেন, “I seriously considered going into the priesthood, which would have meant 12 to 14 years of study, but cricket began to take over.” আমাদের ভাগ্য সুস্প্রসন্ন ছিল যে চার্চের প্রিস্ট নয় ক্রিকেট ফিল্ডের প্রিস্টকেই আমরা দেখেছিলাম। চার্চের নিয়ন্ত্রিত জীবন আর ক্রিকেট ফিল্ডে ভাসের নিয়ন্ত্রিত বোলিং এ অবশ্য সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়াই যায়।

টেস্ট ক্রিকেট কিংবা ওয়ান ডে দুই ফরম্যাটেই নিয়ন্ত্রিত বোলিং এর জন্য বিখ্যাত ছিলেন তিনি। উইকেটের দুই দিকেই সুইং এবং পারফেক্ট ইয়র্কার এর জন্য ভয়ঙ্কর রূপে আবির্ভূত হতেন ব্যাটসম্যানদের জন্য। ওয়ান ডে ক্রিকেটে বেস্ট বোলিং ফিগার এর রেকর্ডও তাঁর দখলেই। যদিও এই রেকর্ড এর জন্য মূল ক্রেডিট ক্রিকেটার ভাস নাকি স্বামী ভাসকে দেয়া যায়, তা নিয়ে তর্ক বিতর্ক হতেই পারে! ৮ ই ডিসেম্বর ভাসের জীবন সঙ্গিনীর জন্মদিন। ২০০১ এর সালের সেই দিনেই জিম্বাবুয়ের সাথে ম্যাচ খেলতে হবে ভাসকে। ম্যাচের আগের রাতেই ভাসের স্ত্রীর আল্টিমেটাম, যে করেই হোক স্ত্রীর জন্মদিনে তাঁকে অধিক সময় স্ত্রীর সঙ্গেই কাঁটাতে হবে। ভাসের উপর আবদার ছিল ৭ উইকেট নিয়ে দ্রুত ম্যাচ যেন শেষ করে নেয়া যায়। স্ত্রীর আবদার রক্ষা করতে আর স্ত্রীকে জন্মদিনের বিশেষ উপহার দিতেই ভাস মনে হয় সেদিন নেমেছিলেন কলোম্বোতে। ৮ ওভার বল করে ৩ মেডেন ১৯ রান দিয়ে নিলেন ৮ উইকেট। মাত্র ৩৮ রানে অল আউট জিম্বাবুয়ে।

ভাস আসলে জেই সময়টাতে খেলেছেন সেই সময়ে প্রায় প্রতিটি দলেই রয়েছে তারকার ছড়াছড়ি। টেস্টে ৩৫৫ এবং ওয়ায়ন ডে তে ৪০০ উইকেট নিয়েও পাদপ্রদীপের মূল আলোটা নিজের উপর আনতে পারেন নি তিনি। নিজের দলেই যে মুরালি নামক আর এক মহা তারকা তাঁর সাথেই খেলছেন। পাদপ্রদীপের মূল আলো তাঁর উপর না থাকলেও নিজের কাজটা কিন্তু ঠিকই করে গেছেন তিনি। ওয়ান ডে ক্রিকেটে ইনিংসের প্রথম তিন বলে তিন উইকেট নেয়ার একমাত্র রেকর্ড তাঁর দখলেই। ২০০৩ সালে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে ইনিংসের শুরুতেই হ্যাট্রিক করেন এই লংকান। এই বিশ্বকাপে ২৩ উইকেট নিয়ে থাকেন উইকেট শিকারির তালিকার শীর্ষে।

ভাসের একটি বিষয় অন্য সকল বোলারদের থেকে একটু আলাদা করে রেখেছে তাঁকে। ভাসের অধিকাংশ উইকেট ছিল টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। ইনিংসের শুরুতেই আঘাত হানতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি। বিশ্বের নামী দামি ব্যাটসম্যানরা ছিল আক্রমণের মূল লক্ষ্য। শচিন-শোয়েবের লড়াইটা যেভাবে মিডিয়া কভার পেয়েছে, সেভাবে অবশ্য শচিন-ভাসের লড়াইটা আসে নি। যদিও এই লড়াইটা ছিল অনেক উপভোগ্য। ওয়ান ডে ক্রিকেটে ৪৯ বার এর লড়াইতে ৯ বার ভাস আউট করেন শচিনকে। শচিনের ক্যারিয়ারে এর চেয়ে বেশি বার আর কোন বোলারের বলে আউট হন নি তিনি। হার্শেল গিবস আর ক্রিস গেইল তো ভাসের সামনে অসহায় আত্ম সমর্পণ ছাড়া আর কিছুই করতে পারেন নি। গিবস এবং গেইল ৭ বার শুন্য রানে ফিরে গেছেন ভাসের বলে। ভাসের সামনে গিবসের এভারেজ ২.৩৩ রান আর গেইলের মাত্র ৬.৫০।

নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মাত্র এক ম্যাচের জন্য অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেন তিনি, যদিও সেই ম্যাচে পরাজিত হয় শ্রীলংকা। এক ম্যাচের অধিনায়কত্বের পাশাপাশি একটি মাত্র সেঞ্চুরিও রয়েছে তাঁর ক্যারিয়ারে। ২০০৭ সালে নিজের ৯৭ তম টেস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব দেখান তিনি। ১৯৭৪ সালের আজকের এই দিনেই জন্ম নেন ক্রিকেটের এই মহা তারকা। শুভ জন্মদিন চামিন্দা ভাস।

Leave a Reply