একজন দুর্ভাগা ফ্যানের গল্প!

স্মৃতির পাতাটা একটু উলটোই…

২০১৪ জিম্বাবুয়ে সিরিজ। শেষ ওয়ানডেতে একটা ব্যাটসম্যান এর অভিষেক, সৌম্য সরকার নাম। ভাবলাম সিরিজ জিতে গেছি তাই এক্সপেরিমেন্ট আর কি। চমকে গেলাম কিছুদিন পর, যখন বিশ্বকাপের দলে তার নাম দেখলাম। আজব তো! একটা ওয়ানডে খেলা একজনকে বিশ্বকাপে! ফাইজলামি নাকি! হার্ডহিটার নাকি, আচ্ছা চান্স তো পাইবোই না, হুদাই পানি টানতে নিছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম প্রথম ম্যাচেই প্রথম একাদশে। ওই ম্যাচে স্টেপ ডাউন করে বিশাল এক ছক্কা মারলেন এক আফগান পেসার কে।

মানুষ বলে তারা সৌম্যের ফ্যান হয়েছে পাকিস্তানের সাথে সেই দুর্দান্ত পাকিস্তানি বোলিং ছাড়খাড় করা সেঞ্চুরি দেখে। কেউবা বলে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে সেই দুই অসাধারণ ৮৮ আর ৯০ দেখে। আমি নিতান্তই নিম্নশ্রেণীর মানুষ, আমি আফগানিস্তানের সাথে ওই স্টেপডাউন করে মারা একটা ছয়তেই ফ্যান হয়ে গেলাম!

এরপর শ্রীলংকার সাথে ব্যর্থ ই বলা যায়, স্কটল্যান্ড এর সাথেও, ইংল্যান্ড ম্যাচে ৪০ করলেন, নিউজিল্যান্ড ম্যাচে ফিফটি। কোয়ার্টার ফাইনালে খুব বেশী কিছু না। এতদিন ওয়ান ডাউনে খেলতেন। পাকিস্তান দেশে আসছে, সৌম্য এবার ওপেন করবেন! করলেন। যেন জুলিয়াস সিজার, এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। ভারত সিরিজে মুস্তাফিজে ঢাকা পড়ে যেন একটু রেগে গেলেন।

সেটা ঢাললেন ও রুদ্রমূর্তিতেই, বলির পাঠা হলো দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের উপর। প্রথম ম্যাচে কাগিসো রাবাদা টাইগার ব্যাটিং লাইনআপ গুড়িয়ে দিলেন, পরের দুই ম্যাচে প্রোটিয়া বোলিং লাইনআপ কে এক কথায় চূর্ণবিচূর্ণ করে প্রতিশোধ নিলেন সৌম্য।

২০১৫ সালে, কাটার মাস্টার মুস্তাফিজে বুদ হয়ে গিয়েছে মানুষ। তাসকিনের গতিতে গতিদানব খুজে পেয়েছি, ইংলিশ বাঘদের হারিয়ে দেওয়া রুবেল হোসেনের ফ্যান ফলোয়ার হঠাৎ ভয়ংকর বৃদ্ধি। আর আমি পড়ে থাকলাম সেই সৌম্য কে নিয়ে, সেই টাইমিং নিয়ে। বিপিএল থেকেই ফর্মের অধঃপতন শুরু। মনে মনে বললাম, আরেহ! ব্যাপার না। এশিয়া কাপেই ফর্মে ফিরবে।

এশিয়া কাপ গেলো, বিশ্বকাপ গেলো, আফগানিস্তান সিরিজ গেলো। প্রতিটা ম্যাচের আগে আমি টিভির সামনে বসে উপরওয়ালার কাছে শুধু একটা কথা বলতাম, ” আল্লাহ প্লিজ! আজকে যেন সৌম্য রান পায়! ” পাননি। ইংল্যান্ডের সাথে যখন ড্রপড হলেন আমি তখন ভেতরে ভয়ংকর গতিতে অশ্রু ঝড়াচ্ছি, নিম্ন শ্রেণীর মানুষ বড় সহজেই কাঁদে!

শক্ত করে বললাম, বিপিএল দিয়ে দেখিয়ে দেবে সৌম্য, সে শেষ হয়নি।
বিপিএল শেষ হয়ে গেলো। সবচেয়ে খারাপ খেলোয়াড়দের তালিকায় সৌম্য..

তবুও নিউজিল্যান্ড সিরিজে ডাক পড়লো। আশা আবার জাগলো, সৌম্যের শক্তি গতি আর বাউন্সি বল খেলা। নিউজিল্যান্ড এ তো অভাব হবে না, সৌম্য ফিরবে নিশ্চয়ই!

একটা প্রস্তুতি ম্যাচে ২০ করলেন, আরেকটায় ৪০। আহ! ফিরছেন সৌম্য।

প্রথম ম্যাচের অপেক্ষায়। সৌম্য আজকে রান পাবে!

নামলেন, ৮ বলে ১ রান করে এক বাজে শটে আউট। এমন একটা বল, যেটা ২০১৫ তে মিডউইকেট বাউন্ডারি দিয়ে সীমানাছাড়া করেছেন।

ডায়েরির পাতা উল্টোনো শেষ…
বর্তমানে বসে আছি।

মোটামুটি নিশ্চিত যে সৌম্য আর পরের ম্যাচে খেলবে না। দলে ফিরতে অনেক কষ্ট করতে হবে, এই দলে জায়গার বড় দাম দাদা!

সবাই বলে দিয়েছে, সৌম্য ধূমকেতু। একটুর জন্য এসে জ্বলে যাওয়া নক্ষত্র। আর ফিরবে না সে, তাকে বের করে দেওয়াই সেরা সিদ্ধান্ত, দলের উপকারের জন্য। ব্যবসার যুগে সবাই বড় ব্যবসায়ী রে ভাই, লাভ লোকসানের গলি ঘুপচিতে আবেগের জায়গা নেই, পেশাদারীর একচ্ছত্র আধিপত্য!

আমিও জানি সৌম্য আর পরের ম্যাচে নামবে না, অন্য কেউ হয়তো নামবে, খেলবে, হয়ত ভালো, নয়ত খারাপ। কি আসে যায়? সৌম্য সরকার তো খেলবে না…

তবুও আমি বড্ড আশা নিয়ে, ভেজা চোখ নিয়ে বসে আছি, পরের ম্যাচটায় সৌম্যের নামটা একাদশে থাকবে, সৌম্য নেমে রানের তোড়ে সবাইকে, সব সমালোচনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের জন্য, আমার জন্য হলেও, ফর্মে ফিরবে সে।

জানি হবে না, তবুও…..
নিম্নশ্রেণীর দুর্ভাগা ফ্যান তো,
তাই বড় বেশীই আশা করে যাই!

Leave a Reply