ক্রুশিয়াল ম্যাচ – সর্বকালের সেরা নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ মানদন্ড – দ্বিতীয় পর্বঃ

 

১.
আগের পর্বে একটা সূত্র উল্লেখ করা ছিল। সেটা নিয়ে পরে ব্যাখ্যা করি।
গত পর্বে পোষ্ট করার পর একটা প্রশ্ন এসেছিল। ‘ক্রুশ্যাল ম্যাচে স্কোর করা নাকি অর্ডিনারি ম্যাচে রেগুলার প্লেমেকিং’ – কোনটা বেশি মূল্যবান? প্রশ্নের মূল বক্তব্য আমি যতদূর বুঝে থাকি তা হচ্ছে ধারাবাহিকতা বেশী মূল্যবান নাকি অনেক ম্যাচ খারাপ করে শুধু ক্রুশিয়াল ম্যাচে ভালো করা বেশী ভালো? এই প্রসঙ্গে কিছু বলি।
২.
আগে ক্রিকেট দিয়ে কিছু উত্তর দেই। অনেকেই বলতে চাচ্ছেন ক্রিকেট আর ফুটবল এক নয়। কথাটা সত্য, দুই খেলার মাঝে অনেক ব্যবধান। কিন্তু এখানে খেলা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না, আলোচনা হচ্ছে প্রেক্ষাপট নিয়ে যা কিনা সব খেলা এমনকি জীবনের সাথেও রিলেট করা যায়। যাই হোক, শুরু করি। প্রথমে দল নিয়ে বলি।
১৯৯২ বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল কোনটি? নিউজল্যান্ড, গ্রুপ পর্বে মাত্র ১ টা ম্যাচে হারে। সবচেয়ে অধারাবাহিক দল কোনটা? পাকিস্তান, অনেকটা ভাগ্যের জোড়েই সেমিতে উঠেছে। ভাগ্য বললাম এই কারণে যে ইংল্যান্ডের সাথে গ্রুপ ম্যাচে ৭৪ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তান। বৃষ্টির জন্য সেই ম্যাচটা পন্ড হয়ে যাওয়ায় ১ পয়েন্ট পায় পাকিস্তান।কিন্তু সেমিতে অসাধারণ একটা ম্যাচ ইনজামাম এর ক্রেডিটে জিতে গিয়ে পরে ফাইনালেও জিতে যায় পাকিস্তান। পুরো টুর্নামেন্টে ৯ ম্যাচ খেলে নিউজিল্যন্ড জিতে ৭ ম্যাচ, হারে ২ টি ম্যাচে; সফলতার হার ৭৭.৭৭%। ১০ ম্যাচ খেলে পাকিস্তান জেতে ৬ ম্যাচ, হেরে যায় ৩ ম্যাচে আর পরিত্যক্ত হয় ১ টি ম্যাচ; সফলতার হার ৬০% । কোন দল বেশি ধারাবাহিক কিন্তু কোন দল বেশি সফল?
১৯৯৬ বিশ্বকাপের কথা একটু শুনি। ওয়েষ্ট ইন্ডিজ গ্রুপের ৫ ম্যাচে জয় পায় মাত্র ২ টিতে। কেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটাতেও হেরে যায়। অন্যদিকে অপরগ্রুপের সাউথ আফ্রিকা ৫ ম্যাচের ৫ টিতেই জিতে কোয়ার্টারে আসে। সেই ম্যাচে খুড়িয়ে খুড়িয়ে আসা উইন্ডিজের সাথে হেরে যায়।
২০০৭ বিশ্বকাপের কথা একটু শুনি। সেই বিশ্বকাপে সব কয়টা ম্যাচ জিতে টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন হয় অষ্ট্রেলিয়া।
এখন আপনারাই বলুন কোনটা ভালো?
1. গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক ভাবে ভালো খেলে নক আউটে হেরে যাওয়া। ( ১৯৯২ বিশ্বকাপের নিউজিল্যান্ড, ১৯৯৬ বিশ্বকাপের সাউথ আফ্রিকা)।
2. গ্রুপ পর্বে কোন রকমে পার হয়ে নক আউটে ভালো খেলা। ( ১৯৯২ বিশ্বকাপের পাকিস্তান।)
3. পুরো টুর্নামেন্টেই ভালো খেলা। ( যেমন ২০০৭ বিশ্বকাপের অস্ট্রেলিয়া।)
কোন দল যদি পুরো টুর্নামেন্টেই ভালো খেলে তাহলে কোন সমস্যা নেই কিন্তু কেউ যদি অসময়ে দূর্দান্ত খেলে সময়মতো হোচট খায় তাহলে সমস্যা।
আমার মতে ২০০৭ এর অষ্ট্রেলিয়া > ১৯৯২ এর পাকিস্তান > ১৯৯৬ এর উইন্ডিজ > ১৯৯২ এর নিউজিল্যান্ড/১৯৯৬ এর সাউথ আফ্রিকা।
আপনাদের কার কি মত তা আপনারা ভালো বলতে পারবেন।
৩.
দলের কথা তো শুনলাম, এবার কিছু ইন্ডিভিজুয়াল খেলোয়াড়ের কথা শোনা যাক।
১৯৯৬ বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু করি। ব্যটসম্যানের প্রসঙ্গে আসি। সাউথ আফ্রিকার ওপেনার গ্যারি ক্রিস্টেন আর উইন্ডিজের ব্রায়ান লারা – এই দুজনের মাঝে কে সফল?
গ্যরি ক্রিস্টেনের স্কোর গুলো লক্ষ করুন।
#গ্রুপপর্বঃ
• আরব আমিরাত – অপরাজিত ১৮৮।
• নিউজিল্যান্ড – ৩৫।
• ইংল্যান্ড – ৩৮।
• পাকিস্তান – ৪৪।
• নেদারল্যান্ড – ৮৩।
#কোয়ার্টার_ফাইনালঃ
• উইন্ডিজ – ৩।
রায়ান লারা স্কোরগুলো লক্ষ করুন।
#গ্রুপপর্বঃ
• জিম্বাবুয়ে – অপরাজিত ৪৩।
• ভারত – ২।
• কেনিয়া – ৮।
• অষ্ট্রেলিয়া – ৬০।
#কোয়ার্টার_ফাইনালঃ
• সাউথ আফ্রিকা – ১১১।
#সেমিফাইনালঃ
• অষ্ট্রেলিয়া – ৪৫।
দুই খেলোয়াড়ের মাঝে কে বেশি ধারাবাহিক? নিঃসন্দেহে ক্রিস্টেন, কিন্তু কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল দলের জন্য? আরেকটু বিস্তারিত ভাবে ব্যখ্যা করি। ৯৬ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ওয়েষ্ট ইন্ডিজের শুরুটা হয়েছিল খুব বাজে ভাবে। প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের সাথে জিতলেও ভারত আর কেনিয়ার সাথে ম্যাচ হেরে যায়। ম্যাচ হারাটাও খুব বড় বিষয় নয় কিন্তু ব্যটিং বিপর্যয়ে পড়ে দুই ম্যাচে রান করে মাত্র ১৭২ আর ৯৩। সেই সময় বিশ্বের সেরা ব্যটসম্যান ব্রায়ান লারা ( তখন উনিই ১ নম্বরে ছিলেন) দুই ম্যাচে করেন মাত্র ২ আর ৮ রান। নিরাপত্তাজনিত কারণে শ্রীলঙ্কায় যেতে না চাওয়ায় সেই ম্যাচটা পয়েন্ট হারায়। গ্রুপ পর্বের অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচটা তাই হয়ে যায় বাচা মরার লড়াই। সেই ম্যাচে ব্রায়ান লারা ৬০ রান করেন। কিন্তু সব কিছু ছাড়িয়ে যায় সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচটাতে।
সাউথ আফ্রিকা দল হিসেবে সেই টুর্নামেন্টে অসাধারণ খেলছিল। শুধু অপরাজিতভাবেই গ্রুপ থেকে উঠে আসে নি বরং প্রতিপক্ষকে সামান্যতম সুযোগও দেয়নি। স্বাগতিক শক্তিশালী পাকিস্তানের বিপক্ষে একপ্রকার হেসে খেলেই হারিয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে উইন্ডিজের বিপক্ষে সাউথ আফ্রিকা তাই ছিল নিরঙ্কুশ ফেভারিট। সেই ম্যাচে লারা করেন ৯৪ বলে ১১১ রান। এই রান করার পথে সিমকক্সের এক ওভারে পাচটি বাউন্ডারি মারেন। সেই ম্যাচ জেতার পরে সেমিতে অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও জয়ের পথেই ছিলেন। ২০৮ রানের টার্গেটের সেই ম্যাচেও লারা করেন ৪৫ রান। কিন্তু সেখানে আরেক গ্রেট শেন ওয়ার্ন ম্যাচটা বাচিয়ে নিয়ে যান। সেই গল্প একটু পরেই বলছি।
এখানে সাউথ আফ্রিকার ওপেনার গ্যারি ক্রিস্টেন ৬ ম্যাচে ৭৮.২০ গড়ে রান ৩৯১। আর ব্রায়ান লারার ৬ ম্যাচে রান ৫৩.৮০ গড়ে ২৬৯। এই দুজনের মাঝে কে ধারবাহিক আর কে সফল? সফলতার জন্য ধারাবাহিকতা অত্যাবশ্যক নয়, তবে কেউ যদি সফলতার সাথে সাথেও ধারাবাহিক হতে পারে তাহলে তাকে বাড়তি ক্রেডিট দিতেই হবে। কিন্তু সার জায়গায় ধারাবাহিক থেকে মূল জায়গায় ব্যর্থ হলে সমস্যা।
১৯৯৬ বিশ্বকাপের কথা বলি। সেই বিশ্বকাপে শেন ওয়ার্ন আর অনিল কুম্বলের মাঝে কে ধারবাহিক আর কে সফল?
অনিল কুম্বলের পারফর্মেন্স টা লক্ষ করুন।
#গ্রুপপর্বঃ
• কেনিয়া – ৩/২৮ (১০)।
• উইন্ডিজ – ৩/৩৫ (১০)।
• অষ্ট্রেলিয়া – ১/৪৭ (১০)।
• শ্রীলঙ্কা – ২/৩৯ (১০)।
• জিম্বাবুয়ে – ২/৩৩ (৯.৪)।
#কোয়ার্টার_ফাইনালঃ
• পাকিস্তান – ৩/৪৮ (১০)।
#সেমি_ফাইনালঃ
• শ্রীলঙ্কা – ১/৫১ (১০)।
শেন ওয়ার্নের পারফর্মেন্সটা একটু লক্ষ করুন।
#গ্রুপপর্বঃ
• কেনিয়া – ১/২৫ (১০)।
• ভারত – ১/২৮ (১০)।
• জিম্বাবুয়ে – ৪/৩৪ (৯.৩)।
• উইন্ডিজ – ০/৩০ (১০)।
#কোয়ার্টার_ফাইনালঃ
• নিউজিল্যান্ড – ২/৫২ (১০)।
#সেমি_ফাইনালঃ
• উইন্ডিজ – ৪/৩৬ (৯)।
#ফাইনালঃ
• শ্রীলঙ্কা – ০/৫৮ (১০)।
সেমিতে উইন্ডিজের আগ পর্যন্ত ধরা যায় ওয়ার্ন নিস্প্রভই ছিলেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সস্তা ৪ উইকেট বাদ দিলে বাকি চার ম্যাচে ৪ ম্যাচে ৩৩.৭৫ গড়ে ৪ উইকেট বিশ্বমানের একজন স্পিনারের জন্য বড় আসরে ব্যর্থতারই পরিচায়ক। কিন্তু নিজেকে ফিরে পাবার জন্য সম্ভবত অষ্ট্রেলিয়ার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনের দিনটাকেই বেছে নিয়েছিলেন।
সেমির সেই ম্যাচটাতে শুরু থেকেই আগুন জড়াচ্ছিলেন এমব্রোস আর বিশপ। ০ রানে ১ম, ৭ রানে ২য়, ৮ রানে ৩য় আর এক পর্যায়ে ১৫ রানেই ৪ উইকেট পড়ে যায় অষ্ট্রেলিয়ার। শেষ পর্যন্ত খুড়িয়ে খুড়িয়ে ২০৭ রান করতে পারে অষ্ট্রেলিয়া। ষষ্ঠ ওভারে ব্রাউনকে ফ্লিপারে আউট করে প্রথম ব্রেক থ্রু দেন ওয়ার্ন। গিবসন, জিমি অ্যাডামস আর বিশপ কে আউট করে ম্যান অব দি ম্যাচ হন ওয়ার্ন। ফাইনালে উঠতে পারবে না এমন ম্যাচে কম পুজি নিয়ে এমন অসাধারণ পারফর্মেন্স। তবে ফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছে বেদম মার খান। ধারণা করা হয় ডে নাইট ম্যাচে কুয়াশার কারণে বল গ্রীপ করতে সমস্যা হওয়ায় তার বোলিং খারাপ হয়েছিল। শুধুমাত্র এই কারণেই অষ্ট্রেলিয়ার কোচকে সেই টুর্নামেন্টের পর স্যাক করা হয় কারণ আগে লক্ষ করলে হয়ত রাতের বেলা প্র্যাকটিস টা করতে পারতো ।তবে শ্রীলঙ্কা সেদিন যেমন ডাকুটে ফর্মে আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তাতে কোন প্ল্যান তাদের দমাতে পারতো বলে মনে হয় না। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
এখন পুরো টুর্নামেন্টে কুম্বলের ৭ ম্যাচে ১৮.৭৩ গড়ে ১৫ উইকেট আর ওয়ার্নের ৭ ম্যাচে ২১.৯১ গড়ে ১২ উইকেটের মাঝে কোন পারফর্মেন্সটা ধারাবাহিক আর কোনটাকে সফল বলবেন?
১৯৯৬ এর কথা বাদ দেই, সেখানে তো তবুও ওয়ার্ন ফাইনাল হেরেছিলেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের কথাটা একটু দেখি। সেই বিশ্বকাপে পাকিস্তান আর নিউজিল্যান্ডের সাথে পরপর দুই ম্যাচ হেরে প্রায় বাতিলের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল অষ্ট্রেলিয়া। উইন্ডিজের সাথে মাষ্ট উইন ম্যাচে পান ১১ রানে ৩ উইকেট। মূল কাজটা অবশ্য ম্যাকগ্রা করেছিলেন (৫/১৪)। এরপরের ম্যাচ গুলোতে আবার ব্যর্থ। ইন্ডিয়ার সাথে ৬ ওভারে ৪৯ রান দিয়ে কোন উইকেট পাননি আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫৫ রানে ১ উইকেট। সুপার সিক্সের শেষ ম্যাচে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে স্টিভ ওয়াহ বললেন সেই ম্যাচের ট্রাম কার্ড ওয়াররন। কিন্তু ওয়ার্ন ৩৩ রানে ২ উইকেট পেলেও ম্যাচটা বাচালেন স্টিভই। কিন্তু ওয়ার্ন মনে হয় তার সেরাটা জমিয়ে রেখেছিলেন মূল সময়ের জন্য।
পোলক আর ডোনাল্ডের তোপে পড়ে সেমিতে আবারও অষ্ট্রেলিয়া ২১৩ রানে অল আউট। সেই বিশ্বকাপের আফ্রিকার মতো দলের জন্য এটা মামুলি টার্গেটই বলা চলে। ১২ ওভারে কোন উইকেট না হারিয়ে ৪৮ রান করে পথেই ছিল আফ্রিকা। কিন্তু এবারেও ব্রেক থ্রু দিলেন ওয়ার্ন। দারুন খেলতে থাকা গিবসকে ( ৩৬ বলে ৩০ রান) বোল্ড করলেন বড় টার্নে। পরের ওভারে ফিরিয়ে দিলেন ক্রিস্টেনকে। ক্রণিয়েকেও ফেরত পাঠালেন দুই বল পরেই। ৪৮ রানে ০ উইকেট থেকে ৫৩ রানে ৩ উইকেট, তিনটিই ওয়ার্নের। এরপর আবার ফিরে আসলেন যখন পোলক আর ক্যলিস আরেকটা বড় জুটি গড়ে ফেলেছিল। ক্যালিসকে ফিরিয়ে সেই জুটি ভাংলেন। ম্যাচে পেলেন ৪ উইকেট ২৯ রানে। ফাইনালে এবার আর কোন ভুল নয়। পাকিস্তানের বিপক্ষে পেলেন ৪ উইকেট। ১ম সাত ম্যাচে ১০ উইকেটের ব্যর্থতা ঢেকে গেল শেষ ক্রুশিয়াল ৩ ম্যাচের ১০ উইকেট।সেমি ফাইনাল আর ফাইনালের ম্যান অব দি ম্যাচ।
পুরো টুর্নামেন্টের ধারাবাহিক ভাবে ভালো খেলা অ্যালটের ( ৯ ম্যাচে ১৬.২৫ গড়ে ২০ উইকেট ) চেয়ে তুলনামূলক অধারাবাহিক ওয়ার্নকে কি সফল বলা যাবে না?
[ এখানে আরেকটা কথা, আমি কাউকে বলতে শুনিনি যে ওয়ার্ন কিংবা লারা গ্রুপের ম্যাচ গুলো ভালো খেললে তাদের দলকে এই ক্রুশিয়াল অবস্থায় পড়তে হতো না। দিন শেষে পরিস্থিতিটা ক্রুশিয়াল ছিল এবং তাদের পারফর্মেন্সকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ]

৪.
এবার আসি ফুটবলে।
১৯৯০ বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল ছিল ইতালী। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই জিতে, ২য় পর্বে উরুগুয়েকে আর কোয়ার্টারে আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে মুখোমুখি হয় খুড়িয়ে সেমিতে আসা আর্জেন্টিনার। সেমির আগ পর্যন্ত ইতালী ৫ ম্যাচে গোল করে ৭ টি, একটিও গোল খায় নি। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা গ্রুপের ৩ ম্যাচে মাত্র ১ টিতে জয় পায়, ১ টিতে হারে আর ১ টি ড্র হয়। ৩ গোল করে আর ২ গোল খেয়ে ৩য় হয়ে ২য় পর্বে উঠে।
২য় পর্বে হারায় আরেকটা ধারাবাহিক দল ব্রাজিলকে ( গ্রুপ পর্বে ৩ ম্যাচেই ৩ জয়)। কোয়ার্টারে যুগোস্লেভিয়াকে হারিয়ে সেমিতেও ইতালীকে হারায়।
১৯৯০ বিশ্বকাপে কোন দল ধারাবাহিক আর কোন দলকে সফল বলবেন?
২০০৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স গ্রুপ পর্ব থেকে উঠে খুড়িয়ে খুড়িয়ে। ৩ ম্যাচে ১ জয় আর দুই ড্র । গ্রুপ পর্বে ঠিক চেনা যাচ্ছিল না জিদানকে। কিন্তু নক আউটে এসে যেই জিদান নিজেকে ফেরত পেলেন তখন আবার অনেক ধারাবাহিক দলকে খুজে পাওয়া গেল না। ২য় পর্বে হারায় গ্রুপ পর্বে ৩ ম্যাচে ৮ গোল দিয়ে আর মাত্র ১ টি গোল খেয়ে তিনটিতেই জয় পাওয়া স্পেনকে । কোয়ার্টারে হারায় আগের চার ম্যাচের চারটিতেই জয় পাওয়া ব্রাজিলকে (পক্ষে ১০ গোল, বিপক্ষে ১ গোল)। সেমিতে হারায় আগের সব ম্যাচে ধারাবাহিকভাবে জয় পাওয়া পর্তুগালকে (পক্ষে ৬ গোল, বিপক্ষে ১ গোল)। ফ্রান্সের গ্রুপে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় কোন ম্যাচ না হারা সুইজারল্যান্ড। তারা দ্বিতীয় পর্বে হারে ১ ম্যাচে হারা ইউক্রেনের কাছে।
২০১৬ সালের অলিম্পিকের কথা মনে আছে? ব্রাজিলের গ্রুপে ছিল ডেনমার্ক, ইরাক আর সাউথ আফ্রিকার মতো দল। ইরাক আর সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে গোল বিহীন ড্র করার পর নেইমারের বিপক্ষে কেমন স্লোগান উঠেছিল সেটা নিশ্চয়ই মনে আছে। টুর্নামেন্টের পরের ম্যাচগুলোতে নেইমি জ্বলে উঠার পর আগের কথা কি কারো মনে আছে? ফাইনালটাই সবচেয়ে শক্ত ছিল। সেখানেও কিন্তু নেইমি একটা গোল করেছেন। এখন যদি এমন হতো গ্রুপ পর্বে দুই দলের সাথে হ্যাট্রিক করে ফাইনালে হেরে গেল তখন কোনটাকে ভালো বলতেন?
৫.
ধারাবাহিকতা একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস তবে এটাই সব কিছু নয়। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সঠিক সময়ে জ্বলে উঠা। যা কিনা অনেক গ্রেটরা করেছেন।
আপনি টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই বুঝতে পারবেন ঠিক কোন কাজ করলে স্পেশাল হওয়া সম্ভব? মনে করুন ২০১৭ সালের কনফেডারেশন কাপে কি কাজ করলে রনকে সফল বলা যাবে?
২০১৭ কনফেডারেশন কাপে রনের গ্রুপ পর্বে সঙ্গী হবে রাশিয়া, নিউজিল্যান্ড আর মেক্সিকো। এখান থেকে দুটি দল পরের পর্বে উঠবে। এই গ্রুপ থেকে পরের পর্বে যাওয়ার জন্য অন্তত মেক্সিকোকে হারাতে হবে। নিউজিল্যান্ডের সাথে রন না খেললেও পর্তুগালের জেতা উচিত। রাশিয়া খারাপ দল না, তার উপর স্বাগতিক। ধরে নেই রাশিয়াই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হবে। পর্তুগাল দ্বিতীয় হলে পরের রাউন্ডে সেমিতে মুখোমুখি হবে সেই গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন জার্মানীর সাথে। অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে এখানে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন চিলিও হতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে ধরে নেই জার্মানীই হবে। এই ম্যাচটাই পর্তুগালের জন্য সবচেয়ে ক্রুশিয়াল হবে।
রন কখনোই মেসির মতো ধারাবাহিক পারফর্মার নয়। সে এই টুর্নামেন্টে ৫ টা ম্যাচ থাকলে সর্বোচ্চ ২ টা ম্যাচে ভালো খেলবে, ১ টাতে অ্যাভারেজ আর ২ টাতে জঘন্য।
যদি মেক্সিকো আর জার্মানীর সাথে ভালো খেলে দলকে জেতায় তাহলেই বলা যাবে সে ভালো খেলেছে। চিলির সাথে সেমিতে পড়লে অ্যাভারেজ খেললেও ফাইনালে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু জার্মানীর সাথে ভালো খেললেও ফাইনাল জেতা টাফ। আবার জার্মানী এখন পর্যন্ত কনফেডারেশন কাপ জিততে পারেনি। জার্মানীও মরণ কামড় দেবে।
এখন যদি এমন হয় যে রন নিউজিল্যান্ডের সাথে হ্যাট্রিক আর মেক্সিকোর সাথে ২ গোল করে সেমিতে এসে জার্মানীর সাথে গোল করতে পারলো না আর দল হেরে বাদ পরলো তাহলে তাকে কি সফল বলা যাবে? তার ফ্যানরা বলতে পারে ৫ গোল করার পরেও একজনকে অসফল কেন বলা হচ্ছে? দলের বাকি খেলোয়াড়েরা ভালো করতে না পারলে সে একা কি করবে? কিন্তু আমার দেখায় অনেক গ্রেট খেলোয়াড়েরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের জন্য নিজের সেরাটা জমিয়ে রাখে।
এরকম না করেও ২ ম্যাচে মাত্র ২ গোল করেও সে সফল হতে পারে যদি সেটা জায়গা মতো করতে পারে।
আবার এমন যদি হয় তার ক্রেডিটে সেমিতে জার্মানীকে হারিয়ে ফাইনালে চিলির কাছে হারে তাহলেও আমি রনকে দোষ দিব না। সবচেয়ে কঠিন জায়গা থেকে যদি সে দলকে পার করতে পারে তাহলে ফাইনাল না জিতলেও চলবে। কিন্তু সেমিতে যদি চিলি প্রতিপক্ষ হয় আর সেখানে জিতে জার্মানীর কাছে ফাইনাল হারে তাহলে সেটাকে আমি ততটা ক্রেডিট দিব না।
তবে এই কথা গুলোর সবই সাধারণ বিষয়। খেলা শুরু হলে অনেক কিছুই উলটা পালটা হতে পারে। তবে একটা কথা সত্য যে পর্তুগাল কনফেডারেশন কাপ জেতার জন্য এর চেয়ে সহজ সুযোগ মনে হয় আর পাবে না। এবারের আয়োজক রাশিয়া গতবারের ব্রাজিলের চেয়ে দূর্বল দল। কোপা চ্যাম্পিয়ন চিলিও আর্জেন্টিনার চেয়ে পেছনেই। চিলি কিংবা রাশিয়ার কাছে হেরেও পর্তুগাল বাদ পড়তে পারে কিন্তু টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্ত প্রতিপক্ষ জার্মানীই।
দেখা যাক রন তার জীবনের সবচেয়ে সেরা সুযোগ কতটুকু কাজে লাগাতে পারে।
৬.
আগের পর্বেই বলেছিলাম ক্রুশিয়াল ম্যাচে খারাপ করলেও অন্যান্য ফ্যক্টরে এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু করলে সেরার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু ক্রুশিয়াল ম্যাচের ভালো পারফর্মেন্স আপনার অন্যান্য অনেক ব্যর্থতাকে ঢেকে দিতে পারে। বিষয়টা নিয়ে পরের পর্বে আরেকটু বিস্তারিত বলার ইচ্ছে আছে।

Leave a Reply