জ্বলে পুড়ে মরে ছাড়খার, তবু মাথা নোয়াবার নয়

কার্ডিফ শব্দটা বললে বাংলাদেশী ক্রিকেট ভক্তদের মনে যেই কথাটা ভেসে ওঠে সেটা মোহাম্মদ আশরাফুলের সেই সেঞ্চুরিতে ভর করে অস্ট্রেলিয়ার সাথে জয়, যে জয় সে সময় অলৌকিক ঘটনার চেয়েও বেশী অলৌকিক ছিলো।

আর না; বাজি ধরে বলতে পারি, কার্ডিফ শুনলে এরপর থেকে সাকিব আল হাসান আর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকেই মনে পড়বে। দুইজনের দুই সেঞ্চুরিতে জেতা ম্যাচের স্কোরকার্ডটা প্রথম দফায় দেখে মনে হবে, ১৬ বল থাকতে ৫ উইকেটে জয়, এতো ডালভাত ম্যাচ ছিলো! চমকে যাবেন, একটু ভালোমত দেখলেই। এক সময় বাংলাদেশের স্কোর ছিলো ৩৩ রানে ৪ উইকেট, ইনফর্ম তামিম আর এই কন্ডিশনে সবচেয়ে বড় ভরসা মুশফিকুর রহিম ততক্ষণে প্যাভিলিয়ন এ, দুর্দান্ত তাসমানিয়ান দের পেস এটাকের সামনে অফ ফর্মের সাকিব আর গত দুই ম্যাচে রান না পাওয়া মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। অতি আশাবাদী ফ্যানও হয়ত তখনই টিভি অফ করে ঘুমুতে গেছেন, সেহরিতে উঠার তাড়া আছে যে!

প্রথম থেকেই দেখা যাক, অবশেষে দলে তাসকিন আহমেদ, সাথে ফেরত আসলেন মোসাদ্দেক হোসেন ও, খড়্গটা নামলো ইমরুল কায়েস আর মেহেদি হাসান মিরাজের উপর। দুর্দান্ত ব্যাট করা ব্ল্যাকক্যাপসরা যে মাত্র ২৬৫ তেই থামলো, তাতে এই দুই তরুণের ভূমিকা বেশ ভালোই, তাসকিন উইকেট নিলেন দুটি, যার মধ্যে একটি সেট হয়ে যাওয়া রস টেইলরের। আর মোসাদ্দেক আসলেন জাদুকর হয়ে, ৩ ওভারে ১৩ রান দিয়ে তুলে নিলেন নিল ব্রুম, কোরি এন্ডারসন আর জিমি নিশাম কে। তখনই নিউজিল্যান্ড এর ৩০০ এর আশা শেষ, তবে সেটায় শেষ পেরেক ঠুকলেন রুবেল, মুস্তাফিজ, মাশরাফি! শেষ ১০ ওভারে রান দিলেন মাত্র ৬২!

আশা জাগাচ্ছিলো এই যে, আয়ারল্যান্ড এ প্রায় এই রানই চেজ করে জিতেছিলো বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ড এর সাথে। কিন্তু এবার যে বোলিং এটাক টা অনেক বেশী পরিবর্তিত, তা বোঝাতেই কিনা সাউদি বোল্টের আগুন ঝরানো স্পেল। বোল্ট উইকেটশূন্য থাকলেও, সাউদি তুলে নিলেন তামিম সৌম্য আর সাব্বিরকে, সৌম্যের আউটটা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, তামিম আগেই রিভিউ ব্যবহার করে ফেলায়, তা আর যাচাই করতে পারলেন না সৌম্য।

এরপর ঠিক যখন সাকিব কে নিয়ে মুশফিক একটু থিতু হচ্ছেন, তখনই এডাম মিলনের ১৪৬ কিমি এর ইনসুইঙ্গিং গোলা, ছত্রভঙ্গ মুশির স্ট্যাম্প! এই পর্যায়ে বাংলাদেশ জিতবে, এই কথা কেউ আদৌ বলেছিলেন কিনা তা আমার জানা নেই, বলার কথা না।

কিন্তু ওই যে, আমাদের একজন সুপারম্যান আর একজন আনসাং হিরো আছেন যে!

কথায় আছে, Cometh The Time, Cometh The Man!

তা গত ১০ বছরে আমাদের ম্যান তো একটাই, সাকিব আল হাসান! তিনি যেন আলাদীনের চেরাগের জ্বিন, যা চাইবেন তাই পাইবেন! কিন্তু মাঝে মাঝে তারাও ক্লান্ত হন, তাদেরও বিশ্রাম লাগে!

আয়ারল্যান্ড সিরিজে ব্যাট হাতে ম্লান, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও তাই, বল হাতেও ছন্দ পাচ্ছিলেন না কিছুতেই। ইংল্যান্ড এর সাথে হারের পর তো তার বিকল্প ভাবার সময় এসেছে বলা শুরু করেছিলেন অনেকেই।

জবাবটা এইভাবেই দিলেন। সেঞ্চুরি যেই ছয়টা মেরে করলেন, সেটা আমার চোখে তাই কেন যেন ধরা পড়লো তাকে বাদ দিতে বলা লোকগুলোকে মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছেন এই রূপে। সেঞ্চুরির পরের দুই চার দিয়ে যেন প্রমাণ করলেন, আমি সাকিব আল হাসান, এই নাও জবাব।

আর আরেকজন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, পার্শ্বনায়ক হয়েও যিনি অনেক নায়কের চেয়ে বেশী কিছু করেন! আতাহার আলী খানের ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরির ডায়লগে অনেকেই বিরক্ত, বাট যাকে নিয়ে এই উক্তি, তার ব্যাট আমাদের কখনই বিরক্ত করে না, বড় ভরসার প্রতীক! তাকে বুঝাতে The Dark Knight সিনেমার এই ডায়লগটা একটু ধার নিচ্ছি

Because he’s the hero Bangladesh deserves, but not the one it needs right now, so we’ll hunt him. Because he can take it, because he’s not a hero. He’s a silent guardian, a watchful protector, a Dark Knight .

কত ম্যাচ জেতালেন তিনি? তবুও দুটো ম্যাচ খারাপ খেললেই ভায়রা ভাই, হ্যান ত্যান বলে কতই কিছু না বলি!

৩৩-৪ থেকে ২৬৮-৫ এর মধ্যে আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা পার্টনারশিপ এর গল্প লেখা হয়ে গেছে, এই গল্পে নায়ক দুইজন, এই রকম এক দিনে এক নায়ক নীতিতে বিশ্বাসী হওয়া যায় না।

আজকের ম্যাচটা হয়ে থাকুক আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের ফিনিক্স পাখির মত ম্যাচ, মরে ছাই হবো, আবার জন্মাবো!

জ্বলে পুড়ে মরে ছাড়খার,
তবু মাথা নোয়াবার নয়!

দিনশেষে এই চরণ দুটোই আজকের ম্যাচকে বুঝিয়ে দেয়, আর কিচ্ছু না, আর কিচ্ছু না।

Leave a Reply