টি২০ আর ওয়ানডে সিরিজে কি পেলাম, কি হারালাম!

দেশের বাইরে ক্রিকেটটা আমরা কালেভদ্রে খেলি। এবারই যেমন দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর প্রথমবারের মতো। প্রায় আড়াই বছর পর। যেই সিরিজ ছিলো কিছু পাওয়ার, তা হয়ে গেলো সব হারানোর। যেই সিরিজ হতে পারতো আরো সিরিজ পাওয়ার দাবি, তা রূপ নিলো এই শঙ্কায়, আবার ডাকবে তো!

গত দুই বছর ধরে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আমাদের ফলাফল এই সফর নিয়ে আশাবাদী করেছিলো। কিন্তু হলো পুরো উল্টোটাই। এই ভরাডুবির কারণ কি, টিম ম্যানেজমেন্টই ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু বদলে যাওয়া বাংলাদেশের বদলে যাওয়া ক্রিকেটের এই যুগে এভাবে হারতে দেখাটা বড্ড বিব্রতকর। কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়ও চলে আসছে এর সাথে।

খুব বেশি না, স্মৃতির পাতা হাতড়ে কয়েক বছর পেছনে যাই। ক্রিকেট খেলাটা আমাদের আবেগ, অস্তিত্বের অনেকটা জুড়েই ততদিনে গেড়ে বসেছে। প্রতিটি ম্যাচ কাটতো, অঘটনের স্বপ্নে। ম্যাচের আগে পত্রিকার পাতায় আমাদের অধিনায়কের বলা কথা, আমরা অঘটন ঘটানোর আশা করছি আর বিপক্ষ অধিনায়কের উক্তি, বাংলাদেশকে সমীহ করছি ছিলো নিয়মিত দেখা জিনিস। ব্যাটিংয়ে নেমে ২৫০ রান মানে বাংলাদেশ আজকে অনেক ভালো খেলেছে। আর বোলিংয়ে যদি দ্রুত তিন বা চার উইকেট ফেলে দেওয়া যায়, দিনটা ভালোই কেটেছে। আসলে সেই দিনগুলোতে ২৫০ ফাইটিং টোটালই, ৩০০ রানের মাইলফলক অনেকটা সোনার হরিণই।

সেই দিন গত হয়েছে আজ বেশ কদিন হলো। আইসিসির নিয়ম-কানুনের বদল হয়েছে বেশ কবার। টি২০ ক্রিকেট বেড়েছে,৩০ গজি বৃত্তের বাইরের ৪ ফিল্ডার নিয়মও কিছুদিন ছিলো। ক্রিকেট ইজ আ ব্যাটসম্যানস গেম, কথাটা চালুও হয়ে গিয়েছিল। ৩০০ রান যেন পাশের বাসার ছেলেটার মতোই নিত্য দেখা এক ব্যাপার। দলগুলি তখন ছুটছে, ৪০০ রানের কোটা ছুঁতে। এছাড়া জেতার নিশ্চয়তা পাবেন না যে।

বদল এসেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটেও। বাংলাদেশ ততদিনে আর অঘটনের আশায় মাঠে নামেনা, নিচুস্বরে জয়ের আশা করছি বলারই সাহস পায়, বিশ্বাস জন্মে। বিশ্বাসের চারায় পানি দেয় তাসমান সাগরপাড়ের বিশ্বকাপ। সব শঙ্কা পেছনে ফেলে বাংলাদেশ পৌঁছে কোয়ার্টার ফাইনালে। ভাগ্য সাথে থাকলে হয়তোবা যেতে পারতো সেমিফাইনালেও। পরাজিত করে ইংলিশদের। সেই স্মৃতি তাজা থাকতেই পাকিস্তানকে ধবলধোলাই, ভারত আর সাউথ আফ্রিকাকে সিরিজ হারানো, ভেবে আবারো রোমাঞ্চিত হচ্ছি, যা সবই ছিলো ঘরের মাটিতে।

কিন্তু, বাংলাদেশের ক্রিকেটের চিরকালীন নিন্দুকেরা বরাবরই বলে এসেছিলেন, আগে দেশের বাইরে কিছু করে দেখাও। নিন্দুকদের মুখে চপেটাঘাত করার মোক্ষম সুযোগ ছিলো এই সফর। এখন উল্টো আমরাই চপেটাঘাত নিয়ে বাড়ি ফিরছি, ওয়ানডে, টি২০ দুই ফরম্যাটেই ধবলধোলাই হয়ে।

আসলে, দু:খজনক হলেও সত্যি, ফলটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য নয়। এই ফলের পিছনে যথেষ্ট কারণ আছে বলেই মনে হয়। আর ফরম্যাট যখন ওয়ানডে কিংবা টি২০, কন্ডিশন কিংবা পিচের দায় দেওয়ারও জায়গা নেই। এই সিরিজে তো আরো নেই।

বর্তমানকালের সব একদিনের ক্রিকেট ম্যাচ শুরু হয় ১৯৯৬ বিশ্বকাপের শ্রীলংকার মতো। পাওয়ারপ্লের সুবিধা কাজে লাগিয়ে দলকে ওপেনাররা এনে দেন উড়ন্ত সূচনা। ভারী ব্যাট আর শক্তি মিলিয়ে তান্ডব চালান বোলারদের উপর। উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হিসেবে পাবেন বাংলাদেশকে। ডট বলের পর ডট বল, সনাথ জয়াসুরিয়াকে না, ১৯৭৫ বিশ্বকাপের গাভাস্কারকেই মনে করান তারা। দলও পড়ে যায় চাপে।

বিরাট কোহলি, জো রুট, স্টিভেন স্মিথ, কেন উইলিয়ামসন। মিল খুঁজে পান কোনো? হ্যা, প্রত্যেকেই দলের সেরা ব্যাটসম্যান এবং প্রত্যেকেই ওয়ান ডাউনে ব্যাট করতে নামেন। যুগে যুগেই একদিনের ম্যাচে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটিং পজিশন ভাবা হয় এই পজিশনকে। অথচ, বাংলাদেশ দলে এই পজিশনে কোন ম্যাচে কে যে নামবেন, তা যেন পেন্ডুলামের কাঁটা। ওয়ান ডাউনে নির্ভরযোগ্যতা দিতে পারবেন, এমন ব্যাটসম্যান যে নেই বাংলাদেশ দলে। কিছুদিন সাব্বির, না পারলে সৌম্য বা অন্য কেউ, এই নীতিতেই চলছে এখন। এই সিরিজেও ব্যত্যয় ঘটেনি।

চন্ডিকা হাতুরুসিংহে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝেড়েছিলেন আনামুল হক বিজয়ের উপর, স্ট্রাইক রোটেট করতে পারেন না বলে। হাতুরুসিংহের জন্য আফসোস হয়, কয়জন ব্যাটসম্যানের উপর এই ক্ষোভ ঝাড়বেন তিনি। বাংলাদেশ দলের প্রত্যেক ক্রিকেটার বোধহয় এই সমস্যায় আক্রান্ত। আদর্শ যদি মেনে থাকেন ক্রিস গেইলকে, তাহলে ভুল করছেন তারা। সেই দানবীয় শক্তি আপনাদের নেই। সিঙ্গেল না নিয়ে বল সীমানার বাইরে আছড়ে ফেলবেন, সেটা তার জন্যই রেখে দিন।

বাংলাদেশ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ভালোবাসে। কিছুদিন ধরে অনুপস্থিত থাকা ব্যাটিং ধস আবারো হাজির। বিশেষ করে নতুন ব্যাটিং কোচ আসার পর এই সিন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় বোধহয় এখন।

আর আগেই উল্লেখ করেছি বদলে যাওয়া ক্রিকেটের কথা। যেখানে সব দল ৪০০ রান তাড়া করতে ছুটছে, বাংলাদেশ ৩০০ রানের কোটা ছুঁতেই ব্যর্থ। বিশেষভাবে চোখে লেগেছে, ২য় ওয়ানডে ম্যাচে জেতার অবস্থান থেকে হেরে যাওয়ার দৃশ্য। ব্যাটসম্যানদের একের পর এক আত্মাহুতি, তাদের নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলবে স্বাভাবিক।

সিনিয়র ক্রিকেটাররা মারাত্মকভাবে ব্যর্থ। বিশেষ করে, মুশফিকের অনুপস্থিতিতে সাকিবের এইরকম ব্যাটিং যথেষ্ট হতাশার।

ডট বল, স্ট্রাইক রোটেট না করা সবকিছুর সম্মিলিত প্রয়াসই বদলে যাওয়া ওয়ানডে ক্রিকেটের সাথে তাল মেলাতে না পারা। বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ইমরুল কায়েসের কথা। এই আধুনিক ক্রিকেটে তার মতো ওপেনার বড্ড বেমানান। এক প্রান্ত থেকে ডট বল খেলে তিনি নিয়মিতই চাপে ফেলেছেন অপর ব্যাটসম্যানকে। টিম ম্যানেজমেন্ট তাকে নিয়ে পুনরায় ভাবতেই পারে।

অবশ্য টিম ম্যানেজমেন্ট না বলে হাতুরুসিংহের কথা বললেই বোধহয় ঠিক হবে। যা গুঞ্জন শোনা যায়, তাতে ক্রিকেটকে তিনি ম্যানেজার্স গেমই বানিয়ে ফেলেছেন। চোখে লেগে থাকবে এই সিরিজে ‘কিছুটা ব্যাটসম্যান, কিছুটা বোলার’ গোছের তানভীর হায়দারের অভিষেক। হঠাৎ তার মাঝে কোন আলাদিনের চেরাগ হাতুরুসিংহে পেয়েছেলিন, খেলা দেখেও তা ঠাহর করা গেলো না। লেগ স্পিন শিল্প, চাইলেই তৈরি করা যায় না যাকে তাকে, জহুরি কোচ হাতুরুসিংহে নিশ্চয় জানেন এই ব্যাপারটা। কিন্তু, হঠাৎ এক প্রস্তুতি ম্যাচে দেখে কোনো প্লেয়ারকে দলে নেওয়া, এই বার্তা তৈরি করা কি তার ঠিক হচ্ছে!

অভিজ্ঞ রুবেল স্কোয়াড থাকলেও তাকে কেন সুযোগ দেওয়া হলো না, জানার ইচ্ছে আছে। পুরো সিরিজজুড়ে ডেথ ওভারের বোলিংয়ে ভুগতে দেখে তাকে মিস করা ছাড়া উপায় ছিলো না। বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশের কোনো বিশেষত্ব চোখে পড়লো না।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, সিরিজ চলাকালীন বোর্ড সভাপতির বক্তব্য, টিম সাকিব-মাশরাফি সিলেক্ট করে। তানভীরকে ওরাই নিয়েছে। ঢাকা ডায়নামাইটসের ক্যাপ্টেন থাকাকালীন সময়েই সাকিব তানভীরকে ২ ম্যাচ খেলিয়েছিলেন। কোচকে বাঁচানোর জন্য তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগ কোথায়! আর টিম তো ক্যাপ্টেনই সিলেক্ট করবেন, এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, এই কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলার কারণ কি???

আসলে পরাজয় অনেক বিষয়কেই সামনে নিয়ে আসে। ওয়ানডে সিরিজ নিয়ে প্রত্যাশা বেশি ছিলো, ভুলগুলো ধরাও পড়েছে বেশি। টি২০ নিয়েও নতুনভাবে ভাবতে পারে বিসিবি। যেহেতু এই ক্রিকেটে ছোট আর বড় দল বলে কিছু নেই।

টি২০ ম্যাচ হয় গেইলের পাওয়ার হিটিংয়ের, নয় বিরাট কোহলির টাইমিংয়ের। কিন্তু, গায়ে গেইলের মতো অসুরের শক্তি ব্যতিরেক গেইল হওয়ার চেষ্টা হাসির খোরাক ছাড়া কিছুই যোগায় না। আমাদের ক্রিকেটাররা সব বলই সীমানাছাড়া করতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে এসেছেন, ম্যাচও হারতে হয়েছে। কেন উইলিয়ামসনের বোলিংয়ে উইকেট দিতে দেখা, সত্যিই পীড়াদায়ক।

টি২০ ফরম্যাটের বেলায় ম্যাক্সিমাম রানই আসে শুরুর চার ব্যাটসম্যান থেকে। আমাদের বেলায় তার উল্টোটাই ঘটেছে। ইমরুল কায়েসের কথা আবারো আসবে এই বেলায়। ১০ টি২০ ম্যাচে ৪ শুন্য, লজ্জার রেকর্ড নিজের করে নিতে খুব অপেক্ষা করতে হবে না হয়তো। তার ব্যর্থতা প্রশ্ন তুলছে, মেহেদি মারুফকে কন্ডিশনিং ক্যাম্পে নিয়ে কেন আবার ফেরত পাঠানো!

সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে সাকিব এখানেও মারাত্মকভাবে ব্যর্থ। যখনই মিডল অর্ডারে হাল ধরা প্রয়োজন হয়েছে, তিনি উইকেট ছুঁড়ে এসেছেন। শেষ টি২০ ম্যাচে বাজে বোলিংয়ের সাথে যেভাবে ক্যাচ মিস করেছেন, চোখে লেগে থাকার মতো।

অবশ্য এই জায়গায় সবার কথাই বলা লাগবে। পুরো সিরিজ জুড়েই চলেছে বাজে ফিল্ডিংয়ের মহড়া। ব্যাটিং ব্যর্থতায় আড়ালে পড়ে গেলেও বোলিং যে খুব ভালো হয়েছে বলা যাবে না। শেষ টি২০ ম্যাচে লাস্ট ১০ ওভারে এসেছে ১৪৯ রান। পারফরমেন্স বোঝাতে যথেষ্ট।

টি২০ ক্রিকেটটা অলরাউন্ডারদের জায়গা। দলে একজন মানসম্পন্ন পেস বোলিং অলরাউন্ডারের বড্ড অভাব। নিউজিল্যান্ডের তিন পেস বোলিং অলরাউন্ডার আক্ষেপই বাড়িয়েছে কেবল, কলিন মানরোকে যোগ করলে সংখ্যাটা চারে দাঁড়ায়।

বিপিএল ফ্র‍্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট হলেও দিনশেষে তা ক্রিকেটের উন্নতির জন্যই। কিন্তু, সেই ক্রিকেটেরই যদি উন্নতি না হয়, তবে এর প্রয়োজনীয়তা কোথায়! সব দেশ তো ফ্র‍্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট আয়োজন করে এগিয়েই যাচ্ছে, আমরা কেন পারছি না? দোষটা তাই এই ফ্র‍্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের নয়, আমাদের বোর্ডেরই। ঘরোয়া কাঠামোর উন্নতি ব্যতীত এই রকম ফলাফল আরো আসবে। ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতি তাই বাঞ্ছনীয়।

এই বছরই ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হবে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। ভালো ফল করতে চাইলে কিছুটা পরিবর্তন আনাই লাগবে এবং তা অতি দ্রুত। বাংলাদেশ আসলেই ভালো দল সেটা প্রমাণ করতে হলেও এই পরিবর্তন আবশ্যক। ঘরের বাইরে জয়ের মাধ্যমেই তো প্রমাণ করা লাগবে, আমাদের সামর্থ্য।

Leave a Reply