দ্বিগবিজয়ী অষ্ট্রেলিয়া

পাড়ার ক্রিকেট টুর্নামেন্টে কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত নিয়ম থাকে! প্রচলিত ক্রিকেট আইনের কোন তোয়াক্কা করে না এই সকল টুর্নামেন্ট। আর টিমটা যদি কমিটির টিম হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই। নিজেদের প্রয়োজনে যে কোন নতুন আইন প্রণয়ন করে নিতে পারে কমিটি। সামান্য টাকার বিনিময়ে এক দলের খেলোয়াড় অন্য দলে খেলতে পারে। টিমটা যখন কমিটির তখন আর বাঁধা দেয়ার কে আছে! এই একই জিনিসটা যদি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে হয় তাহলে কেমন হয়? হ্যা, এমন এক উদ্ভট সিরিজও দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। যদিও এই ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে প্লেয়ার বদল হয় নি! হয়েছিল ক্রিকেটকে আরও জনপ্রিয় করার জন্য! ২০০৫ সালে আইসিসি আয়োজন করে ‘আইসিসি সুপার সিরিজ’ নামে একটি সিরিজ। যেখানে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামে বাকি বিশ্বের সেরা একাদশ।
এক পাশে অস্ট্রেলিয়া আর বিপক্ষে সারা বিশ্ব! আপনার কাছে কি মনে হচ্ছে – অস্ট্রেলিয়ার সাথে কি অবিচার করা হয়েছে! আপাত দৃষ্টিতে মনে হতেই পারে, একটি দলকে হারাতে সারা বিশ্ব এক জোট হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা যে কল্পনাকেও হার মানায়। সেই সময়কার অস্ট্রেলিয়া যে শুধুই অস্ট্রেলিয়া দল না। তারা ছিল মাইটি অস্ট্রেলিয়া। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ থেকে যে উত্থান তা বহমান ছিল এক দশকের চেয়েও বেশি সময়। এশিয়া, ইউরোপ, ক্যারিবিয় দ্বিপ, আফ্রিকা সব জায়গায় যে এই দলটা ছিল অপরাজেয়। ঘরের মাঠের কথা তো উল্লেখ করতেই মানা। স্টিভ অয়াহ যে জায়গায় রেখে গিয়েছিলেন সেখান থেকে পন্টিং নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। মঙ্গল গ্রহে পানির অনুসদ্ধান অনেক সহজ ছিল এই অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর চেয়ে অনেক অনেক সহজ কাজ।
বিশ্ব একাদশের জন্য দল বাছাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন সুনিল গাভাস্কার, মাইক আথারটন, জন্টি রোডস, অরবিন্দ ডি সিলভা, ক্লাইভ লয়েড এবং রিচার্ড হ্যাডলি। ২৩ শে আগস্ট ২০০৫ সালে প্রাথমিক দল ঘোষণা করেন তারা। প্রাথমিক দলে জায়গা পান, সাউথ আফ্রিকার ৫ জন, ইংল্যান্ড এবং পাকিস্তানের ৩ জন করে, ভারত, শ্রীলংকা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে ২ জন করে এবং নিউজিল্যান্ড থেকে ১ জন। বাংলাদেশ এবং জিম্বাবুয়ের কোন খেলোয়াড় এই দলের জন্য বিবেচিত হয় নি। ইঞ্জুরির কারণে অবশ্য পরবর্তীতে দুই জন খেলোয়াড় মূল দলে খেলতে পারেন নি, যাদের মধ্যে একজন ছিলেন শচিন। শচিন এর বদলে মূল দলে চলে আসেন ইনজামাম।
বিশ্ব একাদশের প্লেয়ারদের দিকে একটু নজর দেয়া যাক! উদ্বোধনী জুটিতে গ্রাহাম স্মিথ ( অধিনায়ক ) এবং শেভাগ। অল্প বয়সে যখন সাউথ আফ্রিকা দলের অধিনায়কের দায়িত্ব তার কাঁধে চলে আসে তখন অনেকেই ভেবেছিল স্মিথ কি পারবেন! সকল জল্পনা কল্পনার অবসান করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি এসেছেন রাজত্ব করতেই। ধারাবাহিক পারফর্ম করেছেন তিনি। আর এক ওপেনার শেভাগ! দ্রুত গতিতে রান কিভাবে তুলতে হয় তা শেভাগের ব্যাটিং দেখলেই বুঝা যায়। যে কোন বোলারকে তুলোধুনা করতে তার জুরি মেলা ভার! ফার্স্ট ডাউনে ছিলেন দ্যা ওয়াল! সেই সময়ে তিন নাম্বারে রাহুল দ্রাভিদের বিকল্প শুধু যে তিনিই। চার নাম্বারে যদি থাকেন ক্রিকেটের বর পুত্র তাহলে আপনাকে কি খুব একটা চিন্তিত হতে হবে! মিডে লারা থাকা মানেই তো নিশ্চিত ভরসা। মিডল অর্ডারে জ্যাক ক্যালিস। এই অল রাউন্ডার এর তুলনা যে তিনি নিজেই। বোলিং কিংবা ব্যাটিং ক্যালিস যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ছয় নাম্বারে পাকিস্তানের সর্ব কালের সেরাদের একজন ইনজামাম উল হক। মিডল অর্ডার কলাপ্স করলেও লোয়ার মিডে তিনি দলকে টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম। ইনজামাম এর পরে আর এক অল রাউন্ডার ফ্লিন্টফ। এসেজের অভাবনীয় সাফল্য তাঁকে নিয়ে আসে আলোচনায়। যে কোন সময় রুদ্র মূর্তি ধারন করতে সক্ষম এই ইংলিশ। আট নাম্বারে উইকেট রক্ষকের দায়িত্ব পালন করা মার্ক বাউচার। নয় নাম্বারকে টেল এন্ড বলব নাকি পিউর ব্যাটিং বলব তা নিয়ে দ্বিধায় পরতেই হবে কারণ ৯ নাম্বারে ছিলেন কিউই অধিনায়ক ভেটরি। ১০ নাম্বার থেকে টেল এন্ড অবশ্য হিসাব করাই যায়! দলের জেনুইন সিমার স্টিভ হার্মিন্সন। এবং নাম্বার ১১ তে টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে ভয়ংকর বোলার মুরালিধরন।
অজিদের খেলোয়াড়ের তালিকাও কিন্তু তারকা সমৃদ্ধ। সবচেয়ে বড় কথা হল তারকাখ্যাতির চেয়ে একটি দল হয়ে পার্ফরম করাই ছিল অজিদের মূলমন্ত্র। ওপেনিং এ সর্ব কালের জুটির একটি ল্যাঙ্গার এবং হেইডেন। নাম্বার তিনে অধিনায়ক রিকি পন্টিং। চার নাম্বারের পন্টিং এর জায়গা নেয়া অজিদের পরবর্তী অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। পাঁচ নাম্বারে সাইমন ক্যাটিচ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তারকাখ্যাতি অতটা না থাকলেও পারফর্মেন্সে কোন খেদ ছিল না। ছয় নাম্বারে বিধ্বংসী গিলক্রিস্ট। তারপরেই অল রাউন্ডার ওয়াটসন। আট নাম্বারে ঘূর্ণি জাদুকর শেন অয়ার্ন। টেল এন্ডে গতি দানব ব্রেট লি। ধারাবাহিকতার অপর নাম ম্যাকগ্রা। এবং সবশেষে স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল।
তারকাখ্যাতির দিক থেকে বিশ্ব একাদশ যোজন যোজন এগিয়ে। দর্শক সমর্থক সবাই হয়ত ভেবেছিল এবার বুঝি অজিদের জয়রথ থামবে! কিন্তু অপরাজেয় অজিদের যে শুধু অজিরাই হারাতে পারে! আইসিসি এই টেস্ট ম্যাচ রেখেছিল ছয় দিনের। কিন্তু মাত্র চারদিনেই টেস্টের ফলাফল নিস্পন্ন। বিশ্ব একাদশকে গুঁড়িয়ে দিয়ে বিজয়ী মাইটি অস্ট্রেলিয়া।
সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এল সেই মহেন্দ্রক্ষন। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ১৪ ই অক্টোবর শুরু হল বহু প্রতীক্ষিত আইসিসি সুপার সিরিজ। টসে জয়ী অজি অধিনায়ক রিকি পন্টিং। টসে জিতে ব্যাটিঙের সিদ্ধান্ত অজিদের। ইনিংসের তৃতীয় বলেই হার্মিন্সনের প্রথম আঘাত শুন্য রানে প্যাভিলিয়নে লেঙ্গার। হেইডেন এবং পন্টিং মিলে সামলে নিল অজিদের ইনিংস। প্রথম ইনিংসে ৩৪৫ রানে অল আউট অস্ট্রেলিয়া। হেইডেন ১১১, গিলক্রিস্ট ৯৪ এবং পন্টিং ৪৬। ফ্লিনটফ এর ঝুলিতে চার উইকেট এবং মুরালির ২ উইকেট। তারকা সমৃদ্ধ বিশ্ব একাদশ প্রথম ইনিংসেই লিড নিচ্ছে এমনটা ভাবলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯০ রানে অল আউট বিশ্ব একাদশ। শেভাগ এর ৭৬ আর ক্যালিস এর ৪৪ ছাড়া উল্লেখ করার মত আর কারো স্কোর নেই। ওয়ার্নির ছায়ায় ঢাকা পরে থাকা ম্যাকগিল নিলেন ৪ উইকেট আর ওয়ার্নের ঝুলিতে ৩ উইকেট।
দ্বিতীয় ইনিংসে বিশ্ব একাদশের বোলিং দাপট দেখল বিশ্ববাসী। মাত্র ১৯৯ রানে অল আউট অজিরা। হেইডেন ৭৭ আর পন্টিং ৫৪। বাকি সবাই যাওয়া আসার মধ্যেই রইল। বিশ্ব একাদশের হয়ে হার্মিন্সন, ফ্লিনটফ এবং মুরালি ৩ টি করে উইকেট শিকার করলেন। বিশ্ব একাদশের জন্য টার্গেট ৩৫৫ রান। পুরো তিনদেনের খেলা তখনো বাকি। দ্বিতীয় ইনিংসে আরও বড় ধ্বস নামল বিশ্ব একাদশের ব্যাটিং এ। মাত্র ১৪৪ রানেই অল আউট! ক্যালিসের ৩৯ রান সর্বাধিক। প্রথম ইনিংসের মত দ্বিতীয় ইনিংসেও ধ্বংসের কারিগর ম্যাকগিল আর ওয়ার্নি। মায়কগিল ৫ এবং শেন অয়ার্ন ৩ উইকেট। মাত্র চার দিনেই ২১০ রানের বিশাল ব্যবধানে জয়ী অস্ট্রেলিয়া। ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ ম্যাথিউ হেইডেন।
টেস্ট ক্রিকেটের তৎকালীন এক নাম্বার দল হিসাবে জয় করেছিল সব কিছুই। শুধুমাত্র বাকি ছিল একই সাথে পুরো বিশ্ব জয়! সুপার সিরিজের কারণেও তাও সম্ভব হয়েছিল। একই ম্যাচেই বিশ্ব জয়!

ম্যানিয়াক্স ডেস্ক
ক্রিকেট ভালোবাসি, কেননা বাংলাদেশকে ভালোবাসি।

Leave a Reply