বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ওয়ান ডে ক্রিকেটে অভিষেক ম্যাচ

ব্রিটিশ শাসিত অখণ্ড ভারত উপমহাদেশ এর অন্যান্য অঞ্চলের মত বঙ্গেও ক্রিকেট খেলার প্রচলন শুরু হয়েছিল প্রায় দুই শতক আগেই। কিন্তু অনগ্রসর পূর্ববঙ্গে এই খেলাটি অতটা জনপ্রিয়তা পায়নি। উচ্চ বর্ণের বঙ্গীয়দের মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে ছিল ক্রিকেট। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পূর্ব বাংলায়ও ক্রিকেটের কিছুটা ছোঁয়া লাগে। কিন্তু ৪৭ থেকে ৭১ ভাষা, স্বাধিকার এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে থাকা বাঙ্গালীদের ক্রিকেটে মনোনিবেশ করার সময় কোথায়? মূলত ১৯৭১ এ স্বাধীনতার পরেই এই দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ক্রিকেটের প্রচলন শুরু হয়। ১৯৭৭ সালে আইসিসির সহযোগী দেশ হিসাবে ক্রিকেটে পদার্পণ হয় বাংলাদেশের। সেই থেকেই ধীরে ধীরে ক্রিকেটে এগিয়ে যাওয়া শুরু বাংলাদেশের। আইসিসির সহযোগী দেশ হিসাবে নিবন্ধিত হবার ৯ বছর পর প্রথম কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ হয় বাংলাদেশের।

একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অভিষেক হয়েছিল ১৯৮৬ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের মাধ্যমে। টুর্নামেন্ট এর তৎকালীন নাম ছিল জন প্লেয়ার গোল্ড লিফ ট্রফি (এশিয়া কাপ)। ৩১ মার্চ ১৯৮৬ এই আসরের দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে মাঠে নামে বাংলা টাইগাররা। এই ম্যাচটি ছিল ৩৭৫নং আন্তর্জাতিক ওডিয়াই ম্যাচ। শ্রীলঙ্কার মোরাতূয়াতে অবস্থিত থিরন্নে ফার্নানদো স্টেডিয়াম সেদিন সাক্ষী হয়েছিল বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন এক শক্তির আগমনের। পুরো ক্রিকেট বিশ্ব সেদিন দু’হাত প্রসারিত করে স্বাগত জানিয়েছিল বাংলা টাইগারদের। কিন্তু প্রতিপক্ষ দলটা যে ছিলো পাকিস্তান এতটা উষ্ণ অভ্যর্থনা যে তাদের কাছ থেকে পাওয়া কল্পনাও করা যায় না। হলোও তাই! অপমানসূচক এক প্রস্তাব দিয়েই যাত্রা শুরু হল টাইগারদের।

ম্যাচের শুরুতে পাকিস্তান অধিনায়ক ইমরান খান টস করতে অস্বীকৃতি জানান এবং বাংলাদেশ অধিনায়ককে টস ছাড়াই ব্যাটিং কিংবা ফিল্ডিং যে কোন একটি বেছে নেয়ার প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ দলপতি গাজী আশরাফ লিপু সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে ইমরান খানকে টস করতে বাধ্য করেন। বাংলাদেশ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় কারো দয়া কিংবা করুণা নয় বরং নিজেদের যোগ্যতা দিয়েই লড়াই করবে টাইগার বাহিনী। শক্তিমত্তায় পাকিস্তান ক্রিকেট দল বাংলাদেশ থেকে অনেক এগিয়ে থাকলেও নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।

অভিষেক ম্যাচে বাংলাদেশ একাদশ – রাকিবুল হাসান, নুরুল আবেদিন, গাজী আশরাফ লিপু (অধিনায়ক), শাহেদুর রহমান, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, রফিকুল আলম, গোলাম ফারুক, জাহাঙ্গীর শাহ, হাফিজুর রহমান (উইকেট রক্ষক), গোলাম নওশের প্রিন্স এবং সামিউর রহমান।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সদ্য অভিষিক্ত একটি দলের কাছ থেকে খুব বেশি রকম ভালো পারফর্মেন্স আশা করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এই ম্যাচে বাংলাদেশ ৩৫.৩ অভারে অল আউট হবার আগে ৯৪ রান করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩৭ রান করেন শাহেদুর রহমান। বাংলাদেশ ইনিংসের শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট এর পতন ঘটতে থাকে। ব্যাক্তিগত রানের খাতা খোলার আগেই দলীয় তিন রানে ইমরান খানের বলে উইকেট রক্ষক জুলকারনাইন এর গ্লাভস বন্দী হয়ে আউট হন নুরুল আবেদিন। প্রথম উইকেটের পতনের পর মাঠে আসেন বাংলাদেশ অধিনায়ক গাজী আশরাফ। দ্বিতীয় উইকেট জুটিও খুব বেশি দূর নিয়ে যেতে পারেনি বাংলাদেশকে। দলীয় রানের খাতায় মাত্র এক রান যোগ করতে পারে এই জুটি। শুন্য রানে ওয়াসিম আকরামের বলে বোল্ড হয়ে প্যাভিলিয়ন এর পথে হাঁটলেন দলীয় অধিনায়ক গাজী আশরাফ। দলীয় ১৫ রানের মাথায় আর এক ওপেনার রাকিবুল হাসানের বিদায়। শুরুতেই চাপের মুখে বাংলাদেশ দল। ওয়াসিম আকরামের দ্বিতীয় শিকার হয়ে মিনহাজুল আবেদিন যখন সাঁজ ঘরে তখন স্কোর বোর্ডে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪ উইকেটে ২৭ রান। পঞ্চম উইকেটে শাহেদুর রহমান এবং রফিকুল আলম কিছুটা লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছিলেন কিন্তু খুব বেশি দূর যাওয়া হয় না। ৬৮ রানে বাংলাদেশের পঞ্চম উইকেটের পতন। ওয়াসিম আকরামের তৃতীয় শিকারে পরিণত হন রফিকুল আলম। মাত্র দুই রানের ব্যবধানে ষষ্ঠ উইকেটের পতন। লেগ স্পিনার আবদুল কাদের কট এন্ড বোল্ড করে সাজঘরে ফেরত পাঠান শাহেদুর রহমানকে। দলীয় ৭৯ রানের মাথায় আবারো ওয়াসিম আকরামের হামলা। নিজের চতুর্থ উইকেট হিসাবে তুলে নেন জাহাঙ্গীর শাহ এর উইকেট। বাংলাদেশের টেল এন্ড কিছুটা লড়াই করলেও খুব বেশি কিছু রানের খাতায় জমা করতে ব্যর্থ হন। দলীয় ৯৩ রানে গোলাম ফারুক এবং হাফিজুর রহমান আউট হন। আর মাত্র এক রান যোগ করে বাংলাদেশের শেষ উইকেট হিসাবে সামিউর রহমান আউট হন।

মাত্র ৯৩ রানের পূঁজি নিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ জিতে নেয়া এক কথায় অসম্ভব ছিল। তারপরও লড়াইটা ভালোই করেছিল বাংলা বাঘেরা। পাকিস্তানকে এই ম্যাচটি জিতার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৩৩ ওভার পর্যন্ত। বাংলাদেশের জন্য অনেক কিছুর শুরুর এই ম্যাচে পাকিস্তানি ওপেনার মুহসিন খানকে এলবিডব্লিউ এর ফাদে ফেলে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক কোন উইকেট পান জাহাঙ্গীর শাহ। স্কোর বোর্ডে তখন পাকিস্তান এর সংগ্রহ ১ উইকেটে ৪৫ রান। দলীয় ৫৫ রানের মাথায় পাকিস্তান শিবিরে আবারো আঘাত হানেন জাহাঙ্গীর শাহ। এবারের শিকার রমিজ রাজা। জাহাঙ্গীর শাহ এর বলে এলবিডব্লিউ হবার আগে রমিজ রাজা মহা মূল্যবান শুন্য রান করতে সমর্থ হন। ৮৫ রানের মাথায় জাভেদ মিয়াদাদকে আউট করলেও পাকিস্তান দলের বিজয় রুখে দেয়া সম্ভব হয়নি। ৩২.১ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায়। ব্যাক্তিগত চার উইকেট নিয়ে এই ম্যাচে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ হন ওয়াসিম আকরাম।

লেখকঃ প্রবাসী পাঠক

ম্যানিয়াক্স ডেস্ক
ক্রিকেট ভালোবাসি, কেননা বাংলাদেশকে ভালোবাসি।

Leave a Reply