বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম জয়

১৯৯৯ সালের ৩১ মে বাংলাদেশ প্রথম কোন টেস্ট প্লেয়িং নেশনকে পরাজিত করে। তাও আবার বিশ্বকাপের মত মঞ্চে… তার উপর প্রতিপক্ষ ছিল বিশ্বকাপের হট ফেভারিট টিম পাকিস্তান! পাকিস্তান টিমের দিকে নজর দিলেই পরিষ্কারভাবে বুঝা যাবে কেন তারা হট ফেভারিট ছিল…
পাকিস্তান টিমঃ সাইদ আনোয়ার, শহিদ আফ্রিদি, ইজাজ আহমেদ, ইনজামামুল হক, সেলিম মালিক, আজহার মেহমুদ, ওয়াসিম আকরাম, মঈন খান, সাকলাইন মোস্তাক, ওয়াকার ইউনুস, শোয়েব আখতার। এক কথায় সেই দলে ছিল পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা ওপেনার, সেরা অফ-স্পিনার এবং সেরা ফাস্ট বোলিং ইউনিট।
সবাই মনে করেছিল এটা হবে স্রেফ একটা নিয়ম রক্ষার ম্যাচ। তবে বাংলাদেশ দল শুরু থেকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। হয়তো দলটি পাকিস্তান বলেই, সাথে যোগ হয়েছিল বোর্ডের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়া প্রিয় কোচের বিদায়। টস হেরে বাংলাদেশ দল ব্যাট করতে নামে। এর আগে বিশ্বকাপের চার ম্যাচে ওপেনিং জুটির সর্বোচ্চ রান ১০! তবে এদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপে প্রথম ওপেনিং জুটিতে ৫০ ঊর্ধ্ব রান করে। দলীয় ৬৯ রানের মাথায় প্রথম উইকেটের পতন ঘটে। মেহরাব হোসেন ৪২ বল মোকাবেলা করে মাত্র ৯ রান করেন! এ থেকেই বুঝা যায় উইকেট না দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ কতটা সাবধানী ছিল। বাংলাদেশের দুই ওপেনার ওয়াকার, শোয়েব, ওয়াসিম, আজহারকে কিভাবে ১৫ ওভার পর্যন্ত উইকেট শুন্য রেখেছিল সেটাই এক বিরাট বিস্ময়! দলের যখন ৭০ রান তখন আরেক ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন ৩৯ রান করে আউট হলে দল কিছুটা চাপে পড়ে। তখন আকরাম খান এবং আমিনুল ইসলাম বুলবুল মিলে আরও একটি ৫০ রানের জুটি উপহার দেন। দলীয় রান তখন ২৯ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে ১২০ রান। এরপর মোটামুটি নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়ে একপর্যায়ে স্কোর দাড়ায় ৩৪.৫ ওভারে ১৪৮ রান ৫ উইকেটের বিনিময়ে। এরপর ৬ষ্ঠ উইকেট জুটিতে নান্নু এবং সুজন মিলে ৩৯ রানের একটি মাঝারি জুটি গড়েন। তখন ৪১.১ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ১৮৭ রান। বাংলাদেশের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত ২০০ রান করার স্বপ্ন উঁকি দিচ্ছে। প্রথম দিকে বাংলাদেশের দর্শকদের তেমন কোন আগ্রহ না থাকলেও এই সময়টাতে সবার মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। মানুষ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে থাকে, ডে শিফটের স্কুলগুলো আগে আগেই ছুটি দিতে থাকে। এরপর কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা উইকেট, সিঙ্গেল, চারের মাধ্যমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে বাংলাদেশ ৯ উইকেট হারিয়ে ২২৩ রান করতে সমর্থ হয়। বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ৪২ রান করেন আকরাম খান, তারপর শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুতের ৩৯ রান। পাকিস্তান বোলাররা অবশ্য ২৮টি ওয়াইডের মাধ্যমে ৪০টি এক্সট্রা দিতে সমর্থ হয়।
খেলার বিরতিতে বাংলাদেশের পারফর্মেন্স নিয়ে অলিতে-গলিতে বিস্তর আলোচনা হয়। জয়ের চিন্তা তখনও কেউ চিন্তা করেনি। সবাই সম্মানজনক পরাজয়ের পক্ষেই বাজি ধরলেন। তবে বাংলাদেশ দল তখন ভেবেছিল ভিন্ন। সবাই শেষ বিন্দু দিয়ে ম্যাচ জয়ের জন্য নেমে পড়লো। প্রথম ওভারে বোলিং এ এলেন খালেদ মাহমুদ সুজন… ওভারের ৫ম বলেই আফ্রিদি, মেহরাব হোসেনের কাছে পয়েন্টে ধরা পড়লেন। দ্বিতীয় ওভার করতে এলেন শফিউদ্দিন আহমেদ… ওভারের শেষ বলে ইজাজ আহমেদ বোল্ড! বোলিং এ বাংলাদেশের শুরুটা হলো দুর্দান্ত। তবে ৭.১ ওভারের মাথায় ওপেনার সাঈদ আনোয়ার রান আউট এবং ৮.১ ওভারে সুজনের বলে ইনজামামুল হক আউট হলে পাকিস্তান সত্যিকার অর্থেই বিপাকে পড়ে। সত্যিকথা বলতে কি দেশবাসি তখনও জয়ের কথা কল্পনা করেনি। পাকিস্তানের স্কোর তখন ৪ উইকেটের বিনিময়ে ২৯ রান। দলে আর ১৩ রান যোগ করে যখন সেলিম মালিক আউট হলো তখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, ‘আজ একটা কিছু হবে।’ কারন ততক্ষনে বাংলাদেশ পাকিস্তানের টপ অর্ডার ধ্বংস করে দিয়েছে। ১৩ ওভার শেষে পাকিস্তানের প্রথম ৭ ব্যাটসম্যানের রান ছিল যথাক্রমে ৯ ২ ০ ৭ ৫ ৭ ১! অবশ্য শেষ দুইজন পরবর্তীতে রান বাড়াতে পেরেছিলেন। এরপর পাকিস্তানের শুরু হয় ফাউণ্ডেশন কোর্স অর্থাৎ ম্যাচ বাঁচানোর লড়াই। ৬ষ্ঠ উইকেট জুটিতে ওয়াসিম আকরাম এবং আজহার মেহমুদ মিলে করলেন ৫৫ রানের জুটি। ২৭.৫ ওভারে ওয়াসিমের সাথে ভুল বোঝাবুঝিতে আজহার রান আউট এবং ২৯.১ ওভারে ওয়াসিম ক্যাচ আউট হলে বাকি ম্যাচ হয়ে যায় নিয়ম রক্ষার। এবার অবশ্য পাকিস্তান নিয়ম রক্ষা করবে। এরপর ৩৫তম ওভারের শেষ বলে মঈন খান ক্যাচ আউট হলে দলের স্কোর দাড়ায় ১২৪ রান ৮ উইকেটের বিনিময়ে। তারপর খালি অপেক্ষা আর অপেক্ষা… সাকলাইন মোশতাক এবং ওয়াকার ইউনুসের ৯ম উইকেটে ৩৬ রানের জুটি কেবলই অপেক্ষা বাড়িয়েছে। এরপর ৪৪.২ ওভারে শোয়েব আকতার রান আউটের সম্ভাবনা জাগলে, আউট ঘোষণা দেয়ার আগেই জনতা মাঠে নেমে এসে উল্লাস করতে থাকে। পরে অবশ্য রান আউটের ঘোষণা এলে পাকিস্তান ১৬১ রানে অল আউট হয় এবং বাংলাদেশ ৬২ রানের বিশাল জয় পায়। ব্যাট হাতে ১৫ রান এবং বল হাতে ৩ উইকেট নেয়ায় খালেদ মাহমুদ সুজন ‘ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ’ নির্বাচিত হন।
এই ম্যাচটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ওই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর কেটে গেছে ১৭টি বছর। তাও ওই ম্যাচের সৃতি, উত্তেজনা কিছুই কমেনি। আজকের এই দিনে স্মরণ করছি ১৯৯৯ সালের বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেই দলকে…
বাংলাদেশ দলঃ শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ, মেহরাব হোসেন অপি, আকরাম খান, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, নাইমুর রহমান দুর্জয়, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, খালেদ মাহমুদ সুজন, খালেদ মাসুদ পাইলট, মোহাম্মদ রফিক, নিয়ামুর রশিদ, শফিউদ্দিন আহমেদ।

Leave a Reply