শুভ জন্মদিন রিকি পন্টিং।

ক্রিকেটে বিরল কীর্তি কোনটি? বিষয়টা ব্যাখ্যা করার জন্য তিনটা কীর্তির কথা আগে একটু বলি।
প্রথম কীর্তিঃ যে কোন একজন ক্রিকেটারের আজন্ম স্বপ্ন কোনটা? জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া, যদি পরিধিটা একটু বাড়ানো হয় তাহলে সেটা হবে টেষ্ট দলে সুযোগ পাওয়া। যদি কোন ক্রিকেটার জাতীয় দলের হয়ে সব ভার্সনেই সুযোগ পায় তাহলে তো ভালোই কিন্তু যদি টেষ্ট অথবা ওয়ানডের মাঝে একটাকে বেছে নিতে বলা হয় তাহলে বেশীর ভাগ ক্রিকেটার টেষ্ট ক্রিকেটকেই এগিয়ে রাখবে। সেই টেষ্ট ক্রিকেটে ১০০ টি টেষ্ট খেলা অবশ্যই একটা বিশেষ অর্জন। তবে বিশেষ হলেও অর্জনটা একেবারে কম ক্রিকেটার অর্জন করেননি। এই পর্যন্ত ৬৫ জন ক্রিকেটার ১০০ টি টেষ্ট খেলেছেন।
দ্বিতীয় কীর্তিঃ একজন টেষ্ট ব্যাটসম্যানের আকাঙ্খিত হচ্ছে টেষ্টে সেঞ্চুরী করা। তবে যদি কোন ব্যাটসম্যান দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরী পায় তাহলে সেটা আরো বেশী দারুন হয়। নিঃসন্দেহে কাজটা খুব কঠিন, তবে খুব কঠিন হলেও এই পর্যন্ত ৮১ বার ঘটনাটা ঘটেছে। কাজেই এই কাজটাও খুব বিরল নয়।
৩য় কীর্তিঃ এখন ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। সেই সেঞ্চুরীটা আরো স্মরণীয় হয় যদি মাইল ফলকের ( ১ম, ২৫তম, ৫০তম, ১০০ তম) ম্যাচে সেটা করা যায়। শততম ম্যাচে সেঞ্চুরীর ঘটনাও ক্রিকেট ইতিহাসে খুব বিরল নয়। এই পর্যন্ত ৭ জন ব্যাটসম্যান শততম টেষ্টে সেঞ্চুরী করেছেন। তবে এখানে কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা প্রয়োজন।
উপরের তিনটা কাজই একটু আলাদা হলেও একেবারে বিরল নয়। এখন কাজটা আরেকটু কঠিন করি।
যদি এমন একজনকে খোজা হয় যার মাঝে উপরের তিনটা বৈশিষ্ট্যই আছে তাহলে এটা শুধু কঠিন নয় প্রায় অসম্ভবের তালিকায় এসে পড়বে। মানে এমন একজন যিনি জাতীয় দলের হয়ে টেষ্ট ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়েছেন, ১০০ টি টেষ্ট খেলেছেন এবং শততম টেষ্টে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরী করেছেন । বিষয়টা যে কতটা কঠিন তা একটা মাত্র তথ্য থেকেই বুঝা সম্ভব। ক্রিকেট ইতিহাসে এই কাজটা এখন পর্যন্ত একজন মানুষই করতে পারেছেন, মানুষটা রিকি পন্টিং।
‘সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান কে’ প্রশ্নের উত্তরে ব্র্যাডম্যান, লারা, শচীন, রিচার্ডস – এমন অনেকের নাম আসবে। সর্বকালের সেরা বোলারের প্রসঙ্গে লিলি, ওয়াসিম, ম্যাকগ্রা, ওয়ার্ন, মুরালী – এমন অনেকের নাম আসবে। ‘সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার কে’ – এ প্রশ্নের উত্তরে ব্র্যাডম্যানের সাথে সাথে সোবার্সের নামও এসে পড়বে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় সর্বকালের সবচেয়ে সফল ক্রিকেটার কে তাহলে চোখ বন্ধ করে আপনি রিকি পন্টিং এর নাম বলে দিতে পারেন।
খেলোয়াড় হিসেবে সবচেয়ে বেশী ম্যাচ জয়ের রেকর্ড পন্টিং এর। ৩৭৫ টি ওয়ানডেতে জয় ২৬২ টি, এর মাঝে অধিনায়ক হিসেবে জিতেছেন ১৬৫ টি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা শচীন টেন্ডুলকার ৪৬৩ টি ম্যাচ খেলে জয় পেয়েছেন ২৩৪ টি। একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ক্রিকেটের ইতিহাসে শতাধিক টেস্ট বিজয়ের সাক্ষীরূপে রয়েছেন। পরিসংখ্যানগতভাবে তিনি সর্বকালের সফলতম অধিনায়করূপে চিহ্নিত।
ক্রিকেট বোদ্ধাদের মতে, ভারতের শচীন তেন্ডুলকর এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রায়ান লারা’র সাথে তিনিও আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিগণিত হয়ে আছেন। ১ ডিসেম্বর, ২০০৬ তারিখে প্রকাশিত টেস্ট ক্রিকেট রেটিংয়ে গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ র্যা ঙ্কিংধারী টেস্ট ক্রিকেটার ছিলেন পন্টিং।
এত সফলতার মাঝেও ছোট একটা ব্যর্থতা আছে তার। টেষ্টে হেরে গিয়েছেন এমন ম্যাচের সর্বোচ্চ ইনিংসটাও তার খেলা। ২০০৩ সালে ভারতের বিপক্ষে ২৪২ রান করার পরেও ম্যাচটা হারতে হয়েছিল।
কথিত আছে পন্টিং এর দাদী খুব ছোট বেলায় পন্টিং কে একটা টি শার্ট গিফট করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘ In this, there will be a future test cricketer.’ দাদীর অনুমান সঠিক ছিল তবে এত দূর পর্যন্ত যাবে তা কল্পনা করার কথা না।
পন্টিং সম্পর্কে সংক্ষেপে আসলে কিছু বলা সম্ভব নয়। ওর অবসর নেওয়ার সময় ওর সাবেক অধিনায়কের ( মার্ক টেলর) কিছু কথা তুলে ধরি। তাতে যদি কিছুটা বোঝা যায়।
‘পন্টিং কখনো দ্বিতীয় সেরা হয়ে তৃপ্ত হয় না, কখনোই মাঝারি মানটাকে মেনে নিবে না। রিকি চলে যাওয়ার পর এটাই অষ্ট্রেলিয়া সবচেয়ে বেশী মিস করবে, সেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। পন্টিং মানেই শুধু রান নয় যদিও নামের পাশে তার অসংখ্য রান রয়েছে। পন্টিং মানে তার সেই চির অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, জিগীষা আর মাঠে কখনোই হাল ছেড়ে না দেওয়ার মানসিকতা।
২০০৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেই বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান ছিল, শচীন লারার চেয়েও সেরা। এই সময়ে তাকে খেলতে দেখাটাও একটা সৌভাগ্য ছিল।
পন্টিং ছিল অন্য ধাচের একজন নেতা, সে নিজেই সামনে থেকে পথ দেখাতো এবং অন্যেরা তাকে অনুসরণ করতো। ক্রিকেট অষ্ট্রেলিয়া কখনোই কারো জন্য থেমে থাকে নি যদিও পন্টিং এর শূন্যতা কখনোই পূরণ হবে না’।
হটাৎ করে পন্টিং কে নিয়ে এত কথা কেন? কারণ এই বরেন্য ক্রিকেটারের আজ (১৯ শে ডিসেম্বর) জন্মদিন। পন্টিং এর সেরা সময়ের খেলা নিজের চোখে দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্য যাদের হয়েছে আমি তাদের একজন। একজন ক্রিকেটের ফ্যান হিসেবে ক্রিকেট ম্যানিয়াক্সের পক্ষ থেকে জন্মদিনে পন্টিং কে শুভেচ্ছা।

Leave a Reply