সৌম্যের পুনর্জন্মলাভের সফর নাকি আবার হতাশা?

দার্শনিক মরমী লালন সাই এর একটা গান আছে “খাঁচার ভেতর অচীন পাখি কেমনে আসে যায়”! এই গানটা ক্রিকেটের ব্যাটসম্যান রা প্রায়ই নিজেদের সাথে তুলনা করতে পারেন, নিজেকে খাঁচা আর ফর্ম কে পাখি হিসেবে, কখন ফর্ম আসবে, কখন যাবে সেটা বোঝা যায় না, জানাও যায় না। ফর্ম নিয়ে কথা বলা শুরু করলেই আমাদের এখন যার কথা মনে পরে তার নাম সৌম্য সরকার। ধূমকেতুর মত বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবির্ভাব, আলো ছিটিয়ে হঠাৎ কেমন যেন মিইয়ে গেছেন, ফর্মের সোনার পাখি যেন খাঁচা ছেড়ে পালিয়েছে।

২০১৪ সালের জিম্বাবুয়ে সিরিজের শেষ ম্যাচে অভিষেক, ২০ রান করেছিলেন যতদূর মনে পরে। এরপর অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ। প্রথম ম্যাচে আফগান দের সাথে ছোট একটা সময়োপযোগী ইনিংস খেললেন, শ্রীলংকার সাথে ম্যাচেও উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি। স্কটল্যান্ড এর সাথে ম্যাচে ডাক মারলেন, পরের ম্যাচে ৮ রানে ২ উইকেট যাওয়ার পর মাহমুদুল্লাহ এর সাথে প্রায় ৯০ রানের জুটি গড়লেন, নিজে করেন ৪০। নিউজিল্যান্ড ম্যাচে তুলে নেন ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি। ভারতের সাথে সেই নিন্দিত কোয়ার্টার ফাইনালেও করেননি বলার মত কিছুই।

দেশে ফিরে পাকিস্তান সিরিজে প্রথম দুই ম্যাচে অসাধারণ তামিম ইকবাল এর পাশে পার্শ্বনায়কের ভূমিকায়, আলোটা নিজের দিকে করলেন শেষ ম্যাচে। অসাধারণ এক শতক হাকিয়ে দলকে জেতালেন, বাংলাওয়াশ হলো পাকিস্তান।

পরের ভারত সিরিজটা ছিলো প্রতিশোধের। সেই সিরিজেও ভালো খেললেন, ২-১ সিরিজ জিতলো মাশরাফি বাহিনী, সেই সিরিজটা মুস্তাফিজময়, আর কারও নাম নেওয়ার সুযোগ নেই।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে প্রথম ম্যাচে পুরো দলের ব্যাটিং বিপর্যয় এ লজ্জাজনক হার, তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই ফিরলো টাইগাররা। বোলারদের দাপটে অল্প রানেই গুটিয়ে গেলো প্রোটিয়ারা, ৮৮ ও ৯০ রানের দুটি ইনিংসে পুরো দক্ষিণ আফ্রিকান বোলিং লাইনআপ কে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেন সৌম্য।

জিম্বাবুয়ে সিরিজে কিছুটা ভালো খেললেও ফর্মের পড়তি শুরু হয় বিপিএলএ। হঠাৎই আউট হতে থাকেন অল্প রানে, সেই যে গেলো, আর ফিরে আসেনি ফর্ম।

এশিয়া কাপ, টি২০ বিশ্বকাপ, আফগানিস্তান সিরিজ, ইংল্যান্ড সিরিজে বাদই পড়লেন, আবার বিপিএল, কিন্তু হায়! কোথায় সেই পুরনো সৌম্য! এই সৌম্য যেন আত্মবিশ্বাসহীন, ভেঙে পড়া এক সৌম্য, সেই বোলারদের মানসিকভাবে ধ্বংস করা সৌম্য সরকার নন।

সমস্যাটা তবে কোথায়? শোনা যায়, বিপিএল ২০১৫ তে রংপুরের কোচ শেন জার্গেনসন সৌম্য কে বলেছিলেন দেখে শুনে খেলতে, যে কথা কখনও বলেননি বাংলাদেশ কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। দেখে খেলা যে সৌম্য সরকারের স্বভাব নয়!

আমি নিজে ব্যাক্তিগতভাবে সৌম্যের মাঝে ভিভ রিচার্ডস কে দেখতে পাই। সেই আগ্রাসন, সেই বোলারদের মনে ভয় সৃষ্টি। সুনীল গাভাস্কার ভিভ রিচার্ডস কে নিয়ে বলেছিলেন, ” ও বোলারদের মানসিকভাবে ধ্বংস করে দেয় ” সেটা তো সৌম্য দেখিয়েছিলেন সেই ২০১৫ এর পাকিস্তান সিরিজে, দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে। ডেফরি ডুজন বলেছিলেন ” সব সময়ই দেখেছি নতুন ব্যাটসম্যান নামলে ফিল্ডাররা দুই পা এগিয়ে আসে। একমাত্র ভিভ নামলেই সবাই দুই পা পিছিয়ে যায়”। সেটা ২০১৫ এর সিরিজগুলোয় সৌম্য ও করিয়েছেন, বারবার, ধ্বংস করে দিয়েছেন বোলারদের, বিশ্বসেরা বোলারদেরই!

আমাদের ভালোবাসার সৌম্য সরকারের জন্মটা এই অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড এই। ভাগ্যের ফেরে আবার নিউজিল্যান্ড এ বাংলাদেশ দল, আছেন সৌম্য সরকারও।অফ ফর্মের কালো ছায়ায় ডুবে আছেন, আমরা সেই পুরনো সৌম্য কে চাই, ভিভ রিচার্ডস রা কি বারবার ফিরে আসে? আসে না। তাই অপেক্ষায় থাকলাম, তোমার শক্তির জায়গা গতি আর বাউন্স ব্যাবহার করে ধ্বংস করে দাও নিউজিল্যান্ড কে, আবার জানিয়ে দাও বিশ্বকে তুমি এসে পড়েছো, বিশ্বজয় করতে। আমরা এই কয়টা দিন একটু অপেক্ষা করি।

অপেক্ষায় আছি পুনর্জন্মলাভ এর তোমার, সৌম্য সরকার!

Leave a Reply