স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান

৫২ টেষ্টে ৬৯৯৬ রান এবং ৯৯.৯৪ ব্যাটিং অ্যাভারেজ – স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান এর এই রেকর্ডটা সম্ভবত এমনই একটা রেকর্ড। বলা যায় এই রেকর্ড ভাঙ্গবে না কোনদিন। যেসব রেকর্ড ভেঙ্গেছে তা ভাঙ্গার পর রেকর্ডধারীরা যেন লজ্জাতেই পড়েছেন কোন রকম। ২৯ টি সেঞ্চুরীর রেকর্ড ভাঙ্গার পর সুনীল গাভাস্কার বলেছিলেন, ‘এটা শুধুই একটা অর্জন, কোন রেকর্ড নয়। রেকর্ড তখনই ভাঙ্গবে যখন ৫০ টেষ্টে কেউ ৩০ টি সেঞ্চুরী করবে’। এবং ক্রিকেট বোঝে এমন যে কোন স্কুলের বাচ্চাও এটা বলে দিতে পারবে এটা সম্ভব নয়।
অষ্ট্রেলিয়ার পক্ষে খেলা ডন ব্র্যাডম্যানকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান বলে অভিহিত করা হয়। টেস্ট ক্রিকেটে ব্র্যাডম্যানের ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড়কে বড় ধরণের যে-কোন খেলাধুলার সব থেকে বড় অর্জন বলে অভিহিত করা হয়। ইংল্যান্ডের পক্ষে অভিষেক টেষ্টে সিরিজ এ ৬৬.৮৫ গড়ে ৪৬৮ রান করার পরেও সিরিজ হেরেছিলেন। পরের সিরিজে ৯৭৪ রানের যে রেকর্ড গড়েন তা আজ পর্যন্ত এক সিরিজে সবচেয়ে বেশী রান করার রেকর্ড। এবং বলাই বাহুল্য যে এখন পর্যন্ত এই রেকর্ডটা কখনো হুমকির মুখে পড়েনি। ৩৩৮ টি প্রথম শ্রেণির ইনিংসের গড় ৯৫.১৪, ২২১ টি ইনিংসে সেঞ্চুরী পাননি। সেই ইনিংসগুলোর গড় কত জানেন, ৫৮.২০। যা টেন্ডুলকার, লারা, রিচার্ডস, এ.বি.ডি ভিলিয়ার্স, সাঙ্গাকারা কিংবা বর্তমানের কোহলির সেঞ্চুরী, ডবল সেঞ্চুরী সহ গড়ের চেয়েও বেশি।
ব্যাট হাতে পারফেকশনের যে উদাহরণ গড়েছেন তা পেরিয়ে গিয়েছেন ক্রিকেটের সীমানা। বিখ্যাত অঙ্কবিদ টমাস হার্ডি ‘ব্র্যাডম্যান ক্লাস’ বলে একটা টার্ম বের করেছিলেন। যেটা ছিল অমানবীয় অন্যান্য সব কীর্তির মানদন্ড। গ্যালিলিও, আইনষ্টাইন, নিউটনরা যেমন স্বীকৃতি পেয়েছিলেন ‘ব্র্যাডম্যান ক্লাস’ বলে। বিশ্বযুদ্ধের কারণে ক্যারিয়ারের সোনালি সময়ের আটটি বছর ঝরে গিয়েছে। যুদ্ধের পর খেলারই কথা ছিল না। আট বছর পর ৩৮ বছর বয়সে ফিরে এসে শেষ তিনটি সিরিজে তার ব্যাটিং গড় ৯৭.১৪, ১৭৮.৭৫ ও ৭২.৫৭। টেষ্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে কম ইনিংসে ২০০০, ৩০০০, ৪০০০, ৫০০০, ৬০০০ রানের কৃতিত্ব ব্র্যাডম্যানের। সেগুলোও দ্বিতীয়/তৃতীয় স্থানে থাকা ব্যাটসম্যানের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ১০০০ রানের রেকর্ডটা ভাংতে পারেননি ১ টি ইনিংসের জন্য। ১৩১ ইনিংসে ৭০০০ রানের রেকর্ড ওয়ালী হ্যামন্ডের, ৮০ ইনিংসে ৬৯৯৬ রান করা ব্র্যাডম্যান ৪ রানের জন্য করতে পারেননি। জীবনের শেষ ইনিংসে ৪ রান করতে পারলে তার টেষ্ট গড় হতো ১০০।
Wisden Leading Cricketer in the World ব্র্যাডম্যান এ পুরস্কারটি একাই দশবার পেয়েছিলেন। গ্যারি সোবার্স এর আটবার বাদ দিলে অন্য কোন খেলোয়াড়ই তিনবারের বেশি লাভ করতে পারেননি। উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাক ২০০০ সালে গত শতাব্দীর সেরা পাচ ক্রিকেটার নির্বাচন করেছিলেন । সাবেক খেলোয়াড়, ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক নিয়ে গড়া ১০০ জনের একটা প্যানেলের ভোটে। সবার সেরা পাচে একটা নাম কমন ছিল – ডন ব্রাডম্যান। গ্যারিফিল্ড সোবার্স, ভিভ রিচার্ডস, জ্যাক হবস আর শেন ওয়ার্ন ছিলেন সেরা পাচে জায়গা পাওয়া বাকি চারজন, এদের সবার চেয়ে অনেক বেশি ভোট পেয়ে পাচজনের মাঝে প্রথম হন। গত কয়েক দশকে সর্বকালের সেরা যে কোন টেষ্ট একাদশে যে কোন গবেষক দুটো নাম অটোমেটিক চয়েজ হিসেবে ধরে রেখেছেন, এর একটি স্যার ডন ব্র্যাডম্যান (অন্যটি স্যার গ্যারিফিল্ড সোবার্স)।
শুধুমাত্র ব্র্যাডম্যানকে আটকাতে ইংল্যান্ড ‘বডিলাইন’ ট্যাকটিক্স উদ্ভাবন করে। বডিলাইন ছিল এমন একটি ডেলিভারি যেখানে ক্রিকেট বলকে লেগ স্ট্যাম্প এর লাইনে ব্যাটসম্যানের শরীর বরাবর ছোড়া হতো। এটি ছিল শারীরিকভাবে হুমকি স্বরূপ, এবং যে খেলায় একসময় ভদ্র রীতিনীতি সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল তার বিচারে একটি অনৈতিক কৌশল। একটা সিরিজেই ব্র্যাডম্যান ব্যর্থ। ব্যর্থ কারণ তার গড় নেমে এসেছিল ৫৬.৫৭ এ। যে গড় অন্য সব ব্যাটসম্যানকে গ্রেটনেসের স্বীকৃ্তি দেয়। ২০০১ সালে ৯২ বছর বয়সে মারা যাওয়া স্যার ব্র্যাডম্যান নির্বাচক এবং বোর্ড কর্মকর্তা হিসেবেও সফল ছিলেন।
ম্যানিয়াক্স ডেস্ক
ক্রিকেট ভালোবাসি, কেননা বাংলাদেশকে ভালোবাসি।

Leave a Reply