সাদা পোশাকের ক্রিকেটে ১৬ বছর

 

সাদা পোশাকের ক্রিকেটে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখ করার মত তেমন কিছুই নেই! এক দিনের ক্রিকেটে যেখানে বিশ্ববাসীর কাছে বর্তমানে এক আতঙ্কের নাম। টেস্ট ক্রিকেটে ঠিক উল্টো! একদম সাদামাটা একটি দল। যদিও মাঝে মাঝেই সাধারণের মোড়ক থেকে বেড়িয়ে টাইগারদের গর্জন শুনতে পেয়েছে ক্রিকেট বিশ্ব। তবে তা নিয়মিত নয়।

১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের পর বাংলাদেশর ক্রিকেটের গতিপথ একরকম পাল্টে দেয়। খুব দ্রুত যেন অধরা স্বপ্নগুলো মুঠো বন্দি হতে থাকে বাংলাদেশের। বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার পথ খুলে যায় বাংলাদেশের জন্য। আইসিসি ট্রফি জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সুযোগ পায় ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে খেলার। সুযোগটা অবশ্য খুব ভালভাবেই কাজে লাগাল টাইগাররা। প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই স্কটল্যান্ড ও শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দেয় সবাইকে। এ যেন বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন শক্তির আগমনী বার্তা। বিশ্বকাপে সফলতা পেয়েই বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস এর জন্য আবেদন করে। যদিও এই সিদ্ধান্তটা খুব বেশিই দ্রুত হয়ে গিয়েছিল। ঘরোয়া ক্রিকেটে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা তৈরি না করেই টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির আবেদন। যার কুফল আমরা পরবর্তীতে পেয়েছিলাম পরাজয়ের বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে। বাংলাদেশের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০০০ সালের ২৬ জুন আইসিসি বাংলাদেশকে টেস্ট মর্যাদা প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। সময়ের পরিক্রমায় সেটি আজ ১৬ বছর পূর্ণ করল। এই ১৬ বছরে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্য-ব্যর্থতার একটি হিসাব কষতে গেলে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই হয়ত ভারী হবে। তবে বর্তমান বাংলাদেশ দলের পারফর্মেন্স আশার আলোটা কিন্তু জ্বালিয়েই রেখেছে।

 

52df855cd922b-ing-test-team-1

বিশ্বকাপে অভিষেকের মতোই টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের শুরুটা হয় স্বপ্নের মত। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর নাইমুর রহমানের অধিনায়কত্বে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামে বাংলাদেশ। ক্রিকেটে নবীন একটি দেশ যাদের ঘরোয়া ক্রিকেট অবকাঠামো ঠিক ভাবে তৈরি হয় নি, তারা টেস্ট ক্রিকেটে কেমন করে দেখার জন্য হয়ত চোখ রেখেছিল বিশ্ববাসী। প্রথম ইনিংসেই ৪০০ রানের বিশাল স্কোর করে বাংলাদেশ আবারো চমক দেখিয়ে দিল। কিন্তু সেই চমক অবশ্য ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখতে সম্ভব হয় নি। দ্বিতীয় ইনিংসে তাসের ঘরের মত করে গুঁড়িয়ে যায় বাংলাদেশের ব্যাটিং দুর্গ! ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণে ৯ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। তবে অভিষেকেই উল্লেখ করার মত কিছু নিদর্শন রেখে যায়। অভিষেকেই ১৪৫ রান করে অস্ট্রেলিয়ার চার্লস ব্যানারম্যান এবং জিম্বাবুয়ের ডেভিড হটনের পাশে নাম লেখান আমিনুল ইসলাম। অধিনায়ক নাইমুর রহমানের ১৩২ রানে ৬ উইকেট টেস্ট অভিষিক্ত কোন দেশের প্রথম ইনিংসে কোন বোলারের সেরা বোলিং।

 

play5

ঘরের মাঠে অভিষেক টেস্টে কিছুটা আশার আলো দেখালেই বিদেশের মাটিতে তেমন কিছু করতে পারল না বাংলাদেশ। অভিষেকের চার মাস পর বিদেশের মাটিতে টেস্ট খেলতে সুযোগ পায় বাংলাদেশ। অনভিজ্ঞ একটি দলের অসহায় আত্ম সমর্পণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না জিম্বাবুয়ের সেই সিরিজ। ইনিং ব্যবধানে হার দিয়েই বিদেশের মাটিতে টেস্ট অভিষেক বাংলাদেশের। জিম্বাবুয়ে থেকে পাকিস্তান তারপর শ্রীলংকা। দেশগুলো আলাদা আলাদা হলেও ফলাফল কিন্তু একই ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়। তবে শ্রীলংকায় আবারো টাইগারদের স্ফুলিঙ্গ দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। ২০০১ সালে শ্রীলংকার কলম্বোয় মাত্র ১৭ বছর ৬১ দিন বয়সে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড করেন মোহাম্মদ আশরাফুল।

 

15027569_680080315493163_2070568622095329180_n

পরপর পাঁচটি টেস্ট ম্যাচ এ পরাজিত হয়ে বাংলাদেশের আত্ম বিশ্বাস তখন তলানিতে। ষষ্ট টেস্টে অবশ্য কিছুটা সান্ত্বনার সন্ধান পেল বাংলাদেশ। ফিরতি সিরিজ খেলতে জিম্বাবুয়ে দল বাংলাদেশ সফরে। তুই টেস্ট এর সিরিজের প্রথম টেস্ট ড্র! যদিও এই টেস্টের দুই দিনের খেলা হয় নি বৃষ্টির কারণে। বৃষ্টির কারণে খেলা না হলেও রেকর্ড বইতে তো পরাজয় এড়ানো গেছে, এতটুকুই সান্ত্বনা।

 

14925499_680080978826430_5724344523949543693_n

২০০৩ সালে পাকিস্তান সফর থেকেই হয়ত টেস্ট ক্রিকেটে বড় সাফল্য পেতে পারত বাংলাদেশ দল। কিন্তু ইনজামাম এর দৃঢ়টায় তা আর সম্ভব হয় নি। মুলতানের সেই টেস্টে অবশ্য ইনজামাম এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল অন্য দুই জন। শ্রীলংকান আম্পায়ার অশোকা ডি সিলভা যিনি তার সাধ্যের শেষ টুকু দিয়ে পাকিস্তানকে জিততে সাহাজ্য করেছিলেন। আর রশিদ লতিফ এর জালিয়াতি। যেখানে অশোকা ডি সিলভা আর রশিদ লতিফের কুৎসিত চেহেরা দেখছিল বিশ্ব ক্রিকেট। ঠিক তার উল্টোটা দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশকে উঁচু করেছিলেন মোহাম্মদ রফিক। বল করার আগেই নন স্ট্রাইক ব্যাটসম্যান রানের জন্য বের হয়ে গেলেও রফিক কাপুরুষের মত রান আউট করেন নি। রফিক সেদিন দেখিয়েছিল , বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন হতে পারে কিন্তু কাপুরুষের মত জিততে আসে নি। ভালো খেলেই জয় ছিনিয়ে নিবে তারা। অবশ্য শেষ পর্যন্ত জয় আসে নি আমাদের। ১ উইকেটে পরাজিত হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। এই সিরিজে আর একটি অর্জন ছিল অলক কাপালির টেস্ট হ্যাট্রিক।

 

14980584_680080085493186_2692171924049699440_n

নিজেদের কৃতিত্বে বাংলাদেশ প্রথম কোন টেস্ট ড্র করতে সমর্থ হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২০০৪ সালে। সেন্ট লুসিয়ায় অনুষ্ঠিত টেস্টে বাংলাদেশের তিনজন ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেন। প্রথম ইনিংসে হাবিবুল বাশার ও মোহাম্মদ রফিক আর দ্বিতীয় ইনিংসে উইকেট রক্ষক খালেদ মাসুদ।

টেস্ট ম্যাচ ড্র করার স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই তবে টেস্ট জয়ের স্বপ্নটা যে তখনো অধরাই। সেই অমৃত সুধাও পেয়ে যায় বাংলাদেশ ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে। ফলাফল ২২৬ রানে জয়ী বাংলাদেশ। প্রথম টেস্ট জয়ের আনন্দে উদ্বেলিত পুরো জাতী। এই সিরিজটি যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য। শুধু টেস্ট জয়ই নয় সিরিজ জয়ের স্বাদও যে এই সিরিজ থেকেই পেল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় টেস্টটি ড্র হলে প্রথমবারের মত টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ।

২০০৬ সালে টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারাবার স্বাদটাও হয়ত পেয়ে যেতাম আমরা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১৫৮ রানের লিড নিয়ে টেস্ট জয়ের রাস্তাটা এক রকম তৈরি করে নিয়েছিল টাইগাররা। যদিও সেই বন্ধুর পথ পারি দিতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। শেষ পর্যন্ত ঐ ম্যাচটি ৩ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ।

টেস্ট জয়, সিরিজ জয় দুটোই পাওয়া হয়ে গিয়েছে কিন্তু বিদেশের মাটিতে জয়ের স্বাদ তখনো যে অচেনা বাংলাদেশ দলের! সেই অপূর্ণতাও পূর্ণ হল ২০০৯ সালে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সিরিজের দুই ম্যাচের দুইটিতেই হারিয়ে প্রথমবারের মত হোয়াইটওয়াশ করার স্বাদও পায় বাংলাদেশ। উল্লেখ্য করা যেতে পারে, ঐ সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়েরা ধর্মঘটের কারণে দলের বাইরে ছিল। বলার জন্য অবশ্য এসব বলা যায় কিন্তু দিন শেষে রেকর্ড বইতে বাংলাদেশের ধবল ধোলাইয়ের কথাই লেখা থাকবে।

 

14947720_680080628826465_2982158527807792172_n

বৃষ্টির সহায়তা কিংবা খর্ব শক্তির দলের বিপক্ষে পরাজয় এড়িয়ে ড্র এলেও, পূর্ণ শক্তির দলের বিপক্ষে টেস্ট ড্র করার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২০১৩ সাল পর্যন্ত। সাগর বিধৌত লংকা সফরে বাংলা টাইগাররা! সাঙ্গাকারা, থ্রিমানে আর চান্দিমালের সেঞ্চুরিতে লংকান্দের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫৭০ রান। আর একটি ইনিংস পরাজয়ের কথা হয়ত ভাবছিলেন অনেকেই। তখনই রুদ্রমূর্তিতে আবির্ভাব মুশফিকুর রহিম আর আশরাফুলের, সাথে নাসির হোসাইন। প্রথম কোন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান হিসাবে মুশফিকের ২০০ রান, আশরাফুল ১৯০ এবং নাসির ১০০। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৬৩৮ রান। এটাই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বাধিক স্কোর। ফলাফল টেস্ট ড্র।

বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল টেস্ট সিরিজ সম্ভবত সদ্য সমাপ্ত ইংল্যান্ড সিরিজটাই। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মেলবন্ধন এই সিরিজে। যদিও প্রথম ম্যাচটা অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়ে যায়। দ্বিতীয় ম্যাচে অবশ্য বাঘের মতোই ফিরে আসা। শক্তিশালী ইংলিশদের হারিয়ে হয়ত নব সূচনার দুয়ার উন্মোচিত হল। এক দিনের ক্রিকেটে যে জাদুর পরশ লেগেছিল ২০১৫ সালে, টেস্ট ক্রিকেটেও হয়ত সেই পরশ পেলাম ২০১৬ সালে। হয়ত আর দু বছর পরে টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে আর আক্ষেপ এর কথা লিখতে হবে না। তখন হয়ত বিজয়গাঁথা দিয়েই পূর্ণ করতে হবে পাতার পর পাতা।

Leave a Reply