‘ক্রুশিয়াল ম্যাচ – সর্বকালের সেরা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মানদন্ডঃ পর্ব ১’

১.
সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান কে? ব্র্যাডম্যান, ভিভ রিচার্ডস, শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, গ্যারিফিল্ড সোবার্স, জ্যাক হবস – এমন কিছু নাম আপনার মাথায় আসবে।
সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে? পেলে, ম্যারাডোনা, ক্রুয়েফ, ডি স্টেফেনো, জিদান, মেসি – এরকম কিছু নাম আপনার মাথায় আসবে।
প্রত্যেক গ্রেট খেলোয়াড়ের কিছু স্পেশাল দিক আছে আবার কিছু দূর্বল দিকও আছে। দেখার বিষয় হচ্ছে শ্রেষ্ঠ নির্বাচনের বিচার করার সময় আমি কিংবা আপনি কোন দিকটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি? এবং সাথে সাথে এটাও দেখা উচিত আমি কিংবা আপনি যে দিকটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার সাথে বিশেষজ্ঞদের নির্বাচন কতটুকু মেলে। যদি এই মুহুর্তে বিশ্বের সব বিশেষজ্ঞ মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে ডি স্টেফেনো সর্বকালের সেরা ফুটবলার তাহলে তা কতজন মেনে নিবে? এমনকি পেলে কিংবা ম্যারাডোনা নিজেও যদি ডি স্টেফেনোকে সেরা মানে তারপরেও তাদের ভক্তরা সেরা মানতে পারবে না। কারণ ম্যারাডোনা বা পেলের যে ক্রাইটেরিয়ার জন্য ভক্তরা সেরা মানে তা হয়তো ডি স্টেফেনোর মাঝে নেই। যে ক্রাইটেরিয়াকে বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে তা আমার কিংবা আপনার পছন্দ নাই হতে পারে।
এবারের ব্যালন ডি ওর এর ভোটের কথাই ধরুন। যতদূর জানি এবারের বিজয়ী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে মোট ১১ টি দেশের সাংবাদিকরা ভোট দেয় নি। এখন আপনি কি বলবেন তারা খেলা বুঝে না, আমি এভাবে চিন্তা করতে পছন্দ করি না। আমি মনে করি তারা ভিন্ন ভাবে ভেবেছিলেন। হয়তো তারা যে ক্রাইটেরিয়াকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তাতে রন পিছিয়ে থাকে। তবে বেশীরভাগ বিশেষজ্ঞরা যে ক্রাইটেরিয়াকে গুরুত্ব দেয় তা পছন্দ না হলেও মেনে নেওয়া উচিত।
মূল কথায় আসি, এই প্রজন্মের বেশীর ভাগ খেলার সমর্থকেরা সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে শচীন টেন্ডুলকারের নাম বলে আর সেরা ফুটবলার হিসেবে মেসির নাম বলে। দুজনেই দুই খেলার জন্য আশির্বাদ স্বরুপ তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এর পরেও এই দুজনকে অনেকেই সেরা বলে স্বীকার করতে চায় না। এর কারণটা কি? অনেকেই বলে ক্রুশিয়াল ম্যাচে এই দুজন খেলোয়াড় ভালো খেলতে পারেনা ( আমি নিজেও এমনটা মনে করি)।
যারা শচীন অথবা মেসি ভক্ত তাদের একটা কমন স্বভাব হচ্ছে তারা শচীন অথবা মেসির ব্যর্থতাকে সেভ করার জন্য সতীর্থদের দোষ দেয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ক্রুশিয়াল ম্যাচ বলতে কি বোঝায় সেটা আমরা কতটুকু বুঝি? আর যদি তারা ক্রুশিয়াল ম্যাচে খারাপও করে তাহলেও এই একটা মাত্র ফ্যক্টরের কারণে মেসি বা শচীন অন্যান্যদের তুলনায় ঠিক কতটুকু পিছিয়ে থাকবে?
এই পোষ্টটিতে ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটো বিষয় নিয়েই সামান্য আলোচনা করা হচ্ছে। কারণ আমি মনে করি যে কোন বিষয়েই বিচার করার জন্য বেসিকটা একই থাকে। আপনি যদি লজিক বুঝেন তাহলে তা শুধু ফুটবল কিংবা ক্রিকেটে নয়, আপনার নিজের জ়ীবনেও ব্যাবহার করতে পারবেন, তবে ব্যবহার করাটা জানতে হবে । শুধুমাত্র কিছু বিষয় ফাইন টিউন করতে হয় । যাই হোক শুরু করি। প্রথমে ক্রিকেট নিয়ে বলি।

 

p1
২.
ক্রিকেটে টেষ্ট কিংবা ওয়ানডে দুই ভার্সনেই ব্যাটিং এর বেশীরভাগ রেকর্ড শচীন টেন্ডুলকারের। টেষ্ট আর ওয়ানডের সবচেয়ে বেশী সেঞ্চুরীর সংখ্যাও শচীনের। শুধু সবচেয়ে বেশী নয়, দ্বিতীয় স্থানের চেয়েও অনেক খানি এগিয়েই আছেন শচীন। এরপরেও বলা হয় শচীন টেন্ডুলকার ক্রুশিয়াল ম্যাচে ফ্লপ থাকেন। শচীনের সমসাময়িক লারা বরং এই পয়েন্টে অনেক এগিয়ে। আমি নিজেও এমনটাই ভাবতাম কিন্তু আমার হাতে সেভাবে কোন প্রমাণ ছিল না। নিজের ভাবনা নিয়ে তর্ক করা যায় কিন্তু প্রমাণ করার জন্য কিছু তথ্য প্রয়োজন যা কিনা আমার হাতে ছিল না।
তবে প্রমাণ খুব শীঘ্রই এসে পড়লো। ২০০১ সালে ক্রিকেটের বাইবেল খ্যাত উইজডেন থেকে গত শতাব্দীর টেষ্টের সেরা যে ১০০ ইনিংসের তালিকা প্রকাশ করে তাতে শচীনের কোন ইনিংস স্থান পায় নি। এছাড়া গত শতাব্দীর ওয়ানডের সেরা ১০০ ইনিংসের তালিকাতেও শচীনের মাত্র ৩ টি ইনিংস সুযোগ পায়। সেগুলোর ক্রমিক নাম্বার ছিল যথাক্রমে ২৩, ৩০ আর ৩৩। অথচ প্রথম ১০ এই লারার দুটি ইনিংস জায়গা পায়। সেরা ১০০ তে লারার আরো তিনটি ইনিংস আসে।
তবে সবচেয়ে বেশী ইনিংস আসে ওয়ানডের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত ভিভ রিচার্ডসের। প্রথম দুটি ইনিংসই তার, সব মিলিয়ে ৭ টি।
অনেকের ধারণা বড় টুর্নামেন্টে বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভালো খেললেই সেটা গ্রেট পারফর্মেন্স হবে। এই লজিকটাও একেবারে ভুল নয়। তবে ছোট টুর্নামেন্ট কিংবা ছোট প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলাও অনেক সময় পরিস্থিতির কারণে গ্রেট হয়। সেটা একে একে বলার চেষ্টা করছি।
সেরার তালিকায় প্রথম ইনিংটার দিকে লক্ষ করলে একটু অবাক হবেন। সেটা কোন বিশ্বকাপের ম্যাচ নয়। একটা দ্বিপাক্ষীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচ। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় ইনিংসটা সাধারণ ছিল না। একটু লক্ষ করুন।
ওল্ড ট্রাফোর্ডের ১৯৮৪ সালের সেই ম্যাচে ইংল্যান্ড বিধংসী বোলিং করছিল। ১০২ রানেই উইন্ডিজের ৭ উইকেট পড়ে যায়। প্রথমে Baptiste কে ৫৯ রানের একটা জুটি গড়েন যাতে Baptiste এর অবদান ছিল মাত্র ২৬ রান। ১৬৬ রানে যখন গার্নার আউট হয় তখন একপ্রান্ত ধরে রেখে রিচার্ডস খেলে যান। ৫৫ ওভার শেষে ( তখন ওয়ানডে ৫৫ ওভারে হতো) হোল্ডিং কে নিয়ে যখন ফেরত আসেন তখন উইন্ডিজের রান ২৭২। ১০৬ রানের শেষ জুটিতে হোল্ডিং এর অবদান ছিল মাত্র ১২ রান। রিচার্ডস অপরাজিত ১৮৯ রানে, বল খেলেছেন ১৭০ টি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এত ম্যাচ থাকতে একটা দ্বিপাক্ষীয় সিরিজের সাধারণ ম্যাচ কেন গুরুত্বপূর্ণ হলো? বিষয়টা হচ্ছে একটা ম্যাচে বিপক্ষ দল কতটা বিধংসী ছিল এবং সেই বোলিং এর বিপক্ষে আপনার পারফর্মেন্স কেমন ছিল সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যক্টর। এছাড়াও আরেকটা ফ্যাক্টর হচ্ছে এই ইনিংস টা সেই নির্দিষ্ট টুর্নামেন্ট বা সিরিজের উপর কতটা ইম্প্যক্ট ক্রিয়েট করতে পেরেছে। একটা কথা হয়তো মানবেন, অফ ফর্মের শেন ওয়ার্নের চেয়ে বেষ্ট ফর্মের ডেনিয়েল ভেট্টরির বিরুদ্ধে রান করা কঠিন। বেষ্ট ফর্মের ভেট্টরির বিরুদ্ধের কোন ইনিংসও সেরা হয়ে যেতে পারে কিন্তু আপনি যদি কখনো বেষ্ট ফর্মের ওয়ার্নকে পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে দেন তাহলে চিন্তা করুন সেটা কতটা গ্রেট হবে।
রিচার্ডসের সেই ইনিংসে গ্রিনিজ, হেইন্স, গোমেজ, রিচি রিচার্ডসন, ডুজন আর লয়েডের মতো সেরা খেলোয়াড়েরা মিলে করেছিলেন ২৮ রান। ইংল্যান্ডের ইনিংসেও ল্যাম্ব বাদে কোন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান ১৫ রানের বেশী করতে পারেনি। এ থেকেই বুঝা যায় পিচটা ব্যটসম্যানদের জন্য বধ্যভুমিই ছিল। সেই বধ্যভুমিতেই এমন তান্ডব। তাছাড়া সেই ইনিংসের কারণেই ৩ ম্যাচের সিরিজটা ২-১ এ জিতে নেয় উইন্ডিজ।
তালিকাটা লক্ষ করলে দেখতে পাবেন সেখানে ৪ নম্বরে আছে কপিল দেবের একটা ইনিংস। অথচ সেটা কোন নক আউট স্টেজের ম্যাচ ছিল না। গ্রুপের একটা ম্যাচ ছিল, প্রতিপক্ষও জিম্বাবুয়ের মতো দূর্বল দল। তাহলে কিভাবে তা আসলো এই তালিকার এত উপরের দিকে? কপিলের ক্যারিয়ারে ওয়ানডে সেঞ্চুরী এই একটিই কিন্তু সেটা এসেছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়ে। উইকেটে এসেছিলেন ১৭ রানে ৫ উইকেট পড়ার পর। ৭৮ রানে ৭ উইকেট পড়ার পরে মদন লাল কে নিয়ে ৬২ রানের একটা জুটি করেন যেখানে মদন লালের অবদান ছিল মাত্র ১৭ রান। এরপর কিরমানিকে নিয়ে ১২৬ রানের জুটিতেও কিরমানির অবদান মাত্র ২৪ রান। প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচে কপিল করেন অপরাজিত ১৭৫ রান, সেই ম্যাচ জিতে পরে বিশ্বকাপও জিতে নেয় ভারত।
তার মানে বলা যায় বিশেষজ্ঞরা বিচার করার সময় প্রথম যে বিষয় টা গুরুত্ব দেয় তা হচ্ছে পরিস্থিতি। বিশ্বকাপের অনেক সেমি ফাইনাল বা ফাইনালের সেঞ্চুরীও এই ইনিংসের পরে চলে এসেছে। তবে কপিলের এই ইনিংস যদি জিম্বাবুয়ে না হয়ে অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হতো এবং গ্রুপ স্টেজে না হয়ে ফাইনাল ম্যাচে হতো তাহলে তার মর্যাদা আরো বাড়তো নিশ্চিত। তার মানে নক আউট স্টেজ কিংবা বড় প্রতিপক্ষও গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তা একটু পরে আসবে। এই বিষয়ে বিস্তারিত পোষ্টের পরের দিকে আলোচনা করবো।
যে সময়ে এই নির্বাচন হয় তখন খুব সম্ভবত শচীনের ওয়ানডে সেঞ্চুরী ছিল ৩৩ টি। কিন্তু এগুলোর ৩০ টি বাদ পরে গেল সেরা ১০০ টির তালিকা হতে অথচ মাইকেল বেভানের অপরাজিত ৭৮ রানের ইনিংসও সুযোগ পেয়ে যায়। সেটাও একটা ত্রিদেশীয় সিরিজের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ ছিল। ১৭৩ রানের টার্গেটের সেই ম্যাচটি ৯ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরেও বেভান জেতায় শেষ বলে চার মেরে।

 

p2
৩.
ওয়ানডেতে তো তবুও শচীনের তিনটা ইনিংস জায়গা পেয়েছে, টেষ্টে একটিও জায়গা পায়নি। শচীনের ৫১ টি টেষ্ট সেঞ্চুরীর অন্তত ৩৫ টি আমি নিজের চোখে দেখেছি। সত্যি বলতে লিষ্টে আসার মতো কোন ইনিংস ছিল বলে আমি মনে করি না। একটা অবশ্য খুব কাছাকাছি ছিল। সেই ইনিংসের কথা কিছুটা বলি।
ম্যাচটা ১৯৯৯ সালের, প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। চেন্নাইয়ে ২৭১ রানের টার্গেট তাড়া করতে গিয়ে ৮২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলে ভারত। সেখান থেকে নয়ন মঙ্গিয়াকে নিয়ে ১৩৬ রানের জুটি গড়ে যাতে মঙ্গিয়ার অবদান ৫২ রান। জয় থেকে ১৭ রান দূরে থাকতে সাকলাইন মুশতাকের বলে আউট হয়ে ফেরত আসেন। পরের ৪ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে ভারত ম্যাচ হেরে গেল। ম্যাচ শেষ করে আসতে না পারার দূর্নামটাও আঠার মতো লেগে থাকলো শচীনের গায়ে। আমার দেখা শচীনের সেরা টেষ্ট ইনিংস এটাই।
শচীন ফ্যানদের অবশ্য কিছু যুক্তি থাকে। সব কাজ কি শচীনের একার? তার দলের বাকি রা মিলে কি ১৭ রান করতে পারতো না? কথাটা একেবারে ফেলনাও নয়। শেষ পর্যন্ত থেকে কাজ শেষ করে আসাটা নিঃসন্দেহে কঠিন। তবে আমার দেখায় শচীন ভক্তদের এই যুক্তিটা বিচার করার সময় বিশেষজ্ঞরা মাথায় রাখে না। নয়তো নিশ্চিতভাবেই শচীনের কিছু ইনিংস তালিকায় এসে পড়তো। আর কেউ যদি শেষ পর্যন্ত থেকে কাজটা শেষ করে আসে তাহলে সে নিশ্চয়ই যিনি পারেন নি তার চেয়ে বেশী মর্যাদা পাবে।
এই শেষ করে আসার কাজে ব্রায়ান শচীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকে। ১৯৯৯ সালে অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লারার কাজটা ছিল আরো অনেক কঠিন। অষ্ট্রেলিয়া তখন দূর্দান্ত একটা দল। ম্যাকগ্রা, গিলেস্পি, ওয়ার্ন আর ম্যাকগিলের মতো বোলার একই সাথে খেলছে। সিরিজের প্রথম টেষ্টেই উইন্ডিজ ৫১ রানে অলআউট হয়েছে। দ্বিতীয় টেষ্টে লারার ম্যাজিকাল ২১৩ রান আর উইন্ডিজের জয়। এই ইনিংসটা আছে সেরা ১০০ এর ১৪ নম্বরে। তবে এটাও ছাড়িয়ে যায় ৩য় টেষ্টে। এখানে লক্ষ ৩০৮ রান আর ১০৫ রানেই নেই ৫ উইকেট। জিমি এডামসের সাথে ১৩৩ রানের জুটিতে জিমির অবদান মাত্র ৩৮ রান। এখান থেকে ১০ রানে পড়ে ৩ উইকেট। এরপর এমব্রোসের (১২ রান) সাথে গড়েন ৫৪ রানের জুটি। ৬ রান বাকি থাকতে এমব্রোস আউট হলে ওয়ালসকে নিয়ে ১ উইকেটে ম্যাচ জিতেন লারা এবং এখানে ওয়ালসের অবদান ০ রান। ইনিংসটি সেরার তালিকায় ২ নম্বরে আসে। ম্যাকগ্রার (৫/৯২) আগুন জড়ানো বোলিং এর সামনে লারা অপরাজিত থাকেন ১৫৩ রানে, ইনিংসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান ৩৮।। শেষ টেষ্টে লারা ৮২ বলে ১০০ রানের একটা ইনিংস খেলেন কিন্তু ম্যাচ জেতাতে পারেন নি। তবে লারার একক নৈপূন্যেই সর্বজয়ী অষ্ট্রেলিয়ার সাথে ২-২ এ সিরিজ ড্র করেন।
অনেকের ধারণা ছিল যে ক্যারিয়ার শেষের পরে হয়তো টেন্ডুলকারের কোন ইনিংস এমন তালিকায় জায়গা পাবে। কিন্তু পরবর্তীতে ২০১৬ সালে গত ৫০ বছরের সেরা ৫০ টি টেষ্ট পারফর্মেন্সের তালিকা করা হয়, সেখানেও শচীনের কোন ইনিংস জায়গা পায়নি।
টেন্ডুলকার বনাম লারার বিষয়ে তার সমকালীন খেলোয়াড় কিংবা বোলারের বেশীর ভাগই এগিয়ে রাখেন লারাকে এই ক্রুশিয়াল ম্যাচ জয়ী ক্ষমতার কারণেই। অথচ বাকি ফ্যক্টরগুলোতে শচীন অনেক খানিই এগিয়ে। এই সম্পর্কে পন্টিং এর কথাটা শুনতে পারেন, ‘পরদিন টেন্ডুলকার ব্যাটিং করবে জানলে আমার রাতের ঘুমে সমস্যা হতো। কিন্তু ব্যাটসম্যনের নাম লারা হলে রাতটা বিনিদ্রই কাটতো। চাইলে টেন্ডুলকারকে আটকে রাখার একটা পথ বের করা সম্ভব ছিল কিন্তু লারা আধঘন্টার মধ্যে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারতো। আমার কাছে সেঞ্চুরীর চেয়ে ম্যাচ বা সিরিজ জেতানোটাই সব সময় বেশী মূল্য পেয়ে এসেছে’।
তা এই কাজটা কি সবসময় লারা করতে পেরেছেন? তা কিন্তু নয়, ক্যারিয়ারের কিছু সময় পেরেছেন, কিছু সময় পারেন নি। কিন্তু যেদিন পেরেছেন সেদিন সেরা ফর্মের ম্যাকগ্রাকেও ছিড়ে ফেলেছেন। অফ ফর্মের বোলারকে ধংস করার চেয়ে বেষ্ট ফর্মের বোলার কে মার খেতে দেখা অনেক বেশী রোমাঞ্চকর । আসলে যারা ম্যাচ রিড করতে পারে তাদের কাছে টেন্ডুলকার অনেক বেশী প্রেডিক্টেবল। টেন্ডুলকার কবে ভালো করবে সেই অনুমান সবসময় না মিললেও প্রেশারে খারাপ করবে সেটা বলে দেওয়া যেত। আর লারা সবসময়েই আনপ্রেডিক্টেবল। কেনিয়ার সাধারণ বোলারের বিপক্ষেও আউট হয়ে যেতে পারে আবার সেরা ফর্মের ম্যাকগ্রা কিংবা ডোনাল্ডের বিপক্ষেও সেঞ্চুরী করে ম্যাচ বের করে আনতে পারে।
এই কারণেই সেরার তালিকায় লারার ৩ টি ইনিংস জায়গা পায় ( ২, ১০ আর ১৪ নম্বরে) কিন্তু টেন্ডুলকারের যেন এই জায়গায় প্রবেশাধিকারই নেই। লারার সেঞ্চুরীর কথা বাদ দেই, সেরা চল্লিশে ডেভ নার্স আর বিশ্বনাথের দুটি ইনিংস ৯০ এর।
ক্রুশিয়াল ম্যাচ সম্পর্কে কি কিছু ধারণা পাওয়া গেল?

 

untitled1

 
৪.
এখন আসি ফুটবল নিয়ে। ফুটবলে ক্রুশিয়াল ম্যাচ বলতে আমরা কি বুঝি? আসলে আমার জানামতে ফুটবলে এরকম সরাসরি কোন ফর্মুলা নেই। এটা বের করার জন্য ম্যাচ রিড করার ক্ষমতা থাকতে হবে। স্বাভাবিক ভাবেই এই ক্ষমতাটা বেশীর ভাগ দর্শকেরই থাকে না। তবে কোন ম্যাচকে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বেশী মুল্য দেয় সেটা দেখে আমরা একটা ফর্মুলা বের করার চেষ্টা করি। ফর্মূলাটা ১০০ % সঠিক হবে এমন নয় তবে কাছাকাছি যাওয়া যেতে পারে।
স্বাভাবিক ভাবে বলা যায় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর হচ্ছে বিশ্বকাপ, এর পর ইউরো কাপ। তারপর একে একে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, বিভিন্ন ঘরোয়া লীগ আসবে মান অনুযায়ী। আমি জানিনা মর্যাদাপূর্ণ আসরে কোপা, অন্যান্য মহাদেশীয় টুর্নামেন্টকে কিংবা কনফেডারেশন কাপকে কোন অবস্থানে রাখা হবে?
এখন কেউ যদি বলে বিশ্বকাপে বড় দলের বিপক্ষে ভাল করা মানেই ক্রুশিয়াল ম্যাচে ভালো করা তাহলে সেটা কতটুকু সঠিক হবে? ক্রিকেটে কিন্তু এই ফর্মুলা খাটে নি। আমি সবসময় একটা কথা বলি, যে কোন সূত্র এমন হওয়া উচিত যেন তা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক ফলাফল দেয়।
এখন এই ফর্মুলাটা ফুটবলের দুটি ম্যাচে একটু খাটিয়ে দেখা যাক।
২০১৪ বিশ্বকাপের জার্মানী বনাম পর্তুগাল আর ২০১৬ ইউরোর পর্তুগাল বনাম হাঙ্গেরীর ম্যাচ দুটি তুলনা করলে কোনটিকে বেশী ক্রুশিয়াল ম্যাচ বলবেন এবং মুলারের হ্যাট্রিক আর রনের দুই গোলের মাঝে কোন পারফর্মেন্সকে বেটার বলবেন? সূত্র অনুযায়ী পর্তুগাল হাঙ্গেরীর চেয়ে বড় দল, কাজেই জার্মানীর প্রতিপক্ষের চেয়ে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ তুলনামূলক সহজ। এছাড়া বিশ্বকাপ থেকে ইউরো কাপের মর্যাদাও নিশ্চয়ই বেশী। মুলার হ্যাট্রিক করে ম্যাচ জিতিয়েছে, রন দুই গোল করে ম্যাচ ড্র করেছে। তাহলে সূত্র অনুযায়ী মুলারের পারফর্মেন্সই গ্রেট হওয়া উচিত। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় রনের পারফর্মেন্সই গ্রেট হবে। কারণ মুলার যে ম্যাচ জিতিয়েছিল সেটা জার্মানী হেরে গেলেও ফিরে আসার সুযোগ ছিল। কিন্তু হাঙ্গেরীর সাথে ম্যাচে হেরে গেলে পর্তুগালের ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা ছিল না। তাছাড়া সেই ম্যাচে হাঙ্গেরীও অনেক ভালো খেলেছে যা কিনা জার্মানীর বিপক্ষে পর্তুগাল খেলতে পারেনি। এবং আমার মনে হয় যারা খেলা বোঝে তাদের সবাই আমার সাথেই একমত হবেন। এবং হাঙ্গেরীর বিপক্ষে রনের এই পারফর্মেন্স ওয়েলসের বিপক্ষে সেমির চেয়েও এগিয়ে থাকবে। তাহলে ফর্মূলাটা আসলে কি হওয়া উচিত?

 

a1
৫.
বড় টুর্নামেন্ট, বড় প্রতিপক্ষ এসব কিছুই বিবেচনায় আসবে তবে আমার মনে হয় সবার আগে বিবেচনায় আসবে প্রেক্ষাপট।
নির্দিষ্ট ম্যাচটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ কোন দলের জন্য সেটা বুঝতে হবে। এবং সেই ম্যাচের পারফর্মেন্স পরবর্তীতে টুর্নামেন্টে কতটা ইম্প্যাক্ট ক্রিয়েট করতে পেরেছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এর পর আসবে প্রতিপক্ষের শক্তি । এখানে একটা বিষয় বুঝতে হবে। বড় প্রতিপক্ষ মানেই কিন্তু বড় দল বিষয়টা এমনটা নয়। নিজ দলের চেয়ে প্রতিপক্ষ কতটা বড় সেটা বিবেচনার বিষয়। পর্তুগালের বিপক্ষে স্পেন যতটা বড় প্রতিপক্ষ, দ. কোরিয়ার বিপক্ষে পর্তুগাল তার চেয়েও বড় প্রতিপক্ষ। ২০০২ এর বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচটার কথাই ভাবুন। ব্রাজিলের জন্য ম্যাচটা যতটা ক্রুশিয়াল, জার্মানির জন্য ম্যাচটা তার চেয়েও বেশী ক্রুশিয়াল ছিল প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনায়।
এরপর আসবে ম্যাচের পরিস্থিতি। আপনার নিজের দল যত খারাপ খেলবে সেই অবস্থা থেকে জিতে আসলে ক্রেডিট তত বাড়বে এবং কোন খেলোয়াড় যদি একক ভাবে দলকে বাচায় তাহলে তার ক্রেডিট তত বেশী হবে।
একটা উদাহরণ দিয়ে বলার চেষ্টা করি। মনে করুন ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমি ফাইনালে জার্মানী ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারালো। ব্রাজিল সেই টুর্নামেন্টে স্বাগতিক ছিল, দলটাও খারাপ ছিল না। যদিও ইনজুরির কারণে নেইমার আর ব্যান থাকার জন্য থিয়াগো সিলভা না থাকায় ব্রাজিল যথেষ্ট দূর্বল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু রেকর্ডে লেখা থাকবে জার্মানী ব্রাজিলকে ৭ গোলে হারিয়েছে। এখন এই ম্যাচের তুলনায় ২০১০ বিশ্বকাপের ব্রাজিল বনাম নেদারল্যান্ডের ম্যাচটা বেশি ক্রুশিয়াল ছিল। এবং সেই ম্যাচে প্রথমে ব্রাজিলই গোল করে। কিন্তু পরে স্নাইডার একক ক্রেডিটে ২ গোল করে ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয়।
এরপরে যে বিষয়টা আসবে তা হচ্ছে টুর্নামেন্ট। যদি আগের সব প্যারামিটার ঠিক ভাবে থাকে তাহলে টুর্নামেন্ট একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে তবে আগের গুলো মিস করলে না।
ক্রুশিয়াল ম্যাচ আসলে দল ভেদেও ভিন্ন হতে পারে। একই ম্যাচ দুই দলের জন্য ক্রুশিয়াল নাও হতে পারে। যেমন হাঙ্গেরীর বিপক্ষে পর্তুগালের ইউরোর ম্যাচটার কথাই ধরুন। পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্তুগালের জন্য ম্যাচটা যতটা ক্রুশিয়াল ছিল হাঙ্গেরীর জন্য ততটা ছিল না। সেই ম্যাচে পর্তুগাল হেরে গেলে নিশ্চিত বিদায়, হাঙ্গেরী ১ গোলে হারলেও পরের পর্বে যাওয়ার সুযোগ থাকতো।
এবারের ক্লাব বিশ্বকাপের কথাই ধরুন। রিয়াল মাদ্রিদের জন্য ম্যাচটা যত ক্রুশিয়াল ছিল কাশিমার জন্য তার চেয়েও বেশী ছিল। এই ম্যাচেই ক্রিসের পারফর্মেন্স গ্রেট ছিল কিন্তু শিবাসাকির পারফর্মেন্সকে কি আপনি ফেলে দিতে পারবেন? এত ছোট দল হয়েও রিয়ালের মতো দলকে চাপে ফেলা মুখের কথা নয়। ক্রিসের পারফর্মেন্স গ্রেট ছিল কিন্তু প্রতিপক্ষ কাশিমা না হয়ে বায়ার্ন কিংবা বার্সা হলে কি একই পারফর্মেন্স ক্রিস করে দেখাতে পারতো? করে দেখাতে পারলে সেটা নিশ্চয়ই আরো গ্রেট হতো। আমার স্মৃতিতে এমন ম্যাচ নেই।
অনেক সময় আবার ফেভারিট দলে খেলার পরেও নিজ সতীর্থদের খারাপ খেলার কারণে ম্যাচ ক্রুশিয়াল হতে পারে। মনে করুন কোন ম্যাচে যদি ১ গোল খেয়ে পিছিয়ে পরেন তাহলে সেই ম্যাচে ফেরা কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু যদি ২ গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়েন তাহলে সেটা আরেকটু বেশী কষ্ট হবে, যদি ৩ গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়েন তাহলে সেই ম্যাচ বের করা অসম্ভবের পর্যায়ে চলে যাবে। কিন্তু কেউ যদি ৩ গোল খেয়ে ম্যাচ জিতে তাহলে সেটা কেমন পারফর্মেন্স হবে একটু ভেবে দেখুন। এমন একটা ঘটনা ঘটিয়েছিলেন পর্তুগালের ইউসোবিও ১৯৬৬ বিশ্বকাপে। কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের মুখোমুখি হয় সেই বিশ্বকাপের বিস্ময় উত্তর কোরিয়া। গ্রুপ পর্ব থেকে চিলি আর ইটালীকে হটিয়ে কোয়ার্টারে ওঠা উত্তর কোরিয়া প্রথম ২৫ মিনিটেই ৩ গোল করে এগিয়ে যায়। এরপরেই শুরু হয় ইউসোবিও ম্যাজিক। ২৭,৪৩,৫৬ ও ৫৯ মিনিটে টানা চার গোল করে শেষ পর্যন্ত ৫-৩ গোলে উত্তর কোরিয়াকে হারায়।
উত্তর কোরিয়া তো তবুও ছোট দল ছিল ( পারফর্মেন্স বিবেচনায় যদিও অনেক বড়দের ছাপিয়ে গিয়েছিল), এর জন্য ইউসোবিওর পারফর্মেন্স থেকে কিছু পয়েন্ট কেটে রাখতে পারেন। তবে ১৯৬২ এর চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে ইউসোবিওর পারফর্মেন্স নিয়ে সেটা বলার অজুহাতও থাকে না। সেই ম্যাচে বেনফিকার প্রতিপক্ষ ছিল পুসকাস আর ডি স্টেফেনোর রিয়াল। পুসকাসের হ্যাট্রিকের ম্যাচে ইউসোবিও ২ গোল করেন। ম্যাচটা বেনফিকা জেতে ৫-৩ গোলে।
তবে এরপরেও ইউসোবিওর এই দুই পারফর্মেন্স পিছিয়ে থাকবে ৮২ এর রসির কাছে। জিকো আর সক্রেটিসের সেই ব্রাজিল সর্বকালের অন্যতম সেরা দল হওয়ার টার্গেট নিয়েই বিশ্বকাপে গিয়েছিল। কিন্তু হেরে যায় রসি ম্যাজিকের কাছে। এবং সেই ব্রাজিলকে বাদ দেয়া ইটালীই ৮২ এর বিশ্বকাপ জেতে, সেটাও রসির ম্যাজিকেই। এবং রসির এই ম্যাচটা ক্রুশিয়াল ম্যাচের তালিকায় আমার ধারণা বিশ্বকাপ ২০১০ এর ফাইনালের চেয়েও এগিয়ে থাকবে।
এখানে অনেকেই একটা কথা বলতে পারে যে ম্যাচগুলোর কথা আমি বলছি সেগুলো অনেক আগের ম্যাচ। বর্তমানে এভাবে ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়। তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে অনেক আগে কিন্তু এমন ম্যাচ অনেক হয়নি। এবং কিছুদিন আগেও এই ধরণের ম্যাচের রেকর্ড পাওয়া যাবে। ২০০৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনাল টা দেখতে পারেন। এরকম ম্যাচে যুগে যুগে অল্প সংখ্যকই হয়।
আচ্ছা এখন পর্তুগালের সুইডেনের বিপক্ষে প্লে অফ ম্যাচটার কথা প্রসঙ্গে একটু বলি। সেই ম্যাচের অবস্থা এমন ছিল যে দল হারবে সেই দলই বাদ পড়বে। সেই ম্যাচের তুলনায় মেসির একটা ম্যাচের তুলনা দেই। ব্রাজিলের বিপক্ষে একটা ফ্রেন্ডলি ম্যাচে ৪-৩ গোলে জেতা ম্যাচে মেসি হ্যট্রিক করেন। আপনি কোন ম্যাচের পারফর্মেন্সকে এগিয়ে রাখবেন?
এবার আরেকটা প্রেক্ষাপট আনি। মনে করুন আর্জেন্টিনা বাছাইপর্বে এমন একটা অবস্থায় পড়ে গেল যে শেষ ম্যাচ ব্রাজিলের বিপক্ষে না জিতলে বিশ্বকাপে জেতে পারবে না। ম্যাচটা তখন নিঃসন্দেহে ক্রুশিয়াল হবে। এখন মনে করুন সেই ম্যাচে ব্রাজিল আগে দুই গোল করে ফেলার পরে আর্জেন্টিনা জিতলো তাহলে আরেকটু বেশী ক্রুশিয়াল হবে। আচ্ছা মনে করুন প্রতিপক্ষ ব্রাজিল না হয়ে চিলি হলো তাহলে কোন পরিস্থিতি বেশী ক্রুশিয়াল হবে? পরিস্থিতি বিবেচনায় চিলির সাথে ম্যাচটাও ক্রুশিয়াল হতে পারে। কিভাবে সেটা বলি। ‘মনে করুন শেষ ম্যাচের অবস্থাটা এমন যে ব্রাজিল হারলে ক্ষতি নেই কিন্তু আর্জেন্টিনাকে যেতে হলে জিততে হবে এর চেয়ে চিলি অথবা আর্জেন্টিনার যে কোন একজন যাবে’ – এই পরিস্থিতিতে চিলি কঠিন প্রতিপক্ষ। তার মানে প্রতিপক্ষ তুলনামূলক দূর্বল হলেও পরিস্থিতির কারণে সেটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যেতে পারে। ম্যাচ সবচেয়ে ক্রুশিয়াল হবে যদি ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মাঝে যে কোন একজন বিশ্বকাপে যেতে পারবে এমন পরিস্থিতির ম্যাচে ব্রাজিল এগিয়ে যাওয়ার পরেও আর্জেন্টিনা জিতে ।
ক্রুশিয়াল ম্যাচের ক্ষেত্রে আমার প্রথম ফর্মুলাটা একটু বলি। এই ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর গুলো পর্যায় ক্রমে আসবে।
A. ম্যাচের ধরণঃ ফ্রেন্ডলি নাকি প্রতিযোগিতামূলক? ফ্রেন্ডলি ম্যাচ সবসময়েই পিছিয়ে থাকবে।
B. ম্যাচ শুরুর আগের পরিস্থিতিঃ ম্যাচটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ নিজের দলের জন্য। ম্যাচ শুরুর আগে হাঙ্গেরীর বিপক্ষে পর্তুগালের গ্রুপের ম্যাচও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বকাপের স্পেন বনাম নেদারল্যান্ডের গ্রুপ পর্বের ম্যাচের চেয়ে।
C. ম্যাচ শুরুর পরের পরিস্থিতিঃ নির্দিষ্ট ম্যাচটাতে আপনার দল কতটুকু ভালো বা খারাপ খেলছে এবং প্রতিপক্ষ কতটা ভালো বা খারাপ খেলছে। নিজের পারফর্মেন্সের গুরুত্ব কমতে থাকবে যখন প্রতিপক্ষ খারাপ খেলবে এবং নিজ দল ভালো খেলবে। আবার এই পারফর্মেন্সের গুরুত্বও বেড়ে যাবে যখন নিজ দল খারাপ খেলবে এবং প্রতিপক্ষ ভালো খেলবে।
D. প্রতিপক্ষঃ সূত্রের এই পর্যায়ে প্রতিপক্ষটা গুরুত্বপূর্ণ।
E. স্টেজঃ লীগ, গ্রুপ নাকি নক আউট স্টেজ ।
F. টুর্নামেন্টঃ বিশ্বকাপ, লীগ, চ্যাম্পিয়নস লীগ ইত্যাদি।
সবসময় যে আবার এই সিরিয়ালটা একই রকম থাকবে তা না। অনেক সময় F নম্বর পয়েন্টটাও এতটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে যে সেটা আগের পয়েন্টগুলোকে প্রশমিত করে ফেলবে। মাঝে মাঝে কিছু কিছু ব্যাপারে ব্যতিক্রম থাকবে।

 

a5
৬.
ক্রুশিয়াল ম্যাচ আর বিগ ম্যাচ এক নয়। বিগ ম্যাচে অনেকেই পারফর্ম করতে পারে কিন্তু ক্রুশিয়াল ম্যাচে সবাই স্বচ্ছন্দ নয়। এখন এই দুই ধরণের ম্যাচের মাঝে পার্থক্য কি? ক্রুশিয়াল ম্যাচ সব সময়েই বিগ ম্যাচ কিন্তু সব বিগ ম্যাচ ক্রুশিয়াল নয়। মনে করুন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনাল ম্যাচ। ২০০৭ এ মিলান বনাম লিভারপুলের ম্যাচটা বিগ ম্যাচ। কিন্তু ২০০৫ এ একই প্রতিপক্ষ একই টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলার পরেও সেটা ক্রুশিয়াল ম্যাচ।
এখন কথা হচ্ছে অনেক ছোট ছোট খেলোয়াড়ও ক্রুশিয়াল ম্যাচে সফল যেমন স্নাইডার। অথবা ক্রিকেটে শচীনের চেয়েও বেশী ক্রুশিয়াল ম্যাচে পারফর্ম করেছে লক্ষন। তাহলে কি তারা সর্বকালের সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায় আসবে? এই ফ্যক্টরটা আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বিষয়টা আসলে এমনও নয়। স্নাইডার অথবা লক্ষন অবশ্যই সর্বকালের সেরার জন্য বিবেচিত হবে না। অন্যান্য অনেক ফ্যাক্টর তাদেরকে পিছিয়ে দেবে। কিন্তু কথা হচ্ছে স্নাইডার অথবা লক্ষনের মতো খেলোয়াড় ক্রুশিয়াল মোমেন্টে যেমন পারফর্ম করেছে তেমন পারফর্মেন্স মেসির কিংবা শচীনের কেন নেই। সর্বকালের সেরার তালিকায় বাকি যারা থাকে তাদের কথা তো বাদই দিলাম।
মনে করুন একজন জি.পি.এ ফাইভ পাওয়া স্টুডেন্ট ( ধরি X) বুয়েটে পরীক্ষা দিতে আসলো। এখন সর্বশেষ যিনি সুযোগ পেয়েছেন তার নম্বর মনে করেন ১০০ তে ৮০। X পেল ৬০। আরেকজন জি.পি.এ ৪ পাওয়া ছেলে পেল ৭০। এখন এটা কি বলা হবে না জি.পি.এ ৪ পাওয়া ছেলেটাও ওর চেয়ে বেশি পায়। এই জন্য জি.পি.এ ৪ পাওয়া স্টুডেন্টকে বুয়েটে সুযোগ পেতে হবেনা।
স্নাইডার কিংবা লক্ষন এখানে মূল বিষয় নয়, মূল বিষয় হচ্ছে শচীন বা মেসির এই গুণ থাকাটা খুব জরুরী ছিল সেরার তালিকায় উপরে উঠার জন্য। এই গুণটা রনের মাঝে কিছু পরিমানে আছে, সেটা মেসির চেয়ে বেশি কিন্তু কোনভাবেই ক্রুয়েফ, ম্যারাডোনা, জিদান এমনকি ইউসোবিওর চেয়েও বেশী নয়।
এখন কথা হচ্ছে ক্রুশিয়াল ম্যাচের পয়েন্টে পিছিয়ে থাকলেই কি আপনি গ্রেট হতে পারবেন না? বিষয়টা এমনও নয়। সেরা ১০০ টেষ্ট ইনিংসে যে শচীনের ১ টা ইনিংসও জায়গা পায় না সেই শচীনই আবার গত শতাব্দীর দ্বিতীয় সেরা টেষ্ট ব্যাটসম্যান হয়। তার মানে এই পয়েন্টে পিছিয়ে থাকলেও বাকি পয়েন্টগুলোতে যদি আপনি এক্সট্রা অর্ডিনারি হন তাহলে আপনার পক্ষেও সম্ভব সেরার তালিকায় উপরে উঠে আসা।
এই অন্যান্য ফ্যাক্টরগুলোতে মেসি কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো অনেকের চেয়ে অনেক এগিয়ে। হয়তো বাকি সব ফ্যক্টরে এগিয়ে থেকে এই এক ফ্যাক্টরের গ্যাপটা কাভার করে দিতে পারবে। গোল, অ্যাসিস্ট, ইনডিভিজুয়াল অ্যাচিভমেন্ট, ট্রফি সব কিছুতেই তো ম্যারাডোনা পেলের চেয়ে পিছিয়ে থাকবে। কিন্তু এরপরেও অনেকে পেলের চেয়ে ম্যারাডোনাকে কেন এগিয়ে রাখা হয়? কারণ সেই ক্রুশিয়াল ম্যাচে বড় পারফর্মেন্স করার কারণে। এটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যেখানে ভালো করলে অন্যান্য পয়েন্টে অনেক পিছিয়ে থাকলেও আপনার পক্ষে সম্ভব লড়াইয়ে চলে আসা। মেসি কিংবা রন যদি ক্রুশিয়াল ম্যাচের পয়েন্টে একটু ভালো হতো তাহলে অনেক আগেই পেলে ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে যেত।

 

a6
৭.
আচ্ছা ক্রুশিয়াল ম্যাচে জেতাটাই কি সব কিছু? এমনটাও নয়। জেতা কিংবা হারা অনেক সময়েই আপনার দলের উপরেও নির্ভর করবে। মূল দেখার বিষয় হচ্ছে আপনি কতটা চেষ্টা করেছিলেন? সুইডেন আর পর্তুগালের প্লে অফ ম্যাচের কথাটাই ভাবুন। সেই ম্যাচে কিন্তু ইব্রা তার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল, ২ টি গোলও করেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলকে বাচাতে পারেনি। এরকম চেষ্টাও মর্যাদা পাবে তবে এই ম্যাচে রন আরেকটু এগিয়ে যাবে কারণ ইব্রার চেয়ে তার পারফর্মেন্স আরেকটু ভালো ছিল।
গ্রেট হবার জন্য ক্রুশিয়াল ম্যাচ জেতাটা গুরত্বপূর্ণ না। যদি এমন হয় যে আপনার দল এতটাই ভালো যে আপনি সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন না তখন সেটা আপনার দোষ হবে না। কিন্তু আপনি যদি মুখোমুখি হয়ে ফেল করেন তখন সমস্যা।ভালো দল পেলে আপনার ক্যারিয়ারে ক্রুশিয়াল ম্যাচ কম আসবে সেই ক্ষেত্রে আপনাকে গুটি কয়েক ম্যাচেই নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। দল ভালো খেলেছে এমন অবস্থায় ভালো খেলা তুলনামূলক ভাবে সহজ। কিন্তু ক্যারিয়ারে এমনও মূহুর্ত আসবে যেদিন আপনার সতীর্থরা ব্যর্থ হবে, প্রতিপক্ষে শক্তি অনেক বেশী থাকবে এবং তারা ভালোও খেলবে। সেদিন এক্সট্রা অর্ডিনারি খেলে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেয়ার মাঝে একটা অন্য রকম বীরত্ব আছে যা কিনা অনেক গ্রেটরা করে দেখিয়েছেন। এই কাজ করতে না পারলে আপনি যত গ্রেটই হন না কেন যারা রোমাঞ্চ প্রিয় তাদের মনের কাছে কখনোই পৌছুতে পারবেন না।

 

শেষ কথাঃ লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেল। এই পোষ্টে শুধু সূত্রের প্রথম অংশ টুকু লিখলাম। আমার মাথায় সব মিলিয়ে প্রায় ৫ টা সূত্র আছে। তবে আমি কখনোই এগুলো নিয়ে ১০০% নিশ্চিত নই। কখনো যদি বিশেষজ্ঞরা ক্রিকেটের মতো এমন ক্রুশিয়াল ম্যাচের লিষ্ট করে তাহলে নিজের মতের সাথে সেগুলো মিলিয়ে দেখবো। আর আমার এই সূত্র গুলোতে কিছু ভুল থাকলেও থাকতে পারে। তবে আমার মনে হয় ভুল থাকলেও সেটা মাইনর হবে যা কিনা একটু ফাইন টিউন করলে পারফেক্ট করা সম্ভব। অনেকের কাছেই বিষয়গুলো বোধগম্য নাও হতে পারে। প্রতিটা পয়েন্টে আরেকটু বিস্তারিত ভাবে বললে ভালো হতো। কিন্তু এমনিতেই পোষ্ট বড় হয়ে গেল। তাই আজ এখানেই সমাপ্তি। পরের পর্বে আশা করি আরেকটু বিস্তারিত বলবো। আপনাদের যে কেউ যে কোন ধরণের প্রশ্ন করতে পারেন। যেহেতু আমি নিজেই পোষ্ট নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত নই তাই আপনাদের প্রশ্ন আমাকে আরো কিছু বিশ্লেষন করতে সাহায্য করতে পারে।
তবে একটা কথা মাথায় রাখবেন, ক্রিকেট নিয়ে আমার অনুমান গুলো বিশেষজ্ঞদের সাথে কিন্তু ৯৫% মিলে গিয়েছিল।

Leave a Reply