বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগঃ সম্ভাবনা এবং প্রাপ্তির মেলবন্ধন!

যে কোন দেশের ক্রিকেটে উন্নতির জন্য ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতির কোন বিকল্প নেই। ঘরোয়া ক্রিকেট স্ট্রাকচার যাদের যত উন্নত সেই দেশ ক্রিকেটে ততটাই উন্নতি করতে পারবে। জাতীয় দলের প্লেয়ার তো এই ঘরোয়া লীগ থেকেই আসবে। বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটের স্ট্রাকচার অবশ্য তেমন শক্ত নয়। তারপরও নিজেদের মেধা দিয়েই অনেকদুর এগিয়েছে বাংলাদেশ খেলোয়াড়রা। অতি সম্প্রতি ফ্রাঞ্চাইসি ভিত্তিক ঘরোয়া লীগ আয়োজন করার মাধ্যমে ঘরোয়া ক্রিকেটে উন্নতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত কাল শেষ হল বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগের পঞ্চম আসর। চার দিনের ম্যাচের এই লিগে অংশ নিয়েছিল চারটি দল। বিসিবি নর্থ জোন, প্রাইম ব্যাংক সাউথ জোন, ওয়াল্টন সেন্ট্রাল জোন এবং ইসলামী ব্যাংক ইস্ট জোন।

চারটি দলের লীগ হলেও শুরু থেকেই শিরোপা রেস সীমাবদ্ধ ছিল মাত্র দুইটি দলের মধ্যেই। বিসিবি নর্থ জোন এবং প্রাইম ব্যাংক সাউথ জোন ছিল শিরোপার দাবীদার! শেষ রাউন্ড পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে শিরোপা নির্ধারণের জন্য। অবশেষে প্রাইম ব্যাংক সাউথ জোনকে পিছনে ফেলে শিরোপা জয় করে নিয়েছে বিসিবি নর্থ জোন। ছয় ম্যাচে দুইটি জয় এবং চারটি ড্র নিয়ে শিরোপা জয় করে বিসিবি নর্থ জোন। একটি জয় এবং পাঁচটি ড্র নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে প্রাইম ব্যাংক সাউথ জোন।

বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগের এবারের আসরে ব্যাটসম্যানদের পারফর্মেন্স ছিল নজরকারা। জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় কিংবা উদীয়মান ক্রিকেটার সবাই ছিলেন আপন আলোয় উজ্জ্বল! নিজেদের পারফর্মেন্স দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে জাতীয় দলের ডাক পাবার হাতছানির কাছাকছিও রয়েছেন অনেকে। ইতিমধ্যেই লিটন দাস শ্রীলংকার বিপক্ষে নিজের জায়গাও করে নিয়েছেন। একই সাথে প্রত্যাশিত অনেকেই প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ (বিসিএল) এর এবারের আসরে ব্যাক্তিগত রান তোলার শীর্ষে রয়েছেন তুষার ইমরান। ৬ ম্যাচে ৯ ইনিংসে ব্যাট করে তুষার এর সংগ্রহ ৭৩১ রান। ৯১.৩৭ এভারেজে তুলেছেন এই রান। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন নাইম ইসলাম। ৬ ম্যাচে ৯ ইনিংসে ব্যাট করে ৮২.১৪ এভারেজে রান করেছেন ৫৭৫ টি। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন আর এক সাবেক জাতীয় দলের খেলোয়াড় শাহরিয়ার নাফিস। ৭০.১৪ এভারেজে করেছেন ৪৯১ রান। চতুর্থ অবস্থানও সাবেক জাতীয় দলের খেলোয়াড় এর দখলে! ৫৭ এভারেজে ৪৫৬ রান তুলে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছেন জুনায়েদ সিদ্দিকি। পঞ্চম অবস্থানে আছে ধীমান ঘোষ। ৫০ এভারেজে ৪০০ রান করেছেন এই উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান। ষষ্ঠ অবস্থানে আছে তরুন তুর্কী সাইফ হাসান। ৩৫.৭২ এভারেজে সাইফের সংগ্রহ ৩৯৩ রান। সপ্তমে আছেন আর এক তরুণ উদীয়মান নাজমুল হুসাইন শান্ত। ৬১.৩৩ এভারেজে শান্তর সংগ্রহ ৩৬৮ রান।

রানের মাঝে ছিলেন অন্যান্য তারকা খেলোয়াড়রাও। মাত্র চার ইনিংস ব্যাট করে ইমরুল কায়েসের সংগ্রহ ৫৭.৭৫ এভারেজে ২৩১ রান। শ্রীলংকা টেস্ট ম্যাচে জায়গা পাওয়া উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান লিটনের পারফর্মেন্সও ছিল উল্লেখযোগ্য। মাত্র চার ইনিংসে ৬৩.২৫ এভারেজে করেছিলেন ২৫৩ রান। বিস্ময় বালক আফিফ হোসেনও ছিল নিজ আলোয় উজ্জ্বল। ৩৬.৮৫ এভারেজে আফিফের সংগ্রহ ২৫৮ রান। অন্যান্যদের তুলনায় নাসির হোসেনের পারফর্ম ছিল একদমই সাদামাটা! ৩০.৮৭ এভারেজে করেছেন ২৪৭ রান।
ব্যাক্তিগত সর্বাধিক রানের মত সর্বোচ্চ ইনিংসের খাতায়ও সবার উপরে আছেন তুষার ইমরান। তুষারের ২২০ রানের ইনিংসটাই এবারের বিসিএল এ সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। তার পরেই আছেন লিটন দাসের ২১৯ রানের ইনিংস। তিন নাম্বারে আবারো তুষার ইমরান এর ২১৭ রানের ইনিংস। চতুর্থে আর এক ডাবল সেঞ্চুরিয়ান নাফিসের অপরাজিত ২০৭ রানের ইনিংস। নাইম আছেন পঞ্চম পজিশনে ১৮৫ রানের ইনিংস নিয়ে।

এবারের বিসিএল এ মোট সেঞ্চুরির ইনিংসের সংখ্যা ২৩ টি। যার মধ্যে ডাবল সেঞ্চুরি ছিল ৪ টি। সর্বাধিক সেঞ্চুরির মালিক নাইম ইসলাম। নাইমের সেঞ্চুরির সংখ্যা ৪ টি। দ্বিতীয় স্থানে যুগ্ম ভাবে আছেন চার জন। আফিফ হুসাইন, ফরহাদ হোসেন, নাজমুল হুসাইন শান্ত এবং তুষার ইমরানের রয়েছে ২ টি করে সেঞ্চুরি। সাদমান ইসলাম, ইমরুল কায়েস, লিটন দাস, ফজলে মাহমুদ, ধীমান ঘোষ, মোহাম্মদ মিথুন, নুরুল হাসান্‌ শাহরিয়ার নাফিস, জুনায়েদ সিদ্দিকি, শুভাগত হোম এবং ইয়াসির আলি প্রত্যেকে করেছেন একটি করে সেঞ্চুরি।

বোলিং এর ক্ষেত্রে তরুণদের চেয়ে অবশ্য অভিজ্ঞরাই বেশি এগিয়ে ছিল এই আসরে। যুগ্ম ভাবে প্রথমে আছেন সাঞ্জামুল ইসলাম এবং শুভাগত হোম। দুজনই নিয়েছেন ২৫ টি করে উইকেট। ১ উইকেট কম নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আব্দুর রাজ্জাক। রাজ্জাকের সংগ্রহ ২৪ টি উইকেট। ১৫ উইকেট নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছেন উদীয়মান সিমার আবু জায়েদ। ১৪ উইকেট নিয়ে তার পরেই আছেন আবুল হাসান।

লঙ্গার ভার্শন ক্রিকেটে পার্টনারশিপ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এবারের বিসিএলে পার্টনারশিপ রেকর্ড ভালো কিছুর দিকেই ইঙ্গিত করে। চলুন দেখা যাক, কেমন ছিল প্রতি উইকেটে সেরা পার্টনারশিপ!
প্রথম উইকেট জুটি – ১৯৭ রান – আফিফ হুসাইন এবং ইমতিয়াজ হুসাইন
দ্বিতীয় উইকেট জুটি – ২২২ রান- আফিফ হুসাইন এবং তাসামুল হক।
তৃতীয় উইকেট জুটি- ২৩০ রান – মোহাম্মদ মিথুন এবং তুষার ইমরান
চতুর্থ উইকেট জুটি- ২১৫ রান- তুষার ইমরান এবং শাহরিয়ার নাফিস
পঞ্চম উইকেট জুটি- ১৯৭ রান- নাইম ইসলাম এবং নাজমুল হুসাইন শান্ত
ষষ্ঠ উইকেট জুটি – ১০৯ রান – তাইবুর রহমান এবং নুরুল হাসান
সপ্তম উইকেট জুটি – ১২৬ রান- নাইম ইসলাম এবং ধীমান ঘোষ
অষ্টম উইকেট জুটি – ১০৪ * রান- মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন এবং রাহাতুল ফেরদৌস
নবম উইকেট জুটি – ৮৯* রান – শাহরিয়ার নাফিস এবং নাজমুল ইসলাম
দশম উইকেট জুটি – ৪৬ রান – মোহাম্মদ শরীফ এবং আবু হায়দার

এই আসর থেকে প্রাপ্তির সংখ্যাটা খুব একটা কম নয়! লিটন দাসের জাতীয় দলে ডাক পাওয়া। জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় তুষার ইমরান, শাহরিয়ার নাফিস এবং নাইম ইসলাম সম্পর্কে বোর্ডের ইতিবাচক মন্তব্য। তরুণ খেলোয়াড় আফিফ হুসাইন, সাইফ, নাজমুল হুসাইন শান্ত এর মত খেলোয়াড়দের নিজেদের মেলে ধরা। মোসাদ্দেক সৈকত, আবু হায়দার, আবু জায়েদ যারা জাতীয় দলে সুযোগ পাবার অপেক্ষায় আছেন তাঁদের যোগ্যতা প্রদর্শন। সব মিলিয়ে সফল একটি লীগের সমাপ্তি বলাই যায়। এগিয়ে যাক বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট, এগিয়ে যাক বাংলাদেশ ক্রিকেট। চলো বাংলাদেশ।

Leave a Reply