স্কোরকার্ড ও রেকর্ড বইয়ের অন্তরালে

আচ্ছা খেলার উদ্দেশ্য কি? বিনোদনের বিষয়টা থাকার পরও, মুখ্য বিষয় সেই ফলাফলটাই; জয় নিয়েই মাঠ ছাড়তে চায় সবাই। কিন্তু সবসময়ই কি তাই? মাঝে মাঝে খেলাটা জয় পরাজয়ের সীমা ছাড়িয়ে যায়, আর তখনই খেলাগুলো জীবনের অংশ হয়ে যায়।

১৯৭৪ এর নেদারল্যান্ডস অথবা ১৯৫৪ এর হাঙ্গেরি, ১৯৯৬ এর শ্রীলংকা বা ১৯৮৩ এর ভারত, এদের কি আপনি জয় পরাজয় দিয়ে হিসেব করে পারবেন? পরের দুটো দল বিশ্বকাপ জিতেইছিলো, কিন্তু যদি ফাইনালে হেরেও যেত, তবুও কি রূপকথাই হতো না?

কোন কোন ম্যাচও এভাবেই মানুষ মনে রাখে, জেতা দলের চেয়ে হারা দলকে বেশী। মুলতান টেস্ট, সেই পাকিস্তানের ১ উইকেটে জেতা, অথবা চট্টগ্রাম টেস্টে বাংলাদেশের ২২ রানে হার। কিংবা নাগপুরে সাপের মত স্পিনিং ট্র‍্যাকে আমলা ডি ভিলিয়ার্সের প্রাণপণ লড়াইয়ের পরও দক্ষিণ আফ্রিকার হার, ওয়েলিংটন টেস্টটাও এভাবেই লেখা থাকবে কিনা জানি না, সেটার উত্তর সময়ই জানে। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ম্যাচটাকে বারবার মনে পড়বে ডেডিকেশনের এক অনন্য মাত্রা প্রমাণের ম্যাচ হিসেবে, জীবন বাজি রেখেও হার না মানার ম্যাচ হিসেবে।

বাংলাদেশের দর্শকরা একটু পাগল ধরণের। না হয় কার কোন ঠ্যাকা ভোর ৪টায় উঠে টেস্ট ম্যাচ দেখার! তবুও বাঙ্গালি দেখে, ঘুম বাদ দিয়ে হলেও দেখে, খেলাটা যে ক্রিকেট। বারবার হারের পরও জেগে থেকে দেখে, কিভাবে যেন এরা পারে…

তবে এই দর্শকদের সঙ্গে প্রতারণা প্রায়ই হয়। সেটা ক্রিকেটের তথাকথিত বড় দলরাই করে, অন্য কেউ না। সেই মুলতানে পাকিস্তান, ২০১৫তে ভারতের পর সেটা আবারও করলো ভদ্র দেশ হিসেবে যাদের বার বার সম্মান করা হয় সেই নিউজিল্যান্ড। ৫ম দিনে খেলার আগে পিচে অতিরিক্ত পানি দেওয়া হলো, অথচ আপনি জানেন, প্রতিপক্ষের একজন ব্যাটসম্যান আঙুলের চোটে আছেন, আর একজন প্রায় খোড়া। তখনও আপনি হয়ত বলবেন, জয়টাই মুখ্য। তা হলে ভাই ভারতের বিশ্বকাপে করা সেই সদাচরণও ঠিক, তাই না?

কিউইদের নিয়ে আর কথা না বাড়াই, আক্ষেপই বাড়বে। মুশফিক আর ইমরুল কে স্যালুট দিতে মন চাচ্ছে, কিন্তু তাও কম হয়ে যায়। মুশফিকের হাত লক্ষ্য করে যেভাবে বাউন্সার দিচ্ছিলো কিউই বোলাররা, তাতে মধ্যযুগের রোমান গ্ল্যাডিয়েটরদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। ব্যাথায় কাতরাচ্ছেন, তবুও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তবে গ্ল্যাডিয়েটররাও হারেন, মরে গিয়ে, মুশফিকও অনেকটা তাই, হিউজের মৃত্যুর বাউন্সারের মত আরেকটি বাউন্সারে অজ্ঞান হয়ে গেলেন, বেচে ফিরলেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে।

আর ইমরুল কায়েস? অনভ্যস্তভাবে ১৫০ ওভার কিপিং করলেন, ব্যাটিং এ নেমে ডাইভ দিতে গিয়ে নিয়ে যেতে হল হাসপাতালেই, তবুও দমলেন না, পরের দিন আবারও ব্যাট প্যাড পড়ে রেডি তিনি। আর মাঠে নেমেই কি উপহার পেলেন জানেন? মাথা বরাবর বাউন্সার। ডাক করতে গিয়ে প্রায় পড়েই গেলেন, বোলারের মুখে পৈশাচিক আনন্দে ১৬ কোটি বাঙালির চোখে জল, ক্রিকেট তুমি অনেক কিছুরই জন্ম দাও…

এই টেস্টটা হয়ত ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম ইনিংসে সর্বোচ্চ রান করে হারার রেকর্ডের অংশ হবে, তবে কাগজের পাতায় সব কথা লেখা থাকে না…

মুশফিক-ইমরুলের এই বীরত্বে নির্মম কিউই পেস ব্যাটারির নিষ্ঠুরতা কিংবা দিনশেষে বাঙ্গালির বুক এই দলটার জন্য গর্বে উচু হয়ে ওঠাটা রেকর্ড বইয়ের পাতায় পাবেন না আপনি, বিশ্বাস করুন…

পাবেন না পিচে আগেরদিন করা সেই গোলমাল অথবা পরের দিনে পাওয়া অতিরিক্ত সুবিধা…

দিনশেষে তাই স্কোরকার্ড, রেকর্ড বই আর জয় পরাজয়টাই সব না, অনেক কিছু এই সীমাটা পার হয়ে যায়, অনেক কিছু….

Leave a Reply