বিপিএল ২০১৬ গ্রুপ পর্বঃ কালোর ভিড়ে আলোর রেখা

‘এ শহর, জাদুর শহর, প্রাণের শহর ঢাকারে…’ চিরকুট ব্যান্ড গানটা কেন গেয়েছিলেন, আমি নিশ্চিত নই। তবে এতটুকু নিশ্চিত, এই কথাটা আমাদের দেশের সব সংগঠন মনে প্রাণে লালন করেন। সেটা এত তীব্রভাবে, ঢাকা ছেড়ে বোধহয় তাদের বেরুতেই ইচ্ছে করে না। ঢাকায় এখন কোথাও কৃষিকাজ করা হয় বলে মনে হয় না, কিন্তু খামারবাড়ি ঢাকায়। ঢাকার নদী বুড়িগঙ্গা, মাছ চাষের উপযুক্ত কিনা, সংশয়ের জায়গা আছে। মৎস্য ভবনটি তবে ঢাকায় কেন?

স্রোতের বিপরীতে আমাদের ক্রিকেট বোর্ডই বা কিভাবে যায়। ধারা রক্ষার্থে দেশের জাতীয় স্টেডিয়াম এই ঢাকাতেই। আর তার শতভাগ সঠিক ব্যবহার করতে কিনা, ঢাকার বাইরে খেলা নেওয়ার ইচ্ছাই জাগে না বোর্ডের। আর নিলেও তা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম পর্যন্তই।

এক বাচ্চাকে ‘সকল কাজের কাজী’ বানাতে চাইলে ছেলে এত চাপে প্রাণ সংশয়ে পড়তে বাধ্য। তেমনি দিনের পর দিন এক মাঠে খেলা হলে মাঠ তার প্রাণ হারাতে বাধ্য। তাই যখন ক্রিকেটাররা অভিযোগ করেন, উইকেট কঠিন, খেলা সোজা হচ্ছে না, আমাদের মেনে নিতে হয়। যখন এবারের বিপিএলে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে হওয়া ৬২ ইনিংসের গড় রান মাত্র ১৩৩.৯ দেখায়, বিপিএলের ইতিহাসের সর্বনিম্ন দলীয় স্কোর ৪৪ এ নামে, দোষটা ব্যাটসম্যানদের উপর চাপানোর কোনো সুযোগ দেখি না। অতিরিক্ত চাপে মাঠের ঘাসের সাথে উইকেটগুলোরও প্রাণ যাওয়ার দশা। এর মাঝেই তামিম ইকবাল যখন ৪২৫ রান করেন কিংবা মাহমুদুল্লাহ ৩৬৯ করে দলকে একাই সেমিতে তুলেন, তাতে টি২০ এর দাবি ন্যাচারাল স্ট্রোক মেকিং থাকে না, থাকে দায়িত্ববোধ আর পরিণত মস্তিষ্কের এক ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী।

রান নেই, টি২০ তাহলে কেন দেখবো? এই দাবি নিরবে তুলে প্রায় দর্শকশুন্য গ্যালারি। যেই দেশের দর্শকের কাছে খেলার টিকেট পাওয়া মানে আকাশের চাঁদ পাওয়া, সেই দেশে টি২০ ম্যাচে গ্যালারি ফাঁকা। অবিশ্বাস্য ভাবে এই দৃশ্য দেখালো এবারের বিপিএল। বিপিএল সদস্যসচিব বলেছিলেন, অফিস টাইমে, স্কুলটাইমে নিশ্চয় তারা কাজ বাদ দিয়ে খেলা দেখতে আসবে না। সদস্য সচিবের বক্তব্য আমলে নিয়ে বলি, ঢাকায় জনসংখ্যা বেশি, মানুষের ব্যস্ততা আরো বেশি। তারা খেলা দেখতে আসবেন না, স্বাভাবিক। কিন্তু ঢাকার বাইরে অবস্থা কি এইরকম? শুধু ঢাকায় বা চট্টগ্রামে কেন খেলা হবে? বিশ্বজুড়ে টি২০ লিগগুলো হয়ে আসছে হোম এন্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে। দর্শক হচ্ছে সেখানে নিয়মিত, খেলাগুলোও আকর্ষণীয় হচ্ছে। আর আমাদের বিপিএল? হোম এডভান্টেজ বলতে কোনো ব্যপারই নেই এখানে। প্রতিদিন এক মাঠে খেললে সেটা আর অ্যাওয়ে থাকে নাকি! বোর্ড চাইলে অবশ্য উদাহরণ দিতে পারে, পাকিস্তান সুপার লিগের। কিন্তু যাদের ঘরই নেই, তাদের আবার পর কি!

বিপিএলের সদস্য সচিব ভাবতে পারেন, টিভিতে বোধহয় খেলা দেখেন দর্শকেরা। হ্যা অনেকেই দেখেন, সেটা নেহায়েতই দেশের টুর্ণামেন্ট বলে। আর দেখাটা যে নিজের দেশের চ্যানেলে না, আমি দায়িত্ব নিয়েই এই কথা বলছি। চারজন ধারাভাষ্যকার দিয়ে প্রতিদিনের খেলা পরিচালনা, স্টেডিয়ামের উপস্থাপিকা ইংরেজি এক কথায় বিরক্তিকর। উইকেট থেকে হঠাৎ করে উদিত হওয়া বিজ্ঞাপনের সিন হজম করা, বল আকাশে থাকতেই ‘প্রতিদিনের ব্যবহারের পানিটা…’ টাইপ কথাবার্তা শোনা সত্যিই কষ্টকর। ফেসবুকে তো এ নিয়ে রসিকতাও শুরু হয়ে গিয়েছে, বাংলাদেশে মাটির নিচে এত প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ আছে, এবারের বিপিএল না দেখলে জানতেই পারতাম না।

মাঠে দর্শক নেই, উইকেটে রান নেই, টুর্ণামেন্ট ব্যর্থই বলা যেত। কিন্তু অন্ধকারের পরে নাকি আলো আসে। অবশ্য, আমাদের এই টুর্ণামেন্টে আলো-আঁধারির খেলা পাশাপাশিই চলেছে।

তামিম ইকবাল আর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ব্যাটিংয়ের কথা তো আগেই বলেছিলাম। তারা ফর্মে ছিলেন, সেটাই বহন করে নিয়ে গিয়েছেন। তবে একেবারেই ধুমকেতুর মতো এসে নিজের হাজির করেছেন মেহেদি মারুফ। এই কঠিন উইকেটেও ঠিকই স্ট্রোক প্লের দ্যুতি ছড়িয়েছেন, ঝড়ো সুচনা বলতে যা বোঝায়, ঢাকা ডিনামাইটসকে তাই এনে দিয়েছেন। নাসির হোসেন কিংবা শাহরিয়ার নাফিস ব্যাট হাতে বোর্ডের উপেক্ষার জবাব দিয়েছেন, মুশফিকুর রহিম রান করেছেন। সাব্বিরের দুর্দান্ত ১২২ রানের ইনিংস মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। এর মাঝেই আক্ষেপ বাড়িয়েছেন সৌম্য সরকার। ফর্মহীনতা থেকে বের হতে পারেননি এবারও।

কিছু রান করতে পারতেন তিনি, কিংবা রানটা আরো বাড়তেই পারতো তাদের। এই আক্ষেপ শুধু তাদের না, কমবেশি সব ব্যাটসম্যানেরই। সেই দায়টা অবশ্য আম্পায়ারদের কাঁধেই বর্তাবে। প্রতি ম্যাচেই এত ভুল ডিসিশন তারা দিয়েছেন, আর ভুলগুলো এত বেশি চোখে পড়ার মতো, আম্পায়াররাও মানুষ এই যুক্তির উর্ধ্বে তুলে দিচ্ছে এই যুক্তি, তারা আসলেই এই পর্যায়ে আম্পায়ারিংয়ের যোগ্যতা রাখেন কিনা।

তাদের এই ভুল সিদ্ধান্তের ফায়দা তুলেছেন বোলাররা। তবে কেবলমাত্র আম্পায়ারদের দান বললে অন্যায়ই হবে। উইকেট থেকে সাহায্যের সাথে নিয়মিত ভালো লেংথে বোলিং, ব্যাটসম্যানদের অহেতুক আক্রমণাত্মক হওয়া সব মিলিয়ে উইকেট এনে দিয়েছে তাদের। মোহাম্মদ নবী এই লিস্টে ১৭ উইকেট নিয়ে আছেন শীর্ষে। কিন্তু কয়েকজন বোলারের অবৈধ বোলিং অ্যাকশন, কিংবা পুনরায় বোলিং রিভিউ কমিটির সন্দেহ প্রকাশ এই দাবি তুলছে, তাদের সন্দেহজনক অ্যাকশন নিয়েই কেন খেলতে দেওয়া হচ্ছে।

ব্যাটিং, বোলিংয়ের সাথে ফিল্ডিংও খেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু চূড়ান্তভাবে হতাশ করার যদি কোন জায়গা থাকে, তবে ফিল্ডিংয়ের দিকেই আঙুল তোলা লাগছে। প্রতি ম্যাচে বাজে আম্পায়ারিংয়ের সাথে ক্যাচ মিস, নৈমিত্তিক ব্যাপারই ছিলো এই বিপিএলের প্রথম পর্ব ব্যপী। বরিশাল বুলসের ক্যাপ্টেন যা নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। এত বড় আসরে এটা নিশ্চয় কাম্য নয়।

আসলে কাম্য নয় তো অনেককিছুই। জাতীয় দলের দুই ক্রিকেটারের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে জরিমান প্রদান, কিংবা দল থেকে বহিষ্কৃত এক ক্রিকেটারের ফিক্সিংয়ের অভিযোগ তোলা বিপিএলের কালো অধ্যায়ে কালিটা গাঢ়ই করেছে শুধু। যা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, এত কালি লাগার পর আদৌ বিপিএলের প্রয়োজনীয়তা কোথায়?

এবারের বিপিএলে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তামিম ইকবাল। ১ম ১২ জনের মাঝে ৯ জনই বাংলাদেশি। বোলারদের এই তালিকায় মোহাম্মদ নবী উপরে থাকলেও পরের স্থানটিই আমাদের শফিউল ইসলামের। শুধু তিনিই নন, টপ ১৫ বোলারের ১০জনই বাংলাদেশি।

শত কালোর ভিড়ে দিনশেষে এই স্মৃতিগুলোই কেবল উজ্জ্বল থাকে। আর এখানেই আমাদের বিপিএলের স্বার্থকতা, প্রয়োজনীয়তা।

Leave a Reply