চ্যাম্পিয়ান্স ট্রফি – ২০১৭ঃ টিম নিউজিল্যান্ড

সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয়, নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দল সেমিফাইনালে হেরে বিদায় নেয়। টুর্ণামেন্ট সেরা হয়েও মার্টিন ক্রো পারেননি এ মিথ খন্ডাতে। সাত বছরের নেতৃত্বে দু’দুবার সুযোগ এসেছিলো ড্যানিয়েল ভেট্টোরির সামনে, তিনিও পারেননি। দেশের ক্রিকেটের চিন্তাচেতনা বদলে দেয়া ব্রেন্ডন ম্যাককালাম খুব কাছে গিয়েছিলেন, সেমিফাইনাল বদলে তিনি কেবল ফাইনালই লিখতে পেরেছিলেন।

পেরেছিলেন কেবল স্টিভেন ফ্লেমিং। ‘সেমিফাইনালিস্ট’, এই তকমা ঝেড়ে ফেলে নিউজিল্যান্ডকে পোডিয়ামে দাঁড় করিয়েছিলেন বিজয়ীর বেশে। যেই টুর্ণামেন্টে নিউজিল্যান্ড সক্ষম হয়েছিলো বিজয়ের হাসি হাসতে, সেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আবারো জানান দিচ্ছে তার উপস্থিতি।

কেন উইলিয়ামসনের নেতৃত্বে ব্ল্যাক ক্যাপসরা কি তৈরি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে?

এমনিতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কিউইদের পরিসংখ্যান খুব আহামরি গোছের কিছু নয়। আগের সাত আসরের সবগুলোতেই অংশ নিয়ে ২১ ম্যাচে ১২ জয়ের বিপরীতে হার ৮টিতে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আগের সাত আসরে তাদের রোল অব অনারটা এরকম:

১৯৯৮ কোয়ার্টার ফাইনাল

২০০০ চ্যাম্পিয়ন

২০০২ গ্রুপ পর্ব

২০০৪ গ্রুপ পর্ব

২০০৬ সেমিফাইনাল

২০০৯ রানার্সআপ

২০১৩ গ্রুপ পর্ব

মঞ্চটা যখন বৈশ্বিক আসর, কিউইদের আশার বেলুন ফুলতেই পারে। যদিওবা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গত আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়েছিলেন তারা, ‘বড় টুর্ণামেন্টের দল’ টার্মটা খুব যায় এই দলের সাথে, ১১টি বিশ্বকাপের ৬টিতেই সেমিফাইনালে পৌঁছানো সে সাক্ষ্যই দেয়।

সেই আশার বেলুনে হাওয়ার যোগানদাতা কি? এককথায় বললে, দলের খেলোয়াড়েরাই। আর সেখানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ক্যাপ্টেন কেন উইলিয়ামসন। ফরম্যাট ওয়ানডে হোক কিংবা টেস্ট, বিশ্বের সব প্রান্তেই তাঁর ব্যাট যেন খাপখোলা তলোয়ার। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি শুরু হবার আগে ওয়ানডে না খেললেও, আইপিএলে দারুণ এক মৌসুম কাটিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ফরম্যাট বদলালেও মরচে পড়বে না ব্যাটে। আর ইংলিশ কন্ডিশনে তার ব্যাট বরাবরই রান প্রসবা, ক্যারিয়ার ব্যাটিং গড় ৪৫.৯২ এর বিপরীতে ইংল্যান্ডে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১.০০ তে।

কেন উইলিয়ামসন নামের এই রান মেশিন ছাড়াও প্রতিপক্ষের শিরদাঁড়ায় কাঁপন ধরিয়ে দিতে আছেন:

ওপেনিং জুটিঃ

নিউজিল্যান্ডের ওপেনিং জুটি যেন ধ্রুপদী আর র‍্যাপ সংগীতের মধুর কম্বিনেশন। মার্টিন গাপটিল যদি ছড়ান পাওয়ার হিটিংয়ের সৌন্দর্য, অপরপাশে টম ল্যাথাম বলে বুলাবেন রেশম পেলবের ছোঁয়া। এইতো সেদিন, ১৮০ রানের ইনিংস খেলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে একাই ধরাশায়ী করলেন গাপটিল। সদ্য সমাপ্ত ত্রিদেশীয় সিরিজে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়ে ল্যাথামও বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর ছোট্ট কাঁধ তৈরি বড় আসরের চাপ নিতে। একসাথে দুইজন জ্বলে উঠলে প্রতিপক্ষের যে ত্রাহি ত্রাহি ছুটবে, তা আর বলতে।

বোলিং জুটি:

নতুন বলে টিম সাউদি- ট্রেন্ট বোল্ট জুটি এই আসরের সবচেয়ে ভয়ংকর জুটি কিনা, সে প্রশ্ন ওঠাই অবান্তর। মেঘলা আকাশের নিচে সামান্য ঘাসে ঢাকা উইকেট, এরই মাঝে বোলিং করলে তারা কি করতে পারেন, সেকথা আর নতুন করে স্মরণ করানোর কিছু নেই। যদিওবা তাদের সাম্প্রতিক ফর্ম নিউজিল্যান্ডের জন্য আশাব্যঞ্জক নয়, তবুও জুটিটা বোল্ট- সাউদি বলেই তারা আশাবাদী হতে পারেন।

বোলিং বৈচিত্র‍্য:

টিম সাউদি- ট্রেন্ট বোল্টের ব্যর্থতাও নিউজিল্যান্ডের ঘুম হারাম করার কারণ হবে বলে মনে হচ্ছে না। স্কোয়াডে টিম সাউদি-ট্রেন্ট বোল্টের মতো সুইং বোলার ছাড়াও যে আছেন গতি দিয়ে ভড়কে দেয়া এডাম মিলনে, ইফেক্টিভ মিডিয়াম পেসার কোরি এন্ডারসন, জিমি নিশাম। স্পিন ডিপার্টমেন্টে অভিজ্ঞতার ভান্ডার নিয়ে যেমন আছেন জিতান প্যাটেল, ড্যানিয়েল ভেট্টোরির যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আছেন মিচেল স্যান্টনার। একটু ঝুঁকি নিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেরা বোলিংআপ হিসেবে এই এটাককেই চালিয়ে দেয়া যায়।

ক্যাপ্টেন্সিঃ 

বি-ম্যাকের যোগ্য উত্তরসূরি পাওয়া কি সম্ভব ছিলো? নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দাবি করতেই পারে, আমরা পেয়েছি। দলের সেরা ব্যাটসম্যান উইলিয়ামসন, সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার ব্যাপারটি তাই এমনিতেই পূরণ হয়ে যায়। এর বাইরে ফিল্ড প্লেসিং, বোলিং চেঞ্জ, মাঠের বাইরে দলকে একাট্টা রাখা, সব মিলিয়ে অধিনায়কোচিত সব গুণাবলির ‘পারফেক্ট কম্বিনেশন’ একজন কেন উইলিয়ামসন। ব্যাটিংয়ে ২০-২৫ রানের ঘাটতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য তাঁর অধিনায়কত্বই যথেষ্ট।

কিন্তু, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াকে টপকে সেমির টিকেট নিশ্চিত করতে এতসব শক্তিমত্তা যথেষ্ট হবে কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে নিশ্চিতভাবে ‘হ্যা’ বলা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে, মার্টিন গাপটিলের ‘ইউ মিস, আই হিট’ ব্যাটিং আর ক্যাপ্টেন্সি কেড়ে নেয়ার পর থেকেই রস টেলরের চোখজুড়ানো ব্যাটিং প্রদর্শনীর অনুপস্থিতি এই দলের সবচেয়ে বড় ‘একিলিস হিল’। ব্যাটিং ট্র‍্যাকে, টিম সাউদি- ট্রেন্ট বোল্টের সুইং বোলিং কতটা কার্যকর হবে, সে ক্ষেত্রেও এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসানো যায়। আর শহিদ আফ্রিদির দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড ভাঙার পর থেকেই ‘কোরি এন্ডারসন হারালেন কোথায়’ এই উত্তর হাতড়ে বেড়াচ্ছে গোটা নিউজিল্যান্ড। আশার বেলুনে এই সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলো যেমন থেকে যায় সেমিতে ওঠার সম্ভাবনা প্রশ্নেও তেমন না-বোধক উত্তরই আসে।

কেন উইলিয়ামসনদের অবশ্য দুশ্চিন্তার কারণ আছে বলে মনে হয় না। সব টুর্ণামেন্টেই তো আন্ডারডগ হিসেবে খেলতে গিয়ে নিজেদের আবিষ্কার করেন সেরা চারের লড়াইয়ে।

সেই ধারা ভেঙে কেন উইলিয়ামসন কি পারবেন, ২০০০ সালের স্টিভেন ফ্লেমিং হতে? পারবেন, গত বছরই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা, মার্টিন ক্রো-কে বিদায়ী উপহার দিতে?

উত্তরটা সময়ের হাতেই তোলা রাখা থাক।

নিউজিল্যান্ড স্কোয়াডঃ

কেন উইলিয়ামসন (অধিনায়ক), টম ল্যাথাম, মার্টিন গাপটিল, নিল ব্রুম, রস টেলর, লুক রনকি, কোরি এন্ডারসন, কলিন ডি গ্রান্ডহোম, জিমি নিশাম, মিচেল স্যান্টনার, জিতান প্যাটেল, টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্ট, এডাম মিলনে, মিচেল ম্যাকলেনাহান।

সূচিঃ

২ জুন, অস্ট্রেলিয়া। এজবাস্টন বেলা ৩:৩০ মি.

৬ জুন, ইংল্যান্ড। কার্ডিফ বেলা ৩:৩০ মি.

৯ জুন, বাংলাদেশ। কার্ডিফ বেলা ৩:৩০ মি.

Leave a Reply