বাংলাদেশের ক্রিকেট বিপ্লবীকে শুভেচ্ছা

মাশরাফি! একটা বিষ্ফোরনের নাম। হারতে হারতে ক্লান্ত এক জাতীর জন্য অনন্য এক নেতার নাম। আপনি চাইলে তাকে প্রতিকী অর্থে বিপ্লবী বলতে পারেন। চিত্রা নদীর পার থেকে বিপ্লবের শিক্ষা নিয়েছেন, হার না মানার শিক্ষা। বারবার উঠে স্বপ্নের পানে ছুটে যাবার প্রেরণার শিক্ষা। বিপ্লবী কিন্তু তাকে বলাই যায়।
ক্রিকেটীয় হিসেব নিকেশে আপনার যাওয়াই লাগছে না। মাশরাফি তার অনেক উর্দ্ধে। আজন্ম নেতা, কোমল কিন্তু দৃঢ়, সাধারণ কিন্তু অতি অসাধারণ এক ব্যাক্তিত্বের বিরল উদাহরণ এই ব্যাক্তি মাশরাফি। ক্রিকেটার মাশরাফি অবশ্যই তার এই প্রবল ব্যাক্তিত্বের সাথে জড়িত। লোকটা ক্রিকেট খেলে বলেই না এমন বিরল একজনের কথা আপনি জানেন।
বুকের ভিতরে আগলে রাখতে চান, বল করতে গিয়ে পায়ে হাত দিলেই আপনি অজান্তে মুখে হাত দেন। ক্ষতবিক্ষত পা নিয়ে বারবার আপনার শত ক্ষোভের কন্ঠ হয়ে ক্রিকেটের সবুজ রণাঙ্গনে হুংকার ছাড়ে বলেই আপনি মাশরাফিকে ভালোবাসেন।

মাশরাফি আপনার মতোই দুর্ভোগ দেখেছে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেট যখন কৈশোরে বড়দের অবজ্ঞা শুনে লজ্জায় লাল হয় তখন মাশরাফি কলার উচিয়ে গতির ঝড় তুলে বিষ্মিত করেছিলো আপনাকে প্রথম।

মনে পড়ে? একাই সামলে গেছেন বাংলাদেশের পেস বোলিং এর পুরোটা। শরীরটা যখন আর ধকল সইতে পারে না তখনো মাশরাফি হার মানে না। একাই দৌড়ে যান জাতির ভেতরের জমে থাকা হুংকার জানিয়ে দিতে। তার সাথে যোগ হয়েছে পাগলামো, রাতের বেলা ম্যাচ শেষ করে ভোরেই গিয়ে নড়াইলে বন্ধুদের ডেকে তুলেছেন। শরীর তো বিদ্রোহ করবেই। ভুলে গেলে চলবে না এই পাগলামোই মাশরাফির শক্তি।

সাতবার শুয়েছেন ডাক্তারের ছুড়ির নিচে, প্রতিবার ফিরে এসেছেন। ছোটখাটো ইঞ্জুরি তো আছেই। প্রতিবার শরীরটাকে মানিয়ে নিয়ে আবার ছুটেছেন, এই করতে এক যুগ পেরিয়ে গেছেন সেই কবে! অথচ দুইশত উইকেটের বলে চুমু খেলেন এইতো সেদিন। এই এক যুগেরও বেশী সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটে কতো রকম ঝড় বাদল পেরিয়ে আজকের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

একজন মাশরাফিও সমান সংখ্যক দুর্যোগ পেরিয়েই দৌড়ান। আগে দৌড়াতেন যখন পায়ের ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে অধিনায়কের তুই বল না করলে কে করবে শুনে, আর এখন দৌড়ান পরিবারটাকে আগলে রাখতে। তিনি মাঠে থাকলেই যে বাকী দশজনের রক্তে লাল সবুজ দৌড়ায়। এই মাশরাফি শুধু নেতাই নন, অভিভাবকও বটে।

একের পর এক হারে পুরো বাংলাদেশের সাথে নিঃস্ব হয়েছেন বারেবারে। সেই সময়ে পাড়ার মাঠে বিকেলের আড্ডায় এক স্কুল বালক চোয়াল শক্ত করে প্রতিজ্ঞা করেছিলো একদিন ঠিক জবাব দেবো, সব হারের, সব অবজ্ঞার, সব অপমানের। সেই স্কুল বালকটিই সাব্বির, তাসকিন, সাকিব, মুশফিক। মাশরাফি থেকে গেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রবাদ পুরুষ হয়ে, ক্যারিয়ারের শুরু থেকে একইভাবে অপরিহার্য থেকে। সাতটি অপারেশনের পরেও কেউ পারে? তিনি পারেন বলেই তিনি মাশরাফি।

এক অর্থে মাশরাফি থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়েছে। যখনই সেরা ছন্দে এসেছেন তখনই ইঞ্জুরি এসে ছোবল মেরেছে, তারপর অপারেশন, তারপর পুর্নবাসন, তারপর আবার হাটি হাটি করে দৌড়াতে শুরু করে ছোট রান আপে বোলিং করে আবার লাল সবুজে ফেরা। কতো দীর্ঘপথ পারি দিয়েছেন বারবার, এই বৃত্তেই কেটে গেছে এতোগুলো বছর। তার বোলিং এর পঞ্চাশ শতাংশ ও পায়নি বাংলাদেশ। এই না পাওয়ার বেদনা নিয়েই বাংলাদেশ মাশরাফিকে ভালোবাসে, পাগলের মতো ভালোবাসে।

বয়সটা পঁয়তাল্লিশ পেরোলেই আর নাকি হাটতে পারবেন না, আর একবার লিগামেন্ট বেইমানি করলেই হাটা বন্ধ। হুইল চেয়ারের মাশরাফিকে দেখে আপনার কান্না নয়, গর্ব হবে। ক্রিকেট আভিজাত্যের কুলীনদের অবজ্ঞার জবাব দেয়ার যুদ্ধে পা হারানো এক বিপ্লবীর জন্য গর্বই হবে।

মাশরাফি অবশ্য বলেছেন, দেশপ্রেম ক্রিকেটে নেই। উনি যে দৃষ্টিকোণ থেকে বলেছেন সেটা অকাট্য, অবশ্য সত্য। কিন্তু টেষ্ট ক্রিকেটে হাটতে শুরু করা বাংলাদেশের সাথে সাথে বড় হতে থাকা সেই স্কুল পালানো কিশোরের দলে কেনো শত হারে, অপমানে, অবজ্ঞায় চোয়াল শক্ত হয়? কারণ সেই এগারোজন লাল সবুজে খেলে, বুকে বাংলাদেশ নিয়ে খেলে। একে দেশপ্রেম বলাই যায় মাশরাফি।

জানি, আপনি সেই ছেলেটার জবাব দেয়ার বাসনা পূরণ করতেই দৌড়ান। সেই ছেলেটাও তাই আপনি পা হারাবেন জেনেও স্বার্থপরের মতো তাকিয়ে থাকে। কারণ ছেলেটাও জানে, আপনার বুকেও একই আগুন জ্বলে। আগুন নেভার আগ পর্যন্ত দৌড় থামবে না জানে বলেই এতটা স্বার্থপরতা। এক আকাশ সাহস বুকে নিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে দশটা ছোট ভাইয়ের শক্তি হয়ে, প্রেরণা হয়ে আরো অনেক অনেক দিন থাকুন, আপনার প্রয়োজনীয়তা কখনোই পুরাবে না।

তরুণদের প্রেরণার অন্য নাম মাশরাফি, এতো ঝড় ঝাপটা আর বিপর্যয়কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৫ বছর উদযাপের শুভেচ্ছা ম্যানিয়াক্স পরিবারের পক্ষ থেকে।

ম্যানিয়াক্স ডেস্ক
ক্রিকেট ভালোবাসি, কেননা বাংলাদেশকে ভালোবাসি।

Leave a Reply