আমার আর ক্রিকেটের বেড়ে উঠা

তখনো কৈশোর পার হয়েছিলো কি? তবে হ্যা, ৯৯ এর বিশ্বকাপ মনে আছে। সাবের হোসেনের বাংলাদেশ যখন টেষ্ট স্ট্যাটাস পায় তখন সবে কুমিল্লা জিলা স্কুলে ভর্তি হয়েছি। কিছুদিন পরেই বড় হয়ে যাবো এই উচ্ছাস চোখে মুখে নিয়ে দিবারাত্রি কেটে যায়। ক্রিকেটটা আমরাও তখন বুঝা শুরু করেছি, বিশেষ করে সাদা পোশাকের ক্রিকেট। গ্ল্যামার নেই বলে, কেমন জানি লাগে। এই খটখটে আদি অকৃত্তিম ফরম্যাটেই যে লুকিয়ে আছে ক্রিকেটের গৌরবময় অনিশ্চয়তার স্বাধ তা বুঝতে সময় লেগেছিলো আরো বেশী।

গোটা দেশেই একান্ত ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের বাইরে টেষ্ট ক্রিকেটের অলিগলি বুঝা লোকের অভাব। দেখতে দেখতে না বুঝবে, দর্শক বুঝলেই না খেলোয়াড়রা পারফেকশনের পেছনে ছুটবেন। এই সংস্কৃতিটা গড়ে উঠতে একটু সময় তো লাগবেই। ফলো অনের হিসেবটা যখন বুঝলাম, তখন আর কিছু না বুঝলেও এটুকু বুঝলাম। এটা অনেক লজ্জার। সেই লজ্জাতেই কেটেছে আমার স্কুলবেলা! অবজ্ঞা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য সয়েছি, হজম হয়নি। কখনো মেনে নিতে পারিনি, শংকায় মুখ শুকিয়ে এসেছে।

তবে, কখনো আশাবাদী হওয়া থেমে থাকেনি। যদি কিছু করে ফেলে! কেউ ভালো খেললেই সেই গল্পে মশগুল বিকেল কেটেছে কতো! টেপ টেনিসে শর্ট বাউন্ডারি খেলার ফাঁকেফাঁকে আশরাফুলে বুদ হয়ে থাকা আবার বিরক্তিতে ফুসে উঠা এসবেই কেটে গেছে গোটা স্কুলবেলা। দিন বদলায়, আমাদের দিন ও বদলায়।

চোখের সামনে বদলে যেতে থাকলো দল। সাকিব, মুশফিক, তামিমদের যখন দলে আনাগোনা শুরু, তখন এসএসসি সামনে। তবে, ওপাশ থেকে টিপন্নি কাটা থেমে থাকেনি কখনো। টেস্ট ক্রিকেটে সেশন ধরে ধরে এগুতে হয়, কখন বল ছাড়তে হবে, কখন মারতে হবে, কিভাবে বল করলে উইকেট নেয়া যাবে এসব হিসেব নিকেশ রক্তে প্রবাহিত না হলে ব্যাটে আসবে কি করে? কেউ এসে শিখিয়ে দিলো আর হয়ে গেলো, ক্রিকেট এতো সহজ নয়।

ওয়ানডে ফরম্যাটে দেখতে দেখতে দলটা দাঁড়িয়ে গেলো। সাকিব – তামিম – মুশফিকদের মতো লিজেন্ডদের তারকা আর ভরসা হয়ে উঠা দেখতে দেখতে কলেজ শেষ। অতদিনে আমি স্কোয়াড ডেপথের গুরুত্ব অনুভব করতে শুরু করেছি। বুঝতে শুরু করেছি, টেস্ট জিততে হলে ইন্টেনসিটির কমতি রাখা যাবেনা। সেশনের পর সেশন নিজেদের চূড়োয় রাখার লড়াই লড়তে হবে। একবার খেই হারালেও, পরক্ষনেই ফিরে আসতে হবে। সাকিবরাও বুঝেছে আমার মতো বড় হতে হতেই।

দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার দুঃসাহস নেই। তবে, ঐ যে রক্তে ছিলোনা। বুঝলেও করা যায়না সব সময়। ধীরে ধীরে অভ্যাস হতে লাগলো। জীবন আজ এক মোড়ে কাল আরেক মোড়ে নিয়ে দাড় করায়। ক্রিকেট ও অলিগলি ঘুরে সেঞ্চুরি করা শিখে গেছে পুরোদমে। ইনিংস পরাজয় আর মাঝরাতে অপমানবোধ জাগায় না।

এর মাঝে জয় এসেছে, তবে জয়গুলো আমার স্মৃতিপটে মলিন হয়ে যাবার পর আরেকটা এসেছে। আমরা যে বড় দল হয়ে উঠবো, টেস্ট ক্রিকেটের অলিগলির হিসেব নিকেশ পরিস্কার হবে তা তখনো ভাবার ফুসরত হয়নি।

একের পর এক খেলোয়াড়কে ট্রাই করে গেছে বোর্ড। আদতে, দেখতে দেখতেই দল দাঁড়াতে লাগলো। সাকিব, তামিমরা হুংকার ছড়ানো শুরু করলো। একের পর এক প্রতাপশালী জয় আসতে লাগলো, সাথে সাথে প্রতি পজিশনে বিকল্প তৈরী হতে লাগলো। পেস বোলিং এর ঘাটতিও কেটে গেলো। এবার তো আমরা তৈরী!

হ্যা, আমরা তৈরী। এখন আমরা ক্রিকেটের কুলিন জগতে মাথা উঁচু করে হাটবো। ছেলেবেলার সব তাচ্ছিল্য, অপমানের বদলা নেয়ার সময় এসেছে। শততম টেষ্টে জিতেছি বলে নয়, ক্রিকেট সংস্কৃতিটা গড়ে উঠেছে বলে বলছি।

এখন যারা ক্রিকেটার হবে বলে, একাডেমীতে যাবে তারা জানে সেশন কি, ফলো অন কি। তারা জানে, সেঞ্চুরী কিভাবে করতে হয়, তারা জানে দলে বৈচিত্র থাকতে হয়, তারা জানে কি করে জিততে হয়। তাদের জন্য ক্রিকেটটা এখন আরো মজাদার এক খেলা।

মোসাদ্দেক, সৌম্য, মুস্তাফিজ, মিরাজদের পর যারা আসবে তারা জন্মাবেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে। শততম টেস্ট জয়ের গুরুত্ব অসীম, আকাশের সীমানায় তার বিস্তৃতি। এই দেশে টেস্ট ক্রিকেটের সত্যিকার চর্চার শুরু হবে, এখান থেকেই।

একসাথে বড় হয়েছি বলেই বলছি, এই গর্ব আমারও, এই অহংকার আমারও।

Leave a Reply