ফাঁসিতে মৃত্যু ক্রিকেটারের

১৭মে তারিখটা আপনার অনেক কিছু হিসেবেই মনে থাকতে পারে। তবে ক্রিকেটের ইতিহাসে দিনটা একটু অন্যরকম। কেন? ১৯৫৫ সালের আজ এই দিনে যে ক্রিকেট ইতিহাসের এক টেস্ট ক্রিকেটারকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিলো, যে কিনা এখন পর্যন্ত ফাঁসি দেয়া একমাত্র টেস্ট ক্রিকেটার।

নামটা লেসলি হিল্টন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাস্ট বোলার, জন্মগতভাবে জ্যামাইকান । খেলেছেন ৬ টেস্ট, নিয়েছেন ১৯ উইকেট।

বর্তমানে, স্পট ফিক্সিং বা ম্যাচ ফিক্সিং করে হালের মোহাম্মদ আমির, সালমান বাট, মোহাম্মদ আশরাফুলরা সাজা পেয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মত কিছু করা, তাও টেস্ট ক্রিকেটারের জন্য, বিরলই বটে।

আসুন দেখে নিই লেসলির ক্রিকেট জীবন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে অভিষেক ১৯৩৪-৩৫ মৌসুমে, বব ওয়্যাটের ইংলিশদের বিপক্ষে। প্রথম সিরিজেই নেন ১৩ উইকেট। প্রথম টেস্ট খেলেন কেংসিনটন ওভালে, অদ্ভুত এক টেস্টে।

বৃষ্টিতে তখন পিচ রক্ষার ব্যবস্থা ছিলো না। তাই ক্যারিবীয়রা যখন নামলেন, পিচের অবস্থা যাচ্ছেতাই। তাতে অনেক কষ্টে ১০২ রান তুলে স্বাগতিকরা, মার্টিনডেল আর হিল্টনের বোলিং তোপে দিনশেষে ইংলিশরা তোলে ৭ উইকেটে ৮১। রাতে বৃষ্টি হয়ে পিচের অবস্থা আরও জঘন্য হলে, সেই রানেই ডিক্লেয়ার দেন ইংলিশ অধিনায়ক। উইন্ডিজ অধিনায়ক এই ঝামেলা দূর করেন ব্যাটিং অর্ডার উলটো করে, ওপেন করান হিল্টন কে দিয়ে। হিল্টন তার টেস্ট ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রান ১৯ করেন, ৫১ রানে ৬ উইকেট পড়ার পর ডিক্লেয়ার করেন ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক জ্যাকি গ্রান্ট, যদিও তখনও তার সেরা ব্যাটসম্যান রাই ব্যাটিং করেননি। তার পরিকল্পনা ছিলো এই জঘন্য পিচে ইংলিশদের নাকানি চুবানি খাওয়ানো। খাওয়াচ্ছিলেনও, মার্টিনডেল তুলে নেন ৫ উইকেট। কিন্তু হিল্টনের অনভিজ্ঞতার সুবিধা নিয়ে, রান তুলে নেন ওয়ালি হ্যামন্ড, জিতে যায় ইংলিশরা। যদিও পরের দুই টেস্ট জেতে ক্যারবিয়ানরাই, হিল্টন বেশ ভালোই বল করেন।

এরপর ১৯৩৯ এ ইংল্যান্ড ট্যুর করলেও সেখানে ড্রপড হন এবং তারপরেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আর ক্যারিয়ারের ইতি টানেন তিনি ।

পরের বছরই জ্যামাইকার ইন্সপেক্টর অফ পুলিশের মেয়ে লারলিন রোজের প্রেমে পড়েন হিল্টন, যদিও সম্পর্কের শুরুটা আদর্শ নয়। কারণটা ছিলো, রোজের পরিবার হিল্টনদের পরিবারের চেয়ে বেশী মর্যাদাপ্রাপ্ত ছিলো, জ্যামাইকান সমাজে। এমনকি বিয়ে আটকানোর জন্য রোজের বাবা পুলিশ ফাইলে খুজে বেড়ান হিল্টনের অপরাধও!

এত সব ঝামেলার পরও বিয়ে হয় হিল্টন আর রোজের, ১৯৪২ সালে। ১৯৪৭ এ জন্ম নেয় তাদের ছেলেও।

ঝামেলা শুরু হয় ১৯৫৪তে, যখন রোজ তার কাপড়ের ব্যবসার জন্য নিউইয়র্ক সিটিতে ঘন ঘন যেতে থাকেন। এপ্রিলে বেনামী বেশ কিছু চিঠি পান হিল্টন, যে তার স্ত্রী ব্রুকলিন এভিনিউ এর রয় ফ্রান্সিস এর সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন।

চিঠি পেয়েই রোজকে বাড়িতে আসার জন্য টেলিগ্রাম দেন হিল্টন, আর চিঠিগুলো দেখান তার শ্বাশুড়িকে, শ্বশুর ইন্সপেক্টর অফ পুলিশ আর বেচে ছিলেন না।

রোজ বাড়িতে এসে ফ্রান্সিসকে একজন “পরিচিত মানুষ” হিসেবে বলেন এবং সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন। ডেইলি গ্লিনার যা সম্পর্কে লেখে, “ব্যাপারটি যেকোন বিবাহিত ব্যাপারের মতই নিষ্পত্তি হয়েছিলো।”

কিন্তু এরপরও অনেক চিঠি পান হিল্টন, তার স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্কের। এই নিয়ে এক রাতে তিনি তার স্ত্রীকে অভিযুক্ত করলে রাগে ফেটে পড়েন রোজ এবং স্বীকার করেন ফ্রান্সিসের সাথে সম্পর্কের কথা। তিনি এও বলেন, হিল্টন তার সমান সামাজিক অবস্থানের ছিলো না এবং কখনই তাকে খুশী করতে পারেনি এবং হিল্টনের চেহারা দেখামাত্রই তার মেজাজ খারাপ হতো। এমন কি কিছু ভাষ্যমতে, নিজের রোব খুলে হিল্টনকে রোজ দেখান যে কি মিস করতে যাচ্ছেন তিনি।

রাগে অন্ধ হিল্টন বন্দুক নিয়ে গুলি করেন রোজকে। যদিও ট্রায়ালে তিনি বলেন নিজেকে গুলি করতে গিয়ে মিস করলে রোজের গায়ে গুলি লাগে, কিন্তু রোজের শরীরে থাকা ৭টি বুলেট যে তার জবানবন্দীর সাথে সাংঘর্ষিক, তা আর বলা লাগে না।

ভিভিয়ান ব্লেক এবং নোয়েল নেথারসোল, যিনি কিনা হিল্টনের অধিনায়কও ছিলেন, তাদের মত স্বনামধন্য উকিলেরা হিল্টনের পক্ষে লড়লেও কোর্ট দোষী সাব্যস্ত করে হিল্টনকে এবং ২০ অক্টোবর, ১৯৫৪ সালে তাকে ফাঁসির আদেশ দেয়।

ফাসির তারিখ ছিলো ১৭ মে, ১৯৫৫, কাকতালীয়ভাবে সেদিন বারবাডোজের কেংসিনটন ওভালে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ। সেখানে ক্যারিবিয়ান ওপেনার জন হল্ট বাজে ব্যাটিং ও দুটো সহজ ক্যাচ ছেড়ে দেওয়ার পর, মাঠে অনেক ব্যানার দেখা যাচ্ছিলো, “Hang Holt, Save Hylton” । কিন্তু তা আর হয়নি, ফাঁসিতে ঝোলেন এই ফাস্ট বোলার, আর এখনও হয়ে আছেন ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার, যিনি মারা গেছেন ফাসির দড়িতে।

তথ্যসূত্র : ক্রিকেট কান্ট্রি

Leave a Reply