ডেভিড হুকস অথবা শিশিরের গল্প!

২০০৩ সালে ডেভিড হুকস নামে এক সাহেব বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়া চাইলে বাংলাদেশকে টেস্টে ১ দিনেই হারাতে পারে।

নাক উচু ইংলিশ বয়কট বলেছিলেন ২০০৫ সালে, তার বুড়ো দাদীমাও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো করবে টেস্টে। কারণ, ইংল্যান্ডের বাতাস আর সুইং এ তখন বিধ্বস্ত বাংলাদেশ দল, টেস্ট হারছে ৩ দিনেই।

পুরো ২০১৫ ওয়ানডেতে দুর্দান্ত খেলার পরও, দুই ইংরেজ জাতি ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার খোচা খেতে হয়েছে বাংলাদেশকে, লঙ্গার ভার্সনে তো আর জয় নেই!

সময় কি অদ্ভুতভাবেই না জবাব দেয়!

গত অক্টোবরেই অবশ্য জবাব পেয়েছেন বয়কট, যখন স্পিন চোখে দেখছে না তার উত্তরসূরিরা, উইকেটের বন্যা বসিয়ে তাদের হারালেন ১৮ বছরের এক বালক, নাকি বালক বীর বলবো? সেই ইংল্যান্ড যখন ৩ দিনের মাথায় ভূপাতিত, তখন ১১ বছর আগে করা এক উক্তির জন্য আফসোস বয়কট বোধহয় করেইছিলেন।

ডেভিড হুকস 

হুকসের পালা ছিলো এবারে। ২০০৬ এই জবাব পেয়ে জেতেন, রিকি পন্টিং বাচিয়ে দিয়েছিলেন। এবার পেলেন, যদিও দেখার জন্য বেচে নেই তিনি। ওপার থেকে কি শুনছেন, বাঘের গর্জন?

ম্যাচের স্ট্যাটিস্টিকস নিয়ে কথা বলার দরকার নেই, সে স্কোরকার্ড সবার মুখস্তই আছে। স্কোরকার্ডের ভেতরের বাইরের কয়েকটা গল্প শোনা যাক..

৫০তম টেস্টে দুটো সিঙ্গেল নিয়ে ওপাশে গিয়ে দাড়ালেন, হঠাৎ দেখলেন ওপাশ থেকে সৌম্য, ইমরুল কিংবা সাব্বির, একজনও নেই। আরেক ৫০তম টেস্ট খেলতে নামা সাকিব হয়ত আয়েশ করে খেলা দেখবেন কতক্ষণ ভেবেছিলেন, কিন্তু ৪ ওভারের মাথায়ই তার হেটে আসতে হলো মিরপুরের ২২ গজে। সেখান থেকে ১৫৫ রানের জুটি দুই বন্ধুর, তামিম ৭১ আর সাকিব ৮৪ তে আউট হলেন, ১০-৩ সামলে বাংলাদেশও ২৬০ করলো…

১ম দিনের শেষ বিকেলে যখন নাথান লায়ন নামলেন, তখন অনেক বাঙালিরই জেসন গিলেস্পিকে মনে পড়লো। সেই গিলেস্পি, যিনি নাইটওয়াচম্যান হয়ে নেমে ডাবল সেঞ্চুরি করে অপমানের চূড়ান্ত করেছিলেন। আরেক অস্ট্রেলিয়ান নাইটওয়াচম্যানকে দেখে মনে ভয় ওঠা স্বাভাবিকই! তবে বাঙালির ভয় দূর করার জন্য মোক্ষম ঔষধ আছে, ঔষধের নাম সাকিব আল হাসান, আর্ম বলের ফাদে ফেলে ১১ বছর আগের এক দুঃসহ স্মৃতিতে প্রলেপ দিলেন, আবার আরেকটা রোগ সারালেন।

দ্বিতীয় দিন কোনভাবেই আউট হচ্ছেন না কামিন্স অথবা এগার। লিড কমে যাচ্ছে একটু একটু করে গিলেস্পি যেন কামিন্সে ভর দিয়ে ফিরে আসছেন। আবারও সাকিব প্রয়োগ, আবারও গিলেস্পি ভূতের তিরোধান, ৪৩ রানের লিড লাভ।

দ্বিতীয় ইনিংসটা ভালোই চলছিলো, কিন্তু দিনের ওভার দুয়েক থাকতে ভূতুড়ে শট খেলে আউট হলেন সৌম্য, তামিম হয়ত অবাক হলেন। তাইজুলকে নিয়ে দিন শেষ করলেন। পরের দিন মুশফিককে নিয়ে সেঞ্চুরির দিকেই এগুচ্ছিলেন, কামিন্সের আরেক দুর্দান্ত ডেলিভারি গ্লাভস ছুয়ে গেলো, আম্পায়ার আউট না দিলেও রিভিউ নিয়ে স্মিথ তাকে মাঠ ছাড়া করেই ছাড়লেন…

হঠাৎ ব্যাটিং ধ্বস, ১৮৬ রানে ৮ উইকেট নেই। মিরাজ নামে অসমসাহসী ছেলেটা তখন নাথান লায়নকে তুলে মারা শুরু করলো, ২৬ রান করে দলকে পৌছে দিলো ২২১ এ, লিড ২৬৪। বাংলাদেশ জিতলো কিন্তু, ২০ রানেই!

আর এরপর? সেঞ্চুরি করা ওয়ার্নারকে সাকিব ফেরালেন, সেট হওয়া স্মিথও তারই শিকার। হ্যান্ডসকম্ব তাইজুলের বলে সৌম্যের দুর্দান্ত রিফ্লেক্সে বন্দি, কিন্তু ওই যে, ৯ম উইকেট!

সেখানে ২৯ রানের জুটি করে আবারও দম বন্ধ করে দিচ্ছিলেন লায়ন কামিন্স। নাহ, কামিন্স ছোকড়া জ্বালিয়েছে বড়! মিরাজ লায়নকে তুলে নিলেও, তারপরের ওভারে কামিন্স ১৫ রান নিয়ে প্রয়োজনটা নামিয়ে আনলেন ২১ এ।

আর তখন? তাইজুলের আর্ম বলটা বুঝতেই পারলেন না হ্যাজেলউড, নাইজেল লং এর আঙুল উঠলো, রিভিউ আর বাকি নেই, পুরো বাংলাদেশ অবশ্য ততক্ষণে বিজয়োল্লাসে মত্ত!

অবশ্য, আমি আগে থেকেই বিশ্বাস করতাম, টেস্টটা জিতবো। সাকিব আল হাসান বলেছিলেন যে!

এই মানুষটার উপর অগাধ বিশ্বাস আমার। তিনি যখন বলেছেন তখন জিতবোই, আর সেই জয়ে তিনি ভাস্বর থাকবেন না, তা কি হয়?

থাকলেনও। প্রথম ইনিংসে দলকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তোলা ৮৪, এরপর দুই ইনিংসেই ৫টি করে উইকেট। তিনিই প্রথম, যিনি কিনা এক টেস্টে একটি ৮০+ ইনিংস ও ১০ উইকেট নিয়েছেন, তাও দুবার। দ্বিতীয় মানুষ হিসেবে ১০ উইকেট ও ফিফটি করেছেন। দ্রুততম সময়ে ৯ ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে ৫ উইকেট নেওয়ার গৌরব অর্জন করলেন, সাকিব আল হাসান, তুমি মানুষ তো? ৫০তম টেস্ট ছিলো, রাঙিয়ে না তুললে কি হয় বলুন?

একজনকে ধন্যবাদ না দিলে, লেখাটা পুরো হবে না, তিনি সাকিবের অর্ধাঙ্গিনী, সাকিব উম্মে আল হাসান শিশির। গতরাতে নাকি সাকিব ফোন দিয়ে বলেছিলেন, ম্যাচ জেতাটা কঠিন হয়ে গিয়েছে। তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “কেউ জিতাইতে পারলে সে তুমিই পারবা”

প্রেমিকার কথা কি ফেলা যায় বলুন?

Leave a Reply