আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নভেলায়

কাল যদি রয়টার্স অথবা বিবিসির কোন সাংবাদিক চ্যাম্পিয়নস ট্রফি সম্পর্কে ঢাকাবাসীর মতামত নিতে বের হতেন, তবে মোটামুটি নিশ্চিত যে ২-৩ জনের সাথে কথা বলার পরই ভাবতেন, একি! এয়ারওয়েজের ব্যাটারা ভুল করে লন্ডন টু ঢাকার বদলে কি লন্ডন টু ম্যানচেস্টার ফ্লাইটে উঠালো নাকি! সব দেখি ইংলিশ ফ্যান, সবার মুখের কথা একটাই, থ্রি লায়ন্সদের জয় চাই।

তবে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি গ্রুপে এর সমীকরণ মাথায় আসলেই বুঝবেন সাংবাদিক, নাহ টিকেটের টাকা বৃথা যায়নি, ঢাকায়ই পৌছেছেন। কি ছিলো সেই সমীকরণ?

সমীকরণটা ছিলো অস্ট্রেলিয়াকে জিততে দেওয়া যাবে না। পরিত্যক্ত হলে বা ইংল্যান্ড জিতলে হেসে খেলেই সেমিতে যাবে বাংলাদেশ, খালি একটাই গলার কাটা, অস্ট্রেলিয়া দেশটা সুবিধার না! ডু অর ডাই ম্যাচে কাপিয়ে দেয়।

তবে এবার না। মার্ক উড গতি আর আদিল রশিদের ঘূর্ণিতে ২৭৭ রানেই থামতে বাধ্য হলো ক্যাঙ্গারু রথকে, ট্রাভিস হেডের ক্যাচ মিস না করলে রানটা আরও কমও হতে পারতো।

জবাবে প্রথম ৬ ওভারে প্যাভিলিয়নে ফেরত চলে গেছেন জেসন রয়, এলেক্স হেলস আর জো রুট, মিচেল স্টার্ক আর জশ হ্যাজেলউশ যেন আগের দিনের টিম সাউদি আর ট্রেন্ট বোল্টের নব অবতার!

ঠিক তখনই বৃষ্টি এলো। আধা ঘন্টার মত ব্রেক, তবে তাই যথেষ্ট। ঠান্ডা মাথায় এরপর বেন স্টোকস আর ইয়ন মরগ্যান এর খুনে ব্যাটিং। সাকিব-রিয়াদের ২২৪ রানের জুটির প্রতিরূপ ১৫৯ রানের জুটি যখন মরগ্যানের রান আউটে থামলো, ততক্ষণে ম্যাচ আর সেমিফাইনালের টিকেট দুটোই স্টিভেন স্মিথ এর হাত ফসকে গেছে। এরপর আবার বৃষ্টি নামার আগে সেঞ্চুরি তুলে নিলেন বেন স্টোকস, মরগ্যান করেছিলেন ৮৭। এরপর নামা বৃষ্টির জন্য আর খেলা হলো না, ডার্কওয়ার্থ লুইসে বিজয়ী ইংল্যান্ড, তার চেয়েও বড় জয় বাংলাদেশের জন্য, সেমিফাইনাল!

অথচ এই বাংলাদেশই সপ্তাহখানেক আগে কি ছিলো? ৩০৫ করেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হার, মাত্র ৪ ওভারের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সাথে ১ পয়েন্ট পাওয়া। সাকিব মাশরাফিকে কেন্দ্রে রেখে সমালোচনার তীর। কিন্তু দিন শেষে ওই নিউজিল্যান্ড ম্যাচই পাশার দান উলটে দিয়েছে, সাকিব মাহমুদুল্লাহ তাই এইবার সেমিফাইনাল এ উঠবার সিড়ির কারিগর!

স্টিভেন স্মিথ নিজেকে দুর্ভাগ্যবান মনে করতেই পারেন! দ্বিতীয় ম্যাচে যে নিশ্চিত জেতা ম্যাচও ছেড়ে দিতে হলো প্রকৃতির বিমুখীতায়!

২০০৭ সাল মনে পড়ে যাচ্ছে। সেবার ভারত আর বারমুডাকে হারিয়ে আলোড়ন তৈরি করা বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাকিয়ে শ্রীলংকার দিকে, শ্রীলংকার জয়ই তখন আমাদের সুপার ৮ এর টিকেট।

তাই সেদিন ভারতের এক একটা উইকেট মনে হচ্ছিলো স্বর্গযাত্রার এক একটা ধাপ, শচীন টেন্ডুলকার যে শিক্ষানবিশ এর মত বোল্ড হয়েছেন তা দেখবার সময় কই!

ঠিক তেমনি, ক্যাঙ্গারু বোলারদের মরগ্যান স্টোকসের মারা প্রতিটা বাউন্ডারিই যেন এক ধাপ করে নিয়ে গেলো স্বর্গের দ্বারপ্রান্তে, স্বর্গের নাম সেমিফাইনাল। নিজেদের স্বর্গপ্রবেশের দিন যে অস্ট্রেলিয়া ভাগ্যজোড়ে বাদ পড়লো, তা দেখার কি দরকার আছে আদৌ?

রোমাঞ্চ এডিলেডেও ছিলো বছর দুয়েক আগে, জিতলেই কোয়ার্টার ফাইনাল। অলৌকিকভাবে, সামনে ইংল্যান্ড ছিলো। রুবেল হোসেন যে জেমস এন্ডারসনের স্টাম্প উপড়ে ফেললেন, সেটা এখনও অধিকাংশ বাঙ্গালির সবচেয়ে পছন্দের ভিডিওগুলোর একটা হয়ে আছে, পরশু রুবেল হোসেনের পর তাতে যুক্ত সাকিব রিয়াদও!

সাকিব আল হাসান ঠিক ফর্মে ছিলেন না কয়দিন। আইপিএল এ গিয়ে কলকাতার বেঞ্চ গরম করে যখন দলের সাথে যোগ দিলেন, আয়ারল্যান্ড সিরিজে মনে হচ্ছিলো এখনও সেই বেঞ্চে বসে আছেন, খেলা ঠিক সাকিবসুলভ ছিলো না। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তো ইংল্যান্ড ম্যাচের পর আবারও অনেক দিন পর ভিলেন খেতাব পেলেন, অস্ট্রেলিয়ার সাথে যখন সেট হয়ে ফর্ম ফিরে পাচ্ছেন, তখনই আম্পায়ারের এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ফিরতে হলো। কোন এক কালে বলেছিলেন, “চাপে খেলতে পছন্দ করি”। এখন আমার মনে প্রশ্ন জাগছে, ওই ব্যাটিং ধ্বস কি বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরা সাকিবকে ফেরাতেই নামালো নাকি! নাহ, তা বোধহয় নয়। তবুও ভাবতে ভাল লাগে, সাকিবের জবাব দেওয়ার মঞ্চ তৈরী করে দিয়েছেন বাকিরা, আর সাকিব এসে জবাব দিয়েছেন।

আর একজন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। চিরকাল নিজের কাজটা ঠিকভাবে করে গেছেন, খুব চুপচাপ ম্যাচ জিতিয়েছেন, কখনও সেভাবে লাইমলাইটে আসেন না। তবুও, টেস্ট দল থেকে বাদ পড়েছেন, ওয়ানডে থেকেও বাদ দেওয়ার কানাঘুষা চলছিলো। কপাল ভালো, কানাঘুষা কানাঘুষাই থেকে গিয়েছিলো। নাহয় এই রকম একজন নায়ক আমরা হারিয়ে ফেলতাম পার্শ্বনায়কের খোলনলচে!

দু দুটো এশিয়া কাপ ফাইনাল হারের ক্ষত নিয়েই সেমিফাইনাল খেলতে নামবে বাংলাদেশ, সাথে আছে ২০১৫ বিশ্বকাপের বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনালের অবিচারের ক্রোধ, সামনে ভারত নয়ত দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রতিশোধের জন্য ভারতকে চাইতে পারি, কিন্তু ফাইনাল খেলার জন্য চোকার্সদের চাই!

১৬ কোটি স্বপ্ন আর বহু বছরের প্রতীক্ষার ফল এই সেমিফাইনাল, আর দুটো ম্যাচ জিতলেই, প্রথম ট্রফিটা ঘরে আসবে।

সবে তো স্বর্গপ্রবেশ, স্বর্গজয় ও হবেখন!

Leave a Reply