ফিরে দেখা স্বর্ণস্মৃতি; বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়।

১০ ই নভেম্বর ২০০০ থেকে ১০ ই জানুয়ারি ২০০৫। সময়ের হিসাবে দীর্ঘ পাঁচ বছর দুই মাস। আর টেস্টের হিসাবে ৩৪ টি টেস্ট। যার মধ্যে ৩১ টিতে পরাজয় আর আর মাত্র ৩ টি টেস্ট ড্র। ৩ টি ড্র টেস্টের মধ্যে আবার দুইটিই বৃষ্টির সাহায্যে ড্র। একমাত্র ক্যারিবিয়দের সাথে নিজের যোগ্যতায় ড্র। টেস্ট জয় তখনো যে অধরাই রয়ে গেছে বাংলাদেশের। আধুনিক ক্রিকেটে নবাগত একটি দলের মানিয়ে নেবার সময় দেয়ার চেয়ে তাঁদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেই ব্যস্ত অধিকাংশ ক্রিকেট বোদ্ধা! শত নিন্দা, বঞ্চনা সহ্য করেই এগিয়ে যাচ্ছিল শিক্ষানবিশ বাংলাদেশ। অবশেষে এল সেই মহেন্দ্রক্ষন। অসংখ্য বিনিদ্র রাতের পর আরাধ্য জয়! এল টেস্ট বিজয়ের সাফল্য। সমগ্র পৃথিবীকে দেখিয়ে দেয়ার পালা। হ্যা, আমরাও পারি। আমরা পারবই।

২০০৫ সাল। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে জিম্বাবুয়ে এসেছে বাংলাদেশ সফরে। প্রথম ম্যাচ চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে। পরাজয়ের বৃত্তে ঘুরতে থাকা বাংলাদেশ দলের সামনে অবশ্য জিম্বাবুয়ের নতুন এক জেনারেশন। তবুও শক্তির বিচারে বাংলাদেশ থেকে তখনো যে এগিয়ে জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশ দলেও রয়েছে ভারসম্য। জাবেদ ওমর, নাফিস ইকবাল, মিস্টার ফিফটি খ্যাত হাবিবুল বাশার, সর্ব কনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান আশরাফুল, রাজিন সালেহ, হার্ড হিটার আফতাব, খালেদ মাসুদ, নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরত আসা মোহাম্মদ রফিক, তরুণ তুর্কি মাশরাফি, তাপস বৈশ্য এবং ইয়াং সেনশেসান এনামুল জুনিয়রকে নিয়ে গড়া দলটাকে প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী।

৬ তারিখ সকালে হাবিবুল বাশার জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক তাইবুর সঙ্গে যখন মাঠে নামলেন টস ভাগ্য পরীক্ষার জন্য, সেই সময় থেকেই ভাগ্য সহায় ছিল বাংলাদেশের। টসে জিতে ব্যাটিং এর সিদ্ধান্ত নিলেন টাইগার দলপতি। সেই সময় প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিল তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হাবিবুল বাশার বলেছিলেন,

‘পরে ব্যাটিং করাটা একটু কঠিনই। আমাদের লক্ষ্য ছিল ভালো একটা স্কোর করা। প্রথম ইনিংসেই বড় রান তুলতে পারলে আমাদের যেমন বোলিং করাটা সুবিধা হবে, তেমনি প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে দেওয়া যাবে।’

হাবিবুল বাশারের সেদিনের সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল তার প্রমাণ করেছিলেন টাইগার ব্যাটসম্যানরা। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪৮৮ রান। সেই সময় এটাই ছিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংস। উদ্বোধনী জুটিতেই আসে ৯১ রান, যা দলের বড় স্কোর গড়তে শক্ত ভীত গড়ে দেয়। নাফিস ইকবালের ৫৬, দলপতি বাশারের ৯৪, রাজিন সালেহ এর ৮৯, পাইলটের ৪৯, মোহাম্মদ এর রফিকের ৬৯ আর মাশরাফির ৪৮ দলকে এনে দেয় শক্তিশালী অবস্থানে।

টানা পাঁচ সেশান ফিল্ড করা জিম্বাবুয়ে ক্লান্তি নিয়ে দ্বিতীয় দিনের শেষ সেশানে যখন ব্যাট করতে নামে, তখন বাংলাদেশ বোলাররা যেন একদমই চেপে ধরে জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানদের। প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং করতে নেমে মাশরাফি-তাপসের পেস আক্রমণ ও রফিকের ঘূর্ণি জাদুতে যেন একদম দিশেহারা জিম্বাবুয়ে। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ ৪ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৮৪ রান। দ্বিতীয় দিন শেষেই বাংলাদেশ দল যেন টেস্ট বিজয়ের সুবাস পাচ্ছিল। যদিও এই টেস্টের শুরুতেই আত্ম প্রত্যয়ী ছিল বাংলাদেশ দল। এই প্রসঙ্গে হাবিবুল বাশার বলেছিলেন ,

‘জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ শুরু হওয়ার আগে টিম মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, জয়ের জন্যই খেলব আমরা। তখনো আমাদের টেস্ট ম্যাচের পরিসংখ্যানে জয়ের ঘরে “শূন্য” লেখা। খুব খারাপ লাগত দেখে। পরিকল্পনা ছিল, ঘরের মাটিতেই শূন্য মুছে ফেলতে চাই।’

তৃতীয় দিনের শুরুতেই আবার টাইগারদের থাবা জিম্বাবুয়ের স্কোর বোর্ডে! ১৫২ রানেই জিম্বাবুয়ের ৬ উইকেট হাওয়া! জিম্বাবুয়ের সামনে তখন ফলো-অনের চোখ রাঙানি। হাবিবুল বলেন,

‘জিম্বাবুয়ে ফলো-অনে পড়েই যাচ্ছিল প্রায়। আমাদের ভাবনা ছিল এমন, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট না করতে পারলেই ভালো। কিন্তু ওদের অধিনায়ক তাইবু শেষ দিকে ভালো একটি ইনিংস (৯২) খেলল।’

আদতে তাইবুর প্রতিরোধে প্রথম ইনিংসে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ সব উইকেট হারিয়ে ৩১২। বাংলাদেশের পক্ষে রফিক নিলেন ৫টি, মাশরাফি ৩টি ও তাপস ১টি উইকেট।

দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামার আগেই কিছুটা ব্যাকফুটে বাংলাদেশ। পায়ের ব্যাথার কারণে নিয়মিত ওপেনার জাবেদ ওমর নামতে পারলেন না। তার বদলে নামলেন রাজিন সালেহ। রাজিন সালেহ কিছুটা ভালো খেললেও ব্যাটিং বিপর্যয়ে বাংলাদেশ। ব্যাক্তিগত শুন্য রানে প্যাভিলিয়নে ফিরলেন আর এক ওপেনার নাফিস ইকবাল। অধিনায়ক বাশার এবং রাজিন ৪০ রানের জুটি করে কিছুটা সামাল দিলেও শেষ পর্যন্ত আর বড় জুটি হয় নি বাংলাদেশের। হাবিবুল বাশারের ব্যাট থেকে আসল সর্বোচ্চ ৫৫ রান। হাবিবুল বাশার অবশ্য প্রথম ইনিংস থেকে নিজের দ্বিতীয় ইনিংসের ৫৫ রানকেই এগিয়ে রাখেন। কেন? তাঁর মুখ থেকেই শুনা যাক,

‘স্ট্রাগলিং ইনিংস ছিল সেটা। ওই সময়ে প্রচণ্ড স্নায়ু চাপে খেলতে হয়েছে। কারণ পরিকল্পনা ছিল, দ্রুত বড় লক্ষ্য দিতে হবে জিম্বাবুয়েকে। আবার রান না করতে পারলে ইনিংসও ছাড়া যাচ্ছিল না। এসব টেনশনে উইকেট একটু দ্রুতই যাচ্ছিল। তবে লক্ষ্য করবেন, দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা রান তুলেছিলাম ৩.৯৮ গড়ে। প্রায় চারের কাছাকাছি।’

দ্বিতীয় ইনিংসে ৯ উইকেটে ২০৪ করে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। জয়ের জন্য জিম্বাবুয়ের প্রয়োজন ৩৮১ রান। বাংলাদেশের হাতে ছিল ১১৩ ওভার এর কাছাকছি সময়, যার মধ্যে অল আউট করতে হবে জিততে হলে।

৩৮১ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমেই শুরুতেই পা হড়কাল জিম্বাবুয়ে। দলীয় দ্বিতীয় এবং তাপসের প্রথম ওভারে জাবেদ ওমর এর বদলি হিসাবে মাঠে নামা মাঞ্জারুল ইসলাম রানার তালু বন্দী হলেন জিম্বাবুয়ের ওপেনার রজার্স। দলীয় চতুর্থ ওভার এবং নিজের দ্বিতীয় ওভারে আবারো আঘাত হানলেন তাপস বৈশ্য। এবারের শিকার ইনফর্ম ব্যাটসম্যান সিবান্দা। তাপসের বোলিং তোপে ৩.৪ ওভারে জিম্বাবুয়ের স্কোর—২ রানে ২ উইকেট!

এটিকেই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট মানেন হাবিবুল। তাঁর জবাব, ‘চতুর্থ দিন বিকেলে পর পর দুটি উইকেট এনে দিয়েছিল তাপস (রজার্স ও সিবান্দার উইকেট)। তখনই ম্যাচের গতিপথ অনেকটা নির্ধারিত হয়েছিল। মানসিকভাবে অনেক এগিয়ে গিয়েছিলাম আমরা।’

চতুর্থ দিনের খেলা শেষ হবার আগে আবার আঘাত হানলেন এনামুল হক জুনিয়র। চতুর্থ দিনের খেলা শেষে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ৪৬ রান।

 

179227

চতুর্থ দিন শেষে বাংলাদেশের টেস্ট বিজয়ের পাল্লা যেন অনেকটাই ভারী হয়ে উঠেছিল। পঞ্চম দিনে জিম্বাবুয়ের প্রয়োজন আরও ৩৩৫ রান। আর বাংলাদেশের প্রয়োজন মাত্র সাত উইকেট। উদ্বেগ, কৌতূহলস্পন্দিত বক্ষে সবাই তাকিয়ে চট্টগ্রাম এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের দিকে। এই টেস্ট ম্যাচ আমরা যে জিততে যাচ্ছি তা এক রকম নিশ্চিতই ছিল। কিন্তু কে হবেন জয়ের নায়ক তা নিয়ে অবশ্য জল্পনা কল্পনার কমতি ছিল না। বাংলাদেশ বোলিং এর মূল স্তম্ভ মোহাম্মদ রফিকের দিকেই পাল্লাটা ছিল ভারী। পাশাপাশি তরুণ স্পিড স্টার মাশরাফিকেও নিয়েও বাজির পাল্লাটা ছিল উদ্ধমুখি। কিন্তু সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পাদ প্রদিপের আলোয় নিজেকে নিয়ে এলেন এনামুল হক জুনিয়র। শেষ দিনে পাঁচ উইকেট নিয়ে একাই গুঁড়িয়ে দিলেন জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং দুর্গ। মাত্র ১৫৪ রানে অল আউট জিম্বাবুয়ে। ফলাফল ২২৬ রানের বিশাল ব্যবধানে জয়ী বাংলাদেশ। এনামুল হক জুনিয়রের বলে সিলি পয়েন্টে ক্রিস্টোফার পোফুর ক্যাচ ধরে মোহাম্মদ আশরাফুল যখন আনন্দে দিলেন ভোঁ-দৌড়! সেই মুহূর্তেই এম এ আজিজ স্টেডিয়াম পরিণত হলো উত্সবের মঞ্চে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে উত্সবের রং ছড়িয়ে পড়ল গোটা দেশে।

গ্রীষ্মের ক্ষরতাপে স্বস্তির বৃষ্টি ঝরানো যেন এক জয় পেল বাংলাদেশ! প্রথম টেস্ট বিজয়ের অনুভূতি আসলে কেমন? বাগ্মি হাবিবুলও ভাষা খুঁজে পেলেন না সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করার,

‘সব অনুভূতিই তখন নতুন! প্রথম টেস্ট জয়ের অনুভূতি, প্রথম সিরিজ এগিয়ে যাওয়া, একপর্যায়ে প্রথমবারের মতো সিরিজ জিতে নেওয়া—সবকিছুই ছিল ‘‘প্রথম’’! এই প্রথমের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের নয়।’

মাশরাফি বললেন, ‘ওই ম্যাচের কথা মনে থাকবে সারা জীবন। তখন একটা জয়, অনেক বড় ব্যাপার আমাদের কাছে। ক্রিকেট যে পর্যায়েই যাক, প্রথম জয়ের কথা অবধারিতভাবে আসবেই।’ অনুপ্রেরণাদায়ী ম্যাচ প্রসঙ্গে নাফিসের মন্তব্য, ‘ওই সময় কিন্তু আমাদের চেয়েও জিম্বাবুয়ের রেকর্ড ভালো ছিল। এর পরও পুরো টেস্টে আধিপাত্য ধরে রেখে খেলেছি। এখনো ওই ম্যাচটি কথা ভীষণ অনুপ্রাণিত করে।’

টেস্টে ক্রিকেটের পিচ্ছিল আঙিনায় বাংলাদেশের ইতিহাস নিরন্তর সংগ্রামেরই। ঐতিহ্য-অভিজ্ঞতায় যোজন-যোজন এগিয়ে থাকা সব দলের বিপক্ষে হোঁচট খেতে খেতেই শিখছে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় বাংলাদেশের উন্নতি আশাব্যঞ্জক। অতি সম্প্রতি ইংল্যান্ডকেও আমরা হারিয়েছি টেস্টে। নিশ্চয়ই আরও বহু স্মরণীয় জয় আসবে ভবিষ্যতে। তবুও প্রথম জয়ের কথা কি ভোলা যায়! স্মৃতিপটে তা নিপুণভাবে অঙ্কিত থাকবে কালে, মহাকালে। আর এই জয়ের পিছনের মহানায়কেরা আজীবন থাকবেন আমাদের মনের মনিকোঠায়।

Leave a Reply