ওডিআই এ বাংলাদেশের যত জয়! প্রথম পর্ব!

আমি বন্ধু, পরিচিত-জন, এমনকি- শত্রুর জন্যেও
অপেক্ষায় থেকেছি,
বন্ধুর মধুর হাসি আর শত্রুর ছুরির জন্যে
অপেক্ষায় থেকেছি-

কিন্তু তোমার জন্য আমি অপেক্ষায় থাকবো না,
-প্রতীক্ষা করবো।
‘প্রতীক্ষা’ শব্দটি আমি শুধু তোমারই জন্যে খুব যত্নে
বুকের তোরঙ্গে তুলে রাখলাম,
অভিধানে শব্দ-দু’টির তেমন কোনো
আলাদা মানে নেই-
কিন্তু আমরা দু’জন জানি
ঐ দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য অনেক,
‘অপেক্ষা’ একটি দরকারি শব্দ—
আটপৌরে, দ্যোতনাহীন, ব্যঞ্জনাবিহীন,
অনেকের প্রয়োজন মেটায়।
‘প্রতীক্ষা’ই আমাদের ব্যবহার্য সঠিক শব্দ,
ঊনমান অপর শব্দটি আমাদের ব্যবহারের অযোগ্য,
আমরা কি একে অপরের জন্যে প্রতীক্ষা করবো না ?

রফিক আজাদের কবিতার ভাষায় যদি বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিজয়ের কথা বলতে যাই তাহলে অবশ্যই বলতে হয় বাংলাদেশের একটি জয় দেখার জন্য আমারা অপেক্ষায় ছিলাম না, আমরা প্রতিক্ষা করতাম! বাংলাদেশের ক্রিকেটের শুরুর সময় থেকেই যারা তীর্থের কাকের মত বসে ছিল তাঁদের কাছে একটি বিজয় দেখার বাসনাকে অপেক্ষা না বলে শব্দটা প্রতীক্ষা হলেই বেশি মানানসই! দীর্ঘ এক যুগকে অবশ্যই অপেক্ষা বলা যায় না! ১২ বছর ২ মাস ১৭ দিনের শেষে অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান। এক যুগের বেশি সময়ে ২২ টি পরাজয়ের পর ২৩ নাম্বার ম্যাচে প্রথম জয়ের স্বাদ! গ্রীষ্মের খরতাপে যেন এক পশলা প্রশান্তির বর্ষণ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম আসে কেনিয়ার বিপক্ষে। আজকের এই সময়ে দাঁড়িয়ে কেনিয়ার বিপক্ষে জয়টাকে স্বাভাবিক একটি বিষয় মনে হতেই পারে। কিন্তু সেই সময়ে এই কেনিয়াই যে ছিল আমাদের জন্য বিভীষিকার অপর এক নাম। আন্তর্জাতিক এক দিনের ম্যাচে এর আগে দুইবারের দেখায় দুইবারই বিজয়ী দল কেনিয়া। আর আইসিসি সহযোগী দেশের মধ্যকার একদিনের ম্যাচেও প্রচ্ছন্ন ভাবে এগিয়ে কেনিয়া। হাড্ডা হাড্ডি লড়াইয়ের শেষে কালেভদ্রে বিজয়ী হয় বাংলাদেশ! যেমনটা হয়েছিল আইসিসি ট্রফি ১৯৯৭ সালের ফাইনালে। এই কেনিয়াকে পরাজিত করেই ট্রফি জয় করে নেয় বাংলাদেশ। যার ফলে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। অবশ্য ১৯৯৪ সালে এই কেনিয়ার কাছে পরাজিত হয়েই ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।

১৯৯৭ সাল থেকেই মূলত বাংলাদেশের ক্রিকেটের সামনে এগিয়ে চলার শুরু। যার কৃতিত্ব অবশ্যই গর্ডন গ্রিনিজ এর। সেই সময়ে গর্ডন গ্রিনিজ যদি বাংলাদেশের কোচ হয়ে না আসতেন তাহলে হয়ত বাংলাদেশ ক্রিকেট আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না। গর্ডন গ্রিনিজ দলের মধ্যে আনলেন পরিবর্তন। হারের বৃত্তে ঘুরতে থাকা একটি দলকে এনে দিলেন জয় করার আত্মবিশ্বাস। কোন কিছু অর্জনের জন্য প্রথম ধাপ হচ্ছে, আপনি যেখানে আছেন তাতে আপনি সন্তুষ্ট নন; এই বিশ্বাসটাকে দৃঢ় করতে হবে। গ্রিনিজ সেই আত্ম বিশ্বাসটাকেই গড়ে তুলেছিলেন। গর্ডন গ্রিনিজ যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য কেমন ছিল তা আসলে লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। ক্রিকিনফোর একটি আর্টিকেল এর উদৃতি, “Gordon Greenidge crying. Just imagine a win that makes Greenidge cry; a man who had come from a different country, a different culture. The owner of one of the fiercest square-cuts ever seen, the man with the double-century on one leg, the man whose image first comes to mind when the words “beware the wounded batsman” are said; Greenidge cried after that win. That’s how much it meant to the team.”

১৯৯৮ সালের মে মাস। ভারতে কোকাকোলা ত্রিদেশীয় সিরিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে স্বাগতিক ভারত, বাংলাদেশ এবং কেনিয়া। প্রথম ম্যাচে ভারতের কাছে পাঁচ উইকেটে পরাজিত বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ম্যাচে প্রতিপক্ষ কেনিয়া। হায়দ্রাবাদের লাল বাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়ামে রচিত হল নব উত্থানের ইতিহাস। আইসিসি ট্রফি বিজয়ী অধিনায়ক আকরাম খানের নেতৃত্বেই খেলতে নামবে বাংলাদেশ দল। দলের অন্যান্য খেলোয়াড় হলেন, আতাহার আলি খান, মোহাম্মদ রফিক, মিনহাজুল আবেদিন নানু, আমিনুল ইসলাম, নাইমুর রহমান দুর্জয়, খালেদ মাহমুদ, এনামুল হক মনি, হাসিবুল হোসাইন শান্ত, খালেদ মাসুদ পাইলট এবং মোরশেদ আলি খান। কেনিয়ার দলে রয়েছে কেনেডি অটিয়ানো, স্টিভ টিকোলো, মরিস উদুম্বে, হিতেশ মোদি, থমাস ওডোয়ো, টনি সুজি, মার্টিন সুজি, আসিফ করিমের মত খেলোয়াড়রা।

দুপুরে টসের জন্য অধিনায়ক আকরাম খান যখন মাঠে নামছিলেন তখন হয়ত বিজয়ের দৃপ্ত প্রত্যয় ছিল। কিন্তু তিনি কি সত্যিই ভাবতে পেরেছিলেন যে আজকেই তিনি হতে যাচ্ছেন গৌরবময় এক ইতিহাসের অংশ। টস ভাগ্য যদিও আমাদের সঙ্গী ছিল না। কেনিয়ার অধিনায়ক আসিফ করিম টসে জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ব্যাটিং এর শুরুটা অবশ্য ভালো হয় নি কেনিয়ার। চতুর্থ ওভারের শেষ বলেই প্রথম উইকেটের পতন। বাংলাদেশের হয়ে মাত্র ৩ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা মোরশেদ আলি খানের শিকারে পরিণত হলেন কেনেডি ওটিয়ানো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটাই ছিল মোরশেদ আলি খানের ক্যারিয়ারের শেষ উইকেট। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির ছিল স্টিভ টিকোলো এর দ্রুত আউট হওয়া। স্টিভ টিকোলো যাকে বলা হয় আইসিসি সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড়। খালেদ মাহমুদ সুজনের বলে বোল্ড হবার আগে করেছিলেন মাত্র ১৩ রান। ৮৪ রানে তৃতীয় এবং ৮৯ রানে চতুর্থ উইকেট হিসাবে যখন উদুম্বে আউট হলেন তখন থেকেই হয়ত বাংলাদেশ ম্যাচ জয়ের উত্তাপ খুঁজে পাচ্ছিল। একদিকে ম্যাচ জয়ের সম্ভাবনা অন্য দিকে চার বছর আগের স্মৃতি দুটিই হয়ত পাশাপাশি চলছিল বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের মনে। ৯৪ এর আইসিসি ট্রফিতেও এমন পরিস্থিতি ছিল! ২৫ ওভারে ১০০ এর কমে রাখলেও সেই ম্যাচে ২৯৫ রান করেছিল কেনিয়া শেষ পর্যন্ত। হিতেশ মোদি আর অভিষিক্ত শাহ পুরনো স্মৃতিটাই যেন ফিরিয়ে নিয়ে আসছিল। বিধাতা যে সেদিন চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন ভিন্ন ভাবেই। হিতেশ মোদিকে এনামুল হক মনি এল্বিডব্লিউ এবং শাহকে সুজন বোল্ড করলে খেলায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ফিরে বাংলাদেশ। এরপরেই রঙ্গমঞ্চে আগমন মোহাম্মদ রফিকের। রফিকের তিন উইকেট এর বদৌলতে কেনিয়াকে আটকে ফেলা সম্ভব হয় ২৩৬ রানে।

২৩৭ রানের টার্গেট কিন্তু সেই সময় এক দিনের ক্রিকেটে অনেক বড় একটি বিষয়! ৯৬ এর বিশ্বকাপের পর থেকে অবশ্য ক্রিকেটে বড় কিছু পরিবর্তন এসেছিল। শ্রীলঙ্কার কাছ থেকে প্রায় প্রতিটি দলই শিক্ষা নিয়েছিল কিভাবে ফিল্ড রেস্ট্রিকশনের প্রথম ১৫ ওভার কাজে লাগানো যায়। বাংলাদেশ দলও শিক্ষাটা কাজে লাগিয়েছিল ভালভাবেই। বোলিং এর মত এবারো ত্রাণকর্তার ভূমিকায় মোহাম্মদ রফিক। প্রিন্স হিটার রফিককে সেই সময় প্রমোশন দিয়ে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসাবেই পাঠানো হত। অনেক কিছু প্রথম পাবার এই ম্যাচে উদ্বোধনী জুটিতে আসে ১৩৭ রান! উদ্বোধনী জুটিতে প্রথম শত রানের জুটি। শুধুমাত্র উদ্বোধনী জুটিই নয় তখন পর্যন্ত এটাই প্রথম কোন শত রানের জুটি! এই জুটির অধিকাংশই অবশ্য রফিকের অবদান। ৮৭ বলে ১১ টি চার আর একটি ছয়ের মাধ্যমে করেছিলেন ৭৭ রান। অপর প্রান্তে আতাহার আলি খান যোগ্য সহায়তা করে চলছিলেন। আতাহার আলির সংগ্রহ ৯১ বলে ৪৭ রান। ১৫৭ রানের মাথায় নান্নু এবং ১৬৬ রানে আতাহার আউট হয়ে গেলে বাংলাদেশ কিছুটা চাপে পরে যায়! ১৬.২ ওভারে তখনো প্রয়োজন ৭১ রান। বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং অধিনায়ক আকরাম খান অবশ্য আর চাপে ফেলেন নি আমাদের। দুইজনের ৬২ রানের জুটি দলকে জয়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে। দলীয় ২২৮ রানের মাথায় আকরাম আউট হলেও আমিনুল ইসলাম অপরাজিত ছিলেন শেষ পর্যন্ত। নাইমুর রহমান দুর্জয়কে নিয়ে ১২ বল বাকি থাকতেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল।

হায়দ্রাবাদের রাতের আকাশে যেন বাংলাদেশের বিজয়ের রক্তিম সূর্যের উত্থান। দীর্ঘ এক যুগের প্রতীক্ষার অবসান। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ জয়ের স্বাদ। অল রাউন্ড নৈপুণ্যের জন্য ম্যাচ সেরার পুরুস্কার মোহাম্মদ রফিকের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটাও যে ছিল প্রথম কোন বাংলাদেশীর ম্যাচ সেরার স্বীকৃতি। প্রথম জয়ের স্মৃতি নিয়ে মোহাম্মদ রফিক বলেছিলেন, ‘ম্যাচটি আমরা দারুণ খেলেছিলাম।এর আগেও আমরা এরকম খেলেছি কিন্তু জয় পেতাম না। অবশেষ কেনিয়াকে ওই ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারাতে সক্ষম হই। আমাদের মধ্যে তখন ওভাবে পেশাদারিত্ব আসেনি। ভালোমানের কোচও ছিলা না। ট্রেনিংয়েরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু নিজেদের চেষ্টায় খেলে যেতাম। এটা ভাবতেই ভালো লাগে যে আমাকে দিয়ে ইতিহাস শুরু হয়েছে। বলতে পারেন ওই ম্যাচটি দিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশের। আর আমার হাত ধরেই নতুন পথে হাঁটা শুরু করে বাংলাদেশ।’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন আমরা প্রায় নিয়মিতই ম্যাচ জয়ের স্বাদ পাচ্ছি। ভবিষ্যতেও ম্যাচ জয়ের ধারাবাহিকতায়ই থাকব আমরা। সব জয়ের মাঝেও এই জয়টা যে আলাদা স্থান করে নিবে আমাদের অন্তরে।

Leave a Reply