সোনার ডিম পাড়া হাঁসটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে

রূপকথার সোনার ডিম পাড়া হাঁসের গল্প তো নিশ্চয় শুনেছেন। লোভী কৃষক চেয়েছিল খুব তাড়াতাড়ি বড়লোক হয়ে যেতে। এর ফল ভালো হয়নি। বরং কৃষক লোভের কারনে চিরতরে হারিয়েছিল সোঁনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে। এটি শুধুই কল্পকাহিনী নাকি সত্য ঘটনা তা আমার জানা নেই। তবে নিছক গল্প বা সত্য ঘটনা যায় হোক না কেন এই গল্প থেকে আমাদের অনেক কিছু শিখার আছে। অন্তত ক্রিকেটারদের উচিত এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া।

আপনাকে যদি বলা হয় বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সোনার ডিম পাড়া হাঁস কে? চোখ বন্ধ করে বলবেন মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশ এখন ছোট দল নয়, যেকোন দলের জন্যই সমীহ জাগানো প্রতিপক্ষ। এই পরিবর্তন এসেছে বেশ কয়েকজন বাঘকুমারের হাত ধরে যাদের মাঝে মুস্তাফিজুর অন্যতম। ধুমকেতুর মত তার আগমন। সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন ঝলমলে অভিষেক কার হয়েছে, মনে পড়ছে না। মুস্তাফিজ শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের বিস্ময়, বিশ্ব ক্রিকেটের বিস্ময়। এই বাঁহাতি পেসারের ঝুলিতে কী নেই? ইন সুইং, অফ কাটার, লেগ কাটার, মাপা স্লোয়ার। এত রকম ভ্যারাইটি এর আগে খুব কমই দেখেছে বিশ্ব ক্রিকেট। আমাদের আবিষ্কার হলেও মুস্তাফিজ এখন বিশ্ব ক্রিকেটের সম্পদ, আমাদের মহাতারকা। তাই মুস্তাফিজকে বাংলাদেশের গন্ডিতে আবদ্ধ করে রাখা আর সম্ভব নয়। বিভিন্ন ফ্রেঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলোতে হটকেক মুস্তাফিজুর রহমান যেখানে ক্রিকেট আর গ্ল্যামার যেন মিলেমিশে একাকার। সেখানে অনেক বড়মাপের ক্রিকেটাররা থাকেন। তাদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে। এর সঙ্গে আছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার ঝনঝনানি। তাই যেকোন ক্রিকেটারের জন্যই ফ্রেঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলোর ডাক ফিরিয়ে দেওয়া বেশ কঠিন।

এখন আসা যাক এর ক্ষতিকর দিকে। টি-টিয়োন্টি টুর্নামেন্টগুলোতে টানা খেলা থাকে যার জন্য ক্রিকেটারদের উপর অনেক বেশি চাপ থাকে। অনেক সময় দেখা যাক অতিরিক্ত খেলার কারনে ক্রিকেটারদেরকে ইনজুরিতে পড়তে হয়। পেসারদের জন্য বিষয়টা আরো বেশি কঠিন। এছাড়া এইসব টুর্নামেন্টগুলোতে ফ্রেঞ্চাইজিগুলোর কাছে জয়ই মুখ্য। ক্রিকেটারদের স্বার্থ এখানে বড় করে দেখা হয় না।

এবার আসি মুস্তাফিজুর রহমানের কথায়।
এলাম, দেখলাম, জয় করলাম- কথাটার আদর্শ উদাহরণ যেন মুস্তাফিজুর রহমানের ক্যারিয়ার শুরুর সময়টা। ঘরোয়া পর্যায়েই যার খুব বেশি পরিচিতি ছিল না, সেই ফিজ বল হাতে নিয়ে টানা জাদু দেখিয়ে গেছেন। তার পায়ে লুটিয়ে পড়া সাফল্য বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্মরণীয় কিছু জয়ে রেখেছে ভূমিকা। কাটার মাস্টারের প্রতি প্রত্যাশার পারদটাও তাই ঊর্ধ্বমুখী। অথচ একজন জেনুইন ফাস্ট বোলার হওয়ার জন্য যে ধরনের দৈহিক গড়ন, শারীরিক সক্ষমতা ও ফিটনেস লাগে, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য মুস্তাফিজুর রহমানের তা নেই। মুস্তাফিজের গ্রিপ ধরা অন্যদের চেয়ে এক্সেপশনাল। তার ইনজুরিতে পড়ার প্রবণতা অন্যদের চেয়ে এমনিতেই বেশি। তাই মুস্তাফিজকে বাড়তি নজরে রাখতে হবে। ধারনা করা হয় আইপিএল ২০১৬ এ টানা খেলার কারনেই কাঁধের চোটে পড়েন মুস্তাফিজ। দীর্ঘ সময় পুনর্বাসনের পর নিউজিল্যান্ড সফরে ফেরা, বিরতি দিয়ে কয়েকটি ম্যাচ খেলা, পরে শ্রীলঙ্কায়ও মাঠে নেমেছিলেন মুস্তাফিজ। কিছুতেই আগের সেই কাটার মাস্টারের দেখা মিলছে না। এবারের আইপিএলে গত আইপিএলের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়কে মাত্র এক ম্যাচে মাঠে নামায় হায়দ্রাবাদ। ক্রিকেটারদের ছন্দ ধরে রাখতে ম্যাচ অনুশীলন খুব জরুরি হলেও আমি মুস্তাফিজের বিশ্রামকে আশির্বাদ হিসেবেই দেখব। এবার টানা খেলতে হলে সে ধকল কাটিয়ে উঠতে কতদিন লাগত কে জানে?

টাইগার ক্রিকেটকে অনেককিছুই দেয়ার আছে মুস্তাফিজের। মুস্তাফিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিসিবিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। যেকোন মুল্যেই সোনার ডিমপাড়া হাঁসটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

Leave a Reply