বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমস্যা ও ভবিষ্যত

১.
একটা ভালো দল কিভাবে হওয়া যায়? অথবা কথাটাকে আরেকটু অন্য ভাবে সাজানো যায়। একটা ভালো দল হবার জন্য দলে কি কি থাকা প্রয়োজন?
কোন সন্দেহ নেই যে সবার আগে প্রয়োজন ট্যালেন্টেড খেলোয়াড়। কিন্তু শুধু ট্যালেন্টেড খেলোয়াড় দিয়ে সব কিছু অর্জন করা সম্ভব হয় না। দুনিয়ার সব দেশেই মোটামুটি ট্যালেন্টেড খেলোয়াড় রয়েছে। কোন দেশে হয়তো ব্যাটসম্যান ভালো আসে, কোন দেশে বোলার। এই ট্যালেন্টগুলো যেন তাদের ট্যালেন্টটাকে ঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হয়।

এর জন্য যে জিনিসটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে অবকাঠামো। আপনার যথেষ্ট ট্যালেন্ট থাকলেও যদি অবকাঠামো না থাকে তাহলে সেটা ঝরে যেতে বাধ্য। অবকাঠামো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে আপনার যথেষ্ট ট্যালেন্ট না থাকলেও শুধুমাত্র অবকাঠামোর জোড়েও একটা পর্যায় পর্যন্ত পৌছে যেতে পারবেন।

সবার শেষে প্রয়োজন হচ্ছে পরিচর্যা। ট্যালেন্টেড খেলোয়াড় হোক কিংবা পরিশ্রম করেই সফলতা পাক তাদেরকে পরিচর্যা করতে হবে। না হলে সেটা একসময় হারিয়ে যাবে।
দল গঠনে বিভিন্ন দলের বিভিন্ন ফর্মূলা থাকে। স্বাভাবিকভাবেই সবাই এক নিয়ম ফলো করবে না। দল গঠন করার আগে সেই দলের রিসোর্স সম্পর্কেও জানা উচিত। আমার অভিজ্ঞতায় উপমহাদেশীয় ক্রিকেট দলগুলো বেশিরভাগ সময়েই খেলোয়াড় ভিত্তিক দল গঠন করেন। এখানে মূল খেলোয়াড় একজন কিংবা দুজন থাকেন, বাকিরা তাদের সহায়তা করেন। আর উপমহাদেশের বাইরের দলগুলো সাধারণত কিছুটা কর্পোরেট কালচারে চলে। এখানে ব্যক্তিগত ইমেজের মূল্য কিছুটা কম। পুরো দায়িত্বটাকে দলের সবার ভেতর মোটামুটি ভাবে বন্টন করে দেওয়া হয়। এই কারণেই ২০০৩ বিশ্বকাপে শেন ওয়ার্নের মতো খেলোয়াড় নিষিদ্ধ আর গিলেস্পির মতো বোলার ইনজুরিতে বাদ পড়ার পরেও সেই টুর্নামেন্টে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় অষ্ট্রেলিয়া।

এর সঠিক কোন ব্যাখ্য আসলে নেই যে কেন পাকিস্তানে পেস বোলার জন্মায়? কেন ভারতে ব্যাটসম্যান ভালো হয়? কেন সাউথ আফ্রিকায় অলরাউন্ডারদের রাজত্ব আর কেনই বা বাংলাদেশ বা হাতি স্পিনারদের চারণ ভূমি?
তবে প্রতিটি দলেরই উচিত তার শক্তির সর্বোচ্চ ব্যাবহার নিশ্চিত করা। বড় দলগুলো সাধারণত সেটাই করে থাকে। অথবা উল্টোভাবে বলা যায় যে দলগুলো তাদের শক্তির সর্বোচ্চ ব্যাবহার করতে পারে তারাই বড় দল হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে এই ব্যবহারটা কি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এখনো করতে পেরেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোজার আগে অন্য একটা প্রসঙ্গে একটু খেয়াল করি। বাংলাদেশ আসলে কিভাবে দল গঠন করছে?

২.
একজন ক্রিকেটারের জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার ফর্মুলা আসলে কি হওয়া উচিত?
ট্যালেন্টেড হন আর না হন প্রথমে ঘরোয়া ক্রিকেটে আপনাকে ভালো করতে হবে। এখন এই ঘরোয়া ক্রিকেটের মান যত উন্নত হবে আপনার ক্রিকেটারের মান ততই উন্নত হবে। ইয়ান চ্যাপেলের এর কোন একটা সাক্ষাতকারে পড়েছিলাম, প্রতি রবিবার ছুটির দিনে সিডনি গ্রাউন্ডে বয়সভিত্তিক খেলা হয়। সেখানে সুযোগ পাওয়াটাই কঠিন ছিল। রিকি পন্টিং এর মতো খেলোয়াড়েরা সেখানে সুযোগ পাওয়ার জন্য বসে থাকতো। তাছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটের মানটাও এতটা কঠিন ছিল যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসে অষ্ট্রেলিয়ানদের জন্য কোন পরিস্থিতিই আর কঠিন মনে হতো না। শেষ চার ওভারে ৪০ রান প্রয়োজন, বিপরীতে বল করছেন ডেনিস লিলি – এই পরিস্থিতি যদি আপনি জিতে আসতে পারেন তাহলে কঠিন বলে আর কি বাকি থাকে।
সবচেয়ে বড় কথা ইয়ান চ্যাপেলের আমলে অষ্ট্রেলিয়ানরা এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই। কোন সপ্তাহে ব্যাটসম্যান জিতছেন, কোন সপ্তাহে হয়তো বোলার। কিন্তু মূল জিনিসটা খেলোয়াড়দের ভেতর আয়ত্ব হয়ে গিয়েছিল, চাপ সহ্য করার ক্ষমতা।

অষ্ট্রেলিয়ানদের ঘরোয়া ক্রিকেট এতটাই উন্নত যে তাদের রাজ্য দলকে হারাতেও যে কোন জাতীয় দলকে হিমশিম খেতে হয়। একটা উদাহরণ দিলে ওদের ক্রিকেটের মানটা একটু বুঝতে পারবেন। এক সময় অষ্ট্রেলিয়াতে প্রতিবছর ত্রিদেশীয় একটা টুর্নামেন্ট হতো। ১৯৯৪/৯৫ সালে হটাৎ করে চারজাতির টুর্নামেন্ট হলো। অষ্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আর জিম্বাবুয়ের সাথে চতুর্থ দলটা ছিল অষ্ট্রেলিয়া এ। ফাইনাল খেলেছিল কোন দুটো দল জানেন? অষ্ট্রেলিয়া আর অষ্ট্রেলিয়া এ। এ থেকে তাদের স্কোয়াডের ডেপথের একটা গভীরতা আচ করতে পারেন।

বাংলাদেশের বয়স ভিত্তিক ক্রিকেট কিংবা ঘরোয়া ক্রিকেটের মান আসলে কেমন? জাতীয় দলে সর্বোচ্চ ১৫ জন খেলোয়াড় সুযোগ পায়। পাইপা লাইনে আরো ১০ জন স্ট্যান্ড বাই থাকে। ধরে নিলাম সময়ের সাথে সাথে আরো ২৫ জন খেলোয়াড় নির্বাচকদের নজরে থাকে। কিন্তু ক্রিকেট কি ৫০ জন খেলেন? তা নিশ্চয়ই না।
জুবায়েরের কথা মনে আছে? সেই যে বিরাট কোহলিকে নাকানি চুবানি খাওয়ানো বোলার। কিন্তু এখন সে কোথায়? তাইজুলের ঘটনাও তো খুব বেশি দিন আগের নয়। ইলিয়াস সানি কিংবা আরাফাত সানির কথাটা ভাবুন।

একটা দলে স্বাভাবিক ভাবেই এতজন খেলোয়াড়কে সুযোগ দেওয়া সম্ভব না। কিন্তু এটার নিশ্চয়তা তো দেওয়া উচিত যে জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া মানেই তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়া নয়। ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা কিংবা ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের একজন খেলোয়াড়ও তার জীবনটাকে হেসে খেলে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে কাটিয়ে দিতে পারবে। জীবিকা নিয়ে তাকে ভাবতে হয় না। আর আমাদের জুবায়ের জাতীয় দলে জায়গা হারানোর পর বিপিএল এ দল পায় না।

এটা তো গেল একটা ফ্যাক্ট। দ্বিতীয় ফ্যাক্টরটা আরো করুন। স্বাভাবিক ভাবেই অন্যান্য বড় দেশের ঘরোয়া টুর্নামেন্টের তুলনায় আমাদের মান কিছুটা খারাপ। এরপরেও এখানকার পারফর্মারদেরই আগে সুযোগ পাওয়া উচিত। অথচ দেখুন আমাদের দলে সুযোগ পাওয়া বেশির ভাগ ক্রিকেটার ঘরোয়া লীগে নিজেকে যথেষ্ট পরিমাণ প্রমাণ না করেই চলে এসেছেন। সৌম্য সরকারের ঘরোয়া ফার্ষ্ট ক্লাস ক্রিকেটে গড় হচ্ছে মাত্র ২৭.৬৪। এই গড় নিয়ে সে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটেই যে নিজেকে যথেষ্ট প্রমাণ করতে পারেনি সে কিভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফল হবে? আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কি এর চেয়ে সহজ? আমি সৌম্যের দলে সুযোগ পাওয়ার বিপক্ষে নই, আমি সিলেকশন প্রক্রিয়াটার বিপক্ষে।

যিনি সৌম্যকে সিলেক্ট করেছেন তিনি হয়তো সৌম্যের ট্যালেন্ট ধরতে পেরেছেন। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে আমরা প্রথাগত নিয়মের বাইরে কেন যাব? যিনি ট্যালেন্ট নির্বাচন করছেন তার সেটা নির্বাচন করার ক্ষমতা আছে কিনা সেটা বিচার করছে কে? ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফর্মারকে সুযোগ দেবার প্রক্রিয়া সৃষ্টি হলে অন্তত আমাদের সামনে নির্বাচনের একটা ক্রাইটেরিয়া আসবে।
ট্যালেন্ট বিষয়টাও অগ্রাহ্য করার বিষয় না। কিন্তু এর সাথে যদি অবকাঠামোটা ঠিক করা যায় কিংবা পরিচর্যাটা সঠিক হয় তাহলে সেটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে। ১৯৯৯ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত অষ্ট্রেলিয়া দল এর একটা আদর্শ উদাহরণ। ম্যাকগ্রা, ওয়ার্ন কিংবা পন্টিং যথেষ্ট ট্যালেন্টেড ছিলেন। কিন্তু বাকি বিষয় গুলো তাদেরকে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

 

৩.
সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের বেশির ভাগ ক্রিকেটার এই ট্যালেন্ট মেথডেই দলে সুযোগ পেয়েছেন। মুশফিকুর রহিমের ফার্ষ্ট ক্লাস ডেব্যুর পাচ মাস পরেই টেষ্ট ডেব্যু হয়ে যায়, আরো অনেক খেলোয়াড়েরই এই অবস্থা। অথচ এরা যদি ঘরোয়া ক্রিকেটে আরেকটু পরিণত হয়ে জাতীয় দলে আসে তাহলে তাদের ক্যারিয়ার দৈর্ঘ্য বাড়ার সাথে সাথে জাতীয় দলের উপকৃত হবার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। অলক কাপালি, জুনায়েদ সিদ্দিক, তালহা জুবায়ের, শাহাদাত হোসাইন কিংবা আফতাব আহমেদের মতো ট্যালেন্টদের আমরা হারিয়েছি। বর্তমানের মুস্তাফিজদের আমরা হারাতে চাই না।

ট্যালেন্ট দেখে নির্বাচন করার আরেকটা সমস্যা হচ্ছে প্রতিটি মানুষের পছন্দ এক রকম হয় না। কাজেই ট্যালেন্ট একজনের কাছে এক এক রকম হবে। এই বিষয়টা পরিবর্তন হয় নির্বাচন কমিটির মানুষ স্পেশালি কোচ পরিবর্তন হবার সাথে সাথে। দেখা যাবে জেমি সিডন্স যাকে খুব ভালো ট্যালেন্ট মনে করেছিলেন হাতুরের কাছে তাকে মনে হচ্ছে ফালতু। একারণে পারফর্মেন্স প্রক্রিয়ার উপরেই আস্থা রাখা উচিত। তাতে নির্বাচনটা বায়াসড হবার সম্ভাবনা কমে যায়।

বাংলাদেশের আরেকটা সমস্যা হচ্ছে জাতি হিসেবে আমরা খুবই অস্থির প্রকৃতির। এই কারণে দীর্ঘ দিন ধরে গড়ে উঠা তামিম কিংবা সাকিব আল হাসান কে অল্প ব্যর্থতার জন্যেই দল থেকে বাদ দেবার জন্য আন্দোলন শুরু করে দেই। গত বিশ্বকাপের আগেও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে তামিম ইকবালকে নিয়েও কথা হয়েছে। এই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সাকিব আল হাসানকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।এই খেলোয়াড়গুলো অনেকদিনের পরিচর্যায় আজকের অবস্থানে এসেছে। এখন আমাদের ফল পাবার সময় । এই মুহুর্তে তাদের বাদ দেবার কথা মাথাতেই আনা উচিত না।

৪.
আমাদের খেলোয়াড়দের মান আসলে কেমন? খেলোয়াড় হচ্ছে একটা প্রোডাক্টের মতো। প্রোডাক্টের ডিমান্ড দেখে আপনি তার মান যাচাই করতে পারেন। দক্ষিন আফ্রিকা কিংবা অষ্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটের অনেক খেলোয়াড়কেও আইপিএল এ প্রচুর দাম দিয়ে কেনা হয়। সেই বিচারে বাংলাদেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের প্রোডাক্ট হচ্ছে সাকিব আল হাসান। মুস্তাফিজ কিছুটা লাইনে আছে। তবে আরো বছর দুয়েক না গেলে সেটা সম্পূর্ণ ভাবে বুঝা যাবে না।

আমাদের প্রোডাক্ট উন্নত করার পেছনে ম্যানেজম্যান্টকে আরো কাজ করতে হবে।
শুরুর প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসি। একটা সময় আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের মান দূর্বল ছিল। কিন্তু এখন সম্ভব সেটাকে ভালো অবস্থানে নিয়ে আসা। এর জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠ পরিকল্পনা আর তার বাস্তবায়ন। প্রতি প্রজন্মেই আমরা সাকিব আল হাসান কিংবা তামিম মাশরাফিদের পাব না। ঠিক যেমনটা অষ্ট্রেলিয়া পায় নি ম্যাকগ্রা পন্টিং দের মতো খেলোয়াড়, পাকিস্তান পায় নি ওয়াসিম ওয়াকারের মতো বোলার কিংবা ওয়েষ্ট ইন্ডিজ পায় নি মার্শাল, ভিভ রিচার্ডসদের মতো খেলোয়াড়। কিন্তু এর পরেও অষ্ট্রেলিয়ার অবস্থান পাকিস্তান কিংবা ওয়েষ্ট ইন্ডিজের মতো খারাপ হয়ে যায় নি তাদের অবকাঠামো ঠিক থাকার কারণে। বর্তমানে অষ্ট্রেলিয়ার যে অবস্থা আছে সেটা হয়তো অচিরেই কেটে যাবে কিন্তু পাকিস্তান কিংবা ওয়েষ্ট ইন্ডিজের সমস্যা এত তাড়াতাড়ি শেষ হবার না।

আমরা চাই না আমাদের সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মুশফিক, রিয়াদ চলে যাবার পর একটা বড় ধরণের শূণ্যতা আসুক অথবা পরবর্তী সাকিব মুশফিকদের পাওয়ার জন্য এতটা সময় লাগুক। সেজন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট কিভাবে ভালো হবে সেটা নিয়েই সবার ভাবা উচিত। অন্য দেশকে ভালোবেসে কিংবা ঘৃণা করে সময় নষ্ট না করে নিজের দেশকে কিভাবে একটা অবস্থানে নিয়ে আসা যায় সেদিকেই নজর দেওয়া উচিত।

Leave a Reply