শুভ জন্মদিন মিঃ ফিনিশার

১.
৪৩ ওভারে ১৭২ রানের টার্গেট এই যুগে তেমন বড় কিছু না। আজকাল টি২০ তেও এই রান কোন সমস্যা মনে করা হয় না। ১৯৯৫/৯৬ সালের প্রেক্ষাপটেও তেমন বড় কিছু ছিল না। কিন্তু অ্যামব্রোস আর ওয়ালসের মতো বোলাররা যেদিন আগুন জড়ায় সেদিন রান করা দূরে থাক, টিকে থাকাটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেই আগুন জড়ানো বোলিং এর সামনেই পড়েছিলেন অষ্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা। ৪ রানে ১ম উইকেট, ১৫ রানে ২য়, ১৫ রানেই ৩য়, ৩২ রানে ৪র্থ উইকেট পড়ার পর মাঠে নামলেন মাইকেল বেভান। ৩৮ রানে ৫ম ও ৬ষ্ঠ আর ৭৪ রানে ৭ম উইকেট পড়ার পর অষ্ট্রেলিয়ার পক্ষে বাজি ধরার মতো কেউ ছিল না। ক্রিজে বেভান ছাড়া আর কোন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান নেই। সেই অবস্থায় রেইফেলকে নিয়ে গড়লেন ৮৩ রানের জুটি। রেইফেলও বেভানের সাহস পেয়ে স্বীকৃত ব্যাটসম্যানের মতোই খেললেন। ১৫৭ রানে যখন রেইফেলও তাকে ছেড়ে চলে গেলেন তখন বেভানের হাতে সুযোগ একেবারেই কম। সাথে থাকা ওয়ার্নকে তাই বেশী স্ট্রাইক দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। ১০ রানের জুটিতে ওয়ার্নের অবদান তাই মাত্র ৩, সেটাও ৪ বল খেলে। ওয়ার্ন আউট হবার পর বেভান বুঝে গেল মূল কাজটা তাকেই করতে হবে। শুধু রান করলেই চলবে না, সাথে সাথে স্ট্রাইকটাও ধরে রাখতে হবে। স্ট্রাইক ধরে রাখতে চাইলে ৪২ ওভারের শেষ বলে সিঙ্গেল নিতে হতো। কিন্তু ৭ বলে ১১ রানের প্রয়োজনটাকে ৪ মেরে নামিয়ে নিয়ে আসলেন ৬ বলে ৭ রানে। শেষ ওভারের প্রথম বলে রান হলো না। ২য় বল ওয়াইড, ৫ বলে ৬ দরকার। পরের বলে অফ সাইডে বল ফেলেই জায়গা বদল করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ওয়ার্ন রান আউট হয়ে গেলেন। শেষ উইকেট, প্রয়োজন ৪ বলে ৬ রান। পরের বলে আবার ১ রান, দ্বিতীয় রান নিতে গিয়েও ফিল্ডারের হাতে বল থাকায় নিতে পারলেন না। ৩ বলে ৫ রান প্রয়োজন, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে স্ট্রাইকে ম্যকগ্রা, যিনি সেই সব বিরল খেলোয়াড়দের মাঝে একজন যাদের উইকেটের চেয়ে রান সংখ্যা কম ( রান ১১৫, উইকেট ৩৮১)। মাঠের সবাই দুশ্চিন্তায় ছিলেন ম্যাকগ্রা টিকতে পারবেন কিনা। প্রথম বলেই রান নিয়ে সেই দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন ম্যাকগ্রা। পরের বলে বেভানের শটে বল সরাসরি বোলারের হাতে চলে যাওয়ায় প্রয়োজন পড়লো ১ বলে ৪ রানের। শেষ বলে বোলারের মাথার উপর দিয়ে ৪ মেরে ম্যাচটাকে জিতিয়েই ফিরলেন বেভান। গত শতাব্দীর সেরা ১০০ টি ওডিআই ইনিংসের তালিকায় ম্যাচটা জায়গা পেয়েছে ৮৪ নম্বরে।

২.
ঢাকা ষ্টেডিয়ামের একটা ম্যাচের কথা বলি। ২০০০ সালের ঘটনা। এশিয়া একাদশ আর বিশ্ব একাদশের ম্যাচ। বিশ্ব একাদশের দলটা তুলনামূলকভাবে দূর্বল। লারা, ওয়ালশ, ওয়াহ, ওয়ার্ন, ম্যাকগ্রা’র মতো অনেক খেলোয়াড়রাই অনুপস্থিত। ৩২০ রানের টার্গেট দেওয়ার পর ম্যাচটা যে এশিয়া একাদশ জিততে যাচ্ছে সেটাও মোটামুটি বলে দেওয়া যাচ্ছিল। ওয়াসিম, ভাস আর মুরালির বিপক্ষে দাড়ানোর মতো ব্যাটসম্যানই তো খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ১৯৬ রানে ৭ উইকেট পড়ার পর মনে হচ্ছিল ম্যাচটা আর দেখার প্রয়োজনই নেই। কিন্তু এরপর একা যেভাবে বেভান ঘুরে দাড়ালেন তা ইতিহাসেই বিরল। শেষ ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ২১ রান, শেষ বলে ৬। বেভান ৪ মারায় ম্যাচটা হারে ১ রানে। অথচ আগের বলটাতে সময়মতো দৌড়ালে ক্যাডিক রান আউট হতো না, সাথে আরেকটা রান বেড়ে ম্যাচটা ড্র হতো। সেটাই হতো সেই ম্যাচের জন্য সবচেয়ে সুন্দর রেজাল্ট। ইনিংসে বেভান করেছিলেন ১৩২ বলে অপরাজিত ১৮৫ রান। ২য় সর্বোচ্চ ২৮ রান, এ থেকে আপনি ধারণা পেতে পারেন কতটা একা টেনেছিলেন বেভান। শুধুমাত্র প্রীতি ম্যাচ বলে ইনিংসটা প্রাপ্য মর্যাদা পায়নি। আন্তর্জাতিক ম্যাচ হলে নিঃসন্দেহে প্রথম ১০ টার মাঝে জায়গা পেয়ে যেত।

৩.
‘তীরে এসে তরি ডুবা’ – কথাটার অর্থ হচ্ছে লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি এসে ব্যর্থ হওয়া। এই ব্যর্থ হবার পেছনে অনেক কারণ থাকে। হয়তো আপনার যোগ্যতা নেই, অথবা আপনার প্রতিপক্ষ আপনার চেয়ে বেশি শক্তিশালী কিংবা আপনার ভাগ্য খারাপ – এমন অসংখ্য যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু ক্রিকেট মাঠে আপনার প্রতিপক্ষ দলে যদি মাইকেল বেভানের মতো ব্যাটসম্যান থাকেন তাহলে সেই একটা কারণই যথেষ্ট আপনার তরি ডুবানোর জন্য। কত দলের প্রায় জিতে যাওয়া ম্যাচ যে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছেন তা কল্পনার বাইরে। অথচ ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় ব্যাটিং করেছেন ৬ নম্বরে।

লোয়ার অর্ডারে ব্যাটিং করার সমস্যা অনেক। টপ অর্ডারে ব্যাটিং করার সুবিধা হচ্ছে আপনি প্রতিদিনই সুযোগটা পাচ্ছেন। একজন ব্যাটসম্যান স্বাভাবিকভাবেই প্রতি ম্যাচে ভালো খেলতে পারবেন না। প্রতিদিন তার যাবে না। কিন্তু লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যান দেখা যাবে তার জন্য নির্ধারিত দিনে তিনি ব্যাটিং এ নামারই সুযোগ পেলেন না। অথবা অনেক দিন সুযোগ পেলেও পরিস্থিতির কারণে হয়তো নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারছেন না কিংবা বল সংখ্যাও কম। এই কম সুযোগের মাঝেও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। কাজটা নিঃসন্দেহে সহজ নয়। ওয়ানডেতে কমপক্ষে ৩০টি ইনিংস খেলেছেন এমন ব্যাটসম্যানের মাঝে বেভানের গড় হচ্ছে ৩য় সর্বোচ্চ (৫৩.৫৮)। লিস্ট ওয়ানে কমপক্ষে ১০,০০০ রান করেছেন এমন ব্যাটসম্যানদের মাঝে তার গড় সর্বোচ্চ (৫৭+), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হচ্ছে ডিন জোন্সের (৪৬.৯৩)। ওডিআই ক্রিকেট ইতিহাসে কমপক্ষে ৩০টি ইনিংস খেলেছেন এমন খেলোয়াড়দের মাঝে মাত্র দুজন ব্যাটসম্যান আছেন যাদের ক্যারিয়ার গড় কখনোই ৪০ এর নীচে নামে নি। বেভান হচ্ছেন এই দুইজনের একজন ( আরেকজন মাইকেল হাসি)।

৪.
টেষ্ট কম খেলেছেন, মাত্র ১৮টি। ৮২ রানের ইনিংস দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু, পরের ইনিংসে ১ম বলে আউট হয়ে গেলেও তার পরের দুইটি ইনিংসে ৭০ আর ৯১ রানের দুটো ইনিংস। প্রথম ৩ টেষ্ট শেষে ৮১ গড়ে রান ২৪৩। এরপরেও টেষ্ট ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ না হবার পেছনে মূল কারণ ধরা হয় শর্ট বলে দুর্বলতা থাকার কারণে। ১৯৯৮ সালেই তাই শেষ টেষ্টটা খেলা হয়ে যায়। এর মাঝে হাইলাইটিং টেষ্ট হচ্ছে ৯৬/৯৭ মৌসুমে ওয়েষ্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচটা। সেই ম্যাচে খেলেছিলেন বোলার হিসেবে। দুই ইনিংসে উইকেট পেয়েছিলেন ১০টি ( ১ম ইনিংসে ৪টি, ২য় ইনিংসে ৬টি)। একটি মাত্র ইনিংসে ব্যাট করে করেছিলেন অপরাজিত ৮৫ রান। ইনিংস ও ১৮৩ রানে জেতা ম্যাচের ম্যান অব দি ম্যাচও হন তিনি।

প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারটাও খারাপ ছিল না। ৫৭.৩২ গড় অনেক গ্রেট ব্যাটসম্যানের চেয়েও বেশী। আসলে আমার ব্যাক্তিগতভাবে মনে হয় বেভান টেষ্টেও খারাপ খেলতেন না যদি অষ্ট্রেলিয়া না হয়ে অন্য কোন দলে খেলতেন। সেই সময়ে অষ্ট্রেলিয়া দলে ব্যাটসম্যানের এমন আনাগোনা ছিল যে একটু ব্যর্থতাই আপনাকে অনেকখানি পিছিয়ে দিত, সেটাই হয়েছে। ২০০৪/০৫ সালেও তাসমিনিয়ার হয়ে শেফিড শিল্ডে রেকর্ড ১৪৬৪ রান করেন। কিন্তু বয়সের কারণে আর সুযোগ পাননি।

৫.
ক্রিকেটে অনেক খেলোয়াড়ের অনেক নিক নেইম আছে। কিছু নিক নেইম তার বৈশিষ্ট্য বহন করে। বেভানের নিক নেইম ছিল ‘ফিনিশার’। ফিনিশারের কাজটা কিন্তু সহজ নয়, এজন্যই যুগে যুগে অনেক রান মেশিন আসলেই ফিনিশার সেভাবে আসেননি। বেভানের পরেই যেমন ধোনি, মাইক হাসি কিংবা যুবরাজ বাদে আর কারো নাম সেভাবে উঠে আসে না। তবে ইতিহাসের সেরা ফিনিশার খুব সম্ভবত মাইকেল বেভানই। কখনোই মনে হতো না যে রান করার জন্য খুব তাড়া আছে। কিন্তু স্কোর বোর্ডটা খুব ভালোভাবে সচল রাখতেন। ওয়ানডের জন্য খুবই কার্যকরী ব্যাটসম্যান ছিলেন। একারণেই গত শতাব্দীর সেরা ক্রিকেটারের তালিকায় পন্টিং আর লারাকে টপকিয়ে বেভান সুযোগ পেয়েছিলেন ৩ নম্বরে।

মিডিয়ার এই যুগে বেভানের নাম হয়তো খুব বেশী মানুষ মনে রাখবেন না। কিন্তু আমরা যারা বেভানের কীর্তির চাক্ষুস সাক্ষী তারা কিভাবে ভুলবো এই ফিনিশারকে।

আজ জন্মদিনে (৮ই মে) বেভানকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
শুভ জন্মদিন ফিনিশার।

Leave a Reply