বিশ্বসেরা হবার শিক্ষকঃ শুভ জন্মদিন

দশ বছর আগে যদি আপনাকে এসে আমি বলতাম, আমাদের দেশের একটা ছেলে ক্রিকেটে বিশ্বসেরা হবে, আপনি নিশ্চয়ই হো হো করে হেসে উঠতেন। জেমি সিডন্স যখন অজি লেগ স্পিনার ক্যারি ও কিফ এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছিলেন আমাদের একটা ছেলে বিশ্বের সেরা ফিঙ্গার স্পিনার, দেবব্রতদা এর মতো সাংবাদিকরা হেসেছিলেন!

সমস্যা হলো, আপনি যেই জিনিসটায় ১০ বছর আগে হাসতেন, আমাদের একটা ছেলে সেই জিনিসটা ৮ বছর ধরে সেটা করে আসছে।

ছেলেটার নাম বোধহয় অনুমান করেই ফেলেছেন এতক্ষণে।
জ্বি হ্যা, সাকিব আল হাসানের কথাই বলছি। মাগুরার সেই শুকনো ছেলেটা, যার হেলমেটটা বড় থাকায় একটু একটু পর পর ঠিক করে নিতেন, যিনি আমাদের বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন, হ্যা আমরা ও পারি বিশ্বসেরা হতে, আমরাও শিখরে বসে আধিপত্য বিস্তার করতে পারি।

পরিসংখ্যান জিনিসটা উইকিপিডিয়া, গুগল ঘাটলেই পেয়ে যাবেন, আমি নাহয় সাকিব আল হাসানের রেকর্ড বইয়ের বাইরের গল্প বলি!

বিকেএসপির যেই ট্রায়াল থেকে সিলেক্টেড হলেন, সেই ট্রায়ালে ফয়সালের নড়াইল যাওয়ার কারণটা সিলেক্ট হওয়ার চেয়ে জাতীয় তারকা মাশরাফি দর্শনই বেশী। সিলেক্ট তো হলেনই বরং তখনকার ধুন্ধুমার মার দেওয়া মাশরাফিকে বল করে মারতে দিলেন না!

পুরো দেশে ট্রায়াল শেষ হওয়ার পর সাকিব আল হাসান নামের ফাইলটার উপর “1” লেখা, যেই সংখ্যাটা সাকিবের আজীবন সাথী। যেই বাবা ব্যাট কেটে ফেলেছিলেন, তিনিই প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে সব ক্রিকেট কিট কিনে দিলেন।

বিকেএসপিতে এসে ফয়সাল একা। ছেলেরা টিম বানিয়ে খেলে, সাকিবের জায়গা হয় না সেখানে। একদিন ভাগ্যের ফেরেই এক দলের এক ছেলে অসুস্থ, তার জায়গায় সুযোগ পেয়ে গেলেন। আর নেমেই বাজিমাৎ! সেঞ্চুরি করেছিলেন কিনা ঠিক মনে নেই, তবে দলে জায়গা যে পাকা হয়ে গিয়েছিলো তা বলা বাহুল্য।

বয়সভিত্তিক দলের কোচ কে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “আপনার দলের সেরা ব্যাটসম্যান কে?” উত্তর, “সাকিব আল হাসান”। “সেরা বোলার?” – “সাকিব আল হাসান”। সাংবাদিক মোটামুটি উত্তর ধারণা করেই শেষ প্রশ্নটা করলেন, “সেরা ফিল্ডার?” স্মিত হেসে কোচের উত্তর ছিলো, “সাকিব আল হাসান!”

সাকিব আল হাসানের পরিচয়টা এই। তিনি যেন মিডাস, যেখানেই হাত ছোয়ান সোনা হয়ে যায়।

এই সাকিবের অভিষেক হলো ২০০৬ এ জিম্বাবুয়েতে, খুব সম্ভবত হারারে স্পোর্টস গ্রাউন্ডে। তার আগে এক প্রস্তুতি ম্যাচে সাকিবের বোলিং দেখে অধিনায়ক হাবিবুল বাশার বিরক্ত। কারণটা এই, যেই জিম্বাবুইয়ানরা স্পিন খেলতেই পারে না, তারাও এই ছেলেটাকে সবাই ভালো খেলছে। পরে শেষ ম্যাচে অভিষিক্ত হলেন সাকিব, আর অবাক হলেন হাবিবুল বাশার। প্রস্তুতি ম্যাচে যা যা ভুল সাকিবের, ম্যাচে কিচ্ছু নেই! সেই থেকে সাকিব আল হাসানের জন্য হাবিবুল বাশার এর এক কথা “সাকিব এক ভুল দুইবার করে না”

যদিও হাবিবুল বাশার এর এই কথার সাথে বর্তমানে বেশীরভাগ সমর্থকই দৃঢ় গলায় প্রতিবাদ জানাবেন। কারণটা বর্তমানে সাকিব আল হাসানের ব্যাটিং। প্রায় ম্যাচেই আউট হচ্ছেন সেম ভঙ্গিতে, অদ্ভুত শট খেলে।

কিন্তু আমি কিন্তু এই জিনিসটার জন্য সাকিবকে দোষারোপ করি না। সাকিবের ব্যাটিং টেকনিক অনেকটা ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান, এটাক করতে পারে, বাট ডিফেন্সটা বড় নড়বড়ে। সেইজন্য সাকিবের হাতে অস্ত্র একটাই, আক্রমণ। তবে তিনি যে মাথা ঠান্ডা রেখেও খেলতে পারেন, তা বোধহয় কলম্বো টেস্টে প্রমাণ করে দিয়েছেন!

যাই হোক, সাকিবের নামের আশ্চর্য গল্পে ফিরে যাই। ২০০৭ বিশ্বকাপ গেলো, সাকিব – আশরাফুল, তামিম, মাশরাফিদের আড়ালে নিজেকে প্রকাশ করার জন্য ২০০৮ সালের নিউজিল্যান্ড টেস্ট সিরিজটা বেছে নিলেন, বোলিং ফিগার ৭/৩৬! ৬ বছর পর যেটা ভাঙলেন তাইজুল ইসলাম, তাও দুর্বল এক জিম্বাবুয়ের সাথে। টেস্টটা ভেট্টরি কেড়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু সাকিব আল হাসান ঘোষণা দিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি আসছেন।

২০০৯ সালে প্রথমবারের মত পুরোপুরি প্রকাশ করলেন তিনি কি, এক হাতে হোয়াইটওয়াশ করলেন নিউজিল্যান্ড কে, যেটা আতাহার আলীর মুখের জাদুতে বাংলাওয়াশ হয়ে গেলো, কিন্তু কিউই কোন খেলোয়াড়কে সিরিজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা যে সাকিবওয়াশড হয়েছে, তা বলতে বোধহয় দ্বিধা বোধ করতেন না।

ওই সিরিজের অধিনায়কত্ব প্রাপ্তি, মাশরাফির ইঞ্জুরিতে। সেটা হারালেন ২০১২তে, জিম্বাবুয়ের কাছে ৩-২ এ সিরিজ হারার পর। এর মাঝে ঘরের মাঠে ৫৮ আর ৭৮ ও অল আউট হওয়ার পর কলমে সাবেকদের প্রশ্ন করায় প্রশ্নবিদ্ধ সাকিব।

এরপর ২০১২ এশিয়া কাপ। পাকিস্তানের কাছে ২ রানে হারা ফাইনালটা এতখানি আমাদের মনে দাগ কেটে রয়েছে যে আমরা হয়ত ভুলেই যাই, সেই এশিয়া কাপটা সাকিবময় ছিলো। ভারতের সাথে বিতর্কিত এক স্টাম্পিং এর সিদ্ধান্তে ৪৯ এ আউট হয়েছিলেন, তাছাড়া বাকি ৩ ম্যাচেই ফিফটি। বল হাতেও সেই সাকিবিয়তা, ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট তাই সাকিব আল হাসানই হয়েছিলেন। ২ বছর পর ফুটবল বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির গোল্ডেন বল জেতার সাথে যেটার অদ্ভুত মিল।

২০১৪ সালটি বড় ভয়ংকর ছিলো তার জন্য। শ্রীলংকার সাথে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ হলেন, তার অনুপস্থিতিতে আফগানিস্তান এর সাথে বাংলাদেশের হার। ফিরে ১৬ বলে ৪৪ করলেন পাকিস্তানের সাথে, ভাগ্যফেরে ৩২৯ করেও হার। এরপর নতুন কোচ হাতুরুসিংহের সাথে তর্কাতর্কি, এনওসি না নিয়ে সিপিএল খেলতে যাওয়ায় জাতীয় দল থেকে ৬ মাস আর বিদেশী অর্থকরী লীগ থেকে ১৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা। সাকিববিহীন বাংলাদেশ ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে হাবুডুবু খেলো, আর প্রত্যেক বাঙালির তখন আফসোস, “ইশ! যদি সাকিব থাকতো!”। হুশ হওয়ায় বিসিবি নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে নিয়ে জিম্বাবুয়ে সিরিজেই ফেরত আনলো তাকে। ফলাফল? প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট, দ্বিতীয় টেস্টে সেঞ্চুরি ও ১০ উইকেট। ওয়ানডেতেও প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি আর ৪ উইকেট। ফিরলেন, রাজার মতই।

২০১৫ রূপকথায় অবদান রাখলেন চুপ করে, নতুনরা আসছে, ওরাই নায়ক হোক না! সাকিব আল হাসান তাই আজকাল পার্শ্বনায়ক হয়েও খলনায়কদের ধ্বসিয়ে দেন।

২০১৬ তে ইংল্যান্ড সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে দলকে জয়ের মুখে নিয়ে গিয়ে আউট হওয়ার পর হারার জন্য দায়টা তারই কাধে। আর টেস্টে ইংল্যান্ডকে হারানোর সিরিজে মিরাজের পাশে সাথ দেওয়া বোলারটার নামও সাকিব আল হাসানই।

২০১৭ তে নিউজিল্যান্ড এ ডাবল সেঞ্চুরি করলেন, তামিমের রেকর্ড ভেঙ্গে এখন তিনিই শীর্ষে। ভারতের সাথে ৮৬ করে আত্মহনন, শ্রীলংকায় এসে সাকিব আল হাসানের যে ধৈর্য জিনিসটা যথেষ্টই আছে, তা বুঝিয়ে দিলেন।

গল্পটা চলবে, আরও বহু বছর। আমার সাকিব আল হাসান নিয়ে এত পাগলামোর কারণটা এই যে, আমার ক্রিকেট দেখার বয়সটা সাকিব আল হাসানের ক্যারিয়ার এর সমান্তরালে।

সাকিব আল হাসান কোথায় অনন্য? জ্যাক ক্যালিস কে আপনি বোলার হিসাবে চাইলেই বাদ দিতে পারেন, ইয়ান বোথামকে আপনি দলের সেরা বোলার বা ব্যাটসম্যান বলতে পারবেন? নাহ। কিন্তু সাকিবকে না পারবেন বোলিং অলরাউন্ডার বলতে, না পারবেন ব্যাটিং অলরাউন্ডার বলতে। দলের সেরা ব্যাটসম্যান আর বোলার ও এই মানুষটাই, এই লোকটা এক সাথে টেস্ট, ওয়ানডে আর টি২০ এর সেরা অলরাউন্ডার, উনাকে মানুষ বলতে আমার ভালোই আপত্তি। আর একটা কথা, সাকিব কি কখনও বোথাম ক্যালিসদের দল পেয়েছেন? তাদের সমান ম্যাচ খেলতে পেরেছেন? নাহ। পারলে কি হতো তা ভাবতে আমার কষ্টই লাগে, বড় ভুল জায়গায় জন্মেছো সাকিব!

সাকিব আল হাসানকে নিয়ে মাশরাফির একটা উক্তি খুব ভাল্লাগে, “ও আমাদের বিশ্বাস করা শিখিয়েছে, যে আমরা ও বিশ্বসেরা হতে পারি। সাকিব একটা ব্র‍্যান্ড”। আজকের আমাদের বাঘা বাঘা সৌম্য, সাব্বির, মিরাজ, মোসাদ্দেকরা যে সাকিব থেকেই অনুপ্রাণিত, তা কি বলে দিতে হবে?

আজ ২৪শে মার্চ, ৩০ বসন্ত আগে মাগুরায় জন্মেছিলেন সাকিব আল হাসান। বয়সটা ৩০ হয়ে গেলো? ক্রান্তিকাল এসে পড়েছে, দশকের ঘরে ৩ সংখ্যাটা খেলোয়াড়দের বয়সের জন্য খুব ভাল না। আর মাত্র ৭-৮ বছর? এরপর আর হঠাৎ দুই-তিনটা উইকেট পড়ে গেলে আর মনে মনে বলবো না,”ধুর! টেনশন নাই! সাকিব আছে তো!”? উইকেট না গেলে বলবো না,”আরে সাকিব আসলেই যাইবোগা!”? বড় কপালজোরে সাকিব আল হাসানকে পেয়েছিলাম, আরেকজন আর পাবো না। ধুর কি দিনে কি সব বলছি, উৎসবের দিন কেনো মন খারাপ করাচ্ছি? নাহ, লেখাটা বড় বেশী বড় হয়ে যাচ্ছে, জন্মদিনের উইশটা করেই ফেলি তাহলে,

শুভ জন্মদিন সাকিব আল হাসান, দ্য গ্রেটেস্ট অফ বাংলাদেশ ক্রিকেট হিস্টোরি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্রিকেট ইতিহাসেরই সর্বকালের সেরা। আপনি সাকিবের চেয়ে ভালো ব্যাটসম্যান অবশ্যই পাবেন, বোলারও বোধহয় পেয়ে যাবেন, ফিল্ডার তো পাবেনই! কিন্তু আরেকটা সাকিব আল হাসান?

উহু, তা সম্ভব না!

Leave a Reply