শুভ জন্মদিন এক্সপ্রেস

১.
যে কোন খেলাতেই গতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আপনি প্রতিপক্ষের চেয়ে যত বেশী দ্রুত গতি সম্পন্ন হবেন ততটাই এগিয়ে যাবেন। এখন বিষয়টা নির্ভর করে খেলার ধরণের উপর। মনে করুন আপনি সাতার খেলছেন, সেখানে গতিটা সরাসরি রিলেটেড। আবার যদি দাবা খেলেন তাহলে আপনার বুদ্ধিমত্তার গতি গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের জন্য গতির গুরুত্ব পরে আসবে। ব্যাটসম্যান দ্রুত গতিতে ব্যাট চালাচ্ছে এটা সবসময় কাজে নাও লাগতে পারে, দেখা গেল বেশী দ্রুত ব্যাট চালাতে গিয়ে বল আসলো পরে। ব্যাটসম্যানের জন্য গুরুত্বপুর্ন হচ্ছে টাইমিং। কিন্তু একজন বোলারের জন্য গতিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা পেস হোক কিংবা স্পিন। শুধু গতি দিয়ে একজন বোলার কখনোই কিছু করতে পারবেন না, এর সাথে তাকে বোলিং এর অন্যান্য কৌশল যেমন লাইন লেংথ, সুইং, নিয়ন্ত্রণ – এসব রিলেটেড বিষয়ের দিকে লক্ষ রাখতে হয়। তবে এই বিষয়গুলো একজন বোলার প্র্যাকটিসের মাধ্যমে আয়ত্ব করতে পারেন। কিন্তু গতিটা উপরওয়ালার একটা উপহার।

বিশ্বের এমন কোন ব্যাটসম্যান নেই যিনি কিনা গতির সামনে অস্বস্তি বোধ করেন না। ইতিহাস বলে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান ব্র্যাডম্যানকে আটকানোর জন্য সেই সময়ের ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন লারউডকে বেছে নিয়েছিলেন তার গতির জন্য। ক্রিকেট ইতিহাসে সেই কুখ্যাত বডিলাইন সিরিজের মূলমন্ত্র ছিল ব্র্যাডম্যানকে যে কোন উপায়েই আটকানো। এজন্য লেগ সাইডে একাধিক ফিল্ডার রেখে অনবরত ব্যাটসম্যানের শরীর লক্ষ করে বল ছুড়ে পরাস্ত করার চেষ্টা ছিল। একাজে প্রয়োজন ছিল একজন গতিশীল বোলার। লারউড তেমনই একজন গতিসম্পন্ন বোলার ছিলেন।

১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ওয়াকার আর অ্যামব্রোসের বল এড়িয়ে যেতে চাননি এমন ব্যাটসম্যান খুঁজে পাওয়া যাবে না। ব্রায়ান লারার একটা সাক্ষাতকারে পাওয়া যায় তিনি ওয়াসিম আকরামের একটা ওভার এড়ানোর জন্য তার পার্টনার ডেসমন্ড হেইন্স কে অনুরোধ করেছিলেন। দুটো বল খেলার পরেই হেইন্স স্ট্রাইক পালটিয়ে লারাকে দিয়ে দেন। কে চায় গতির সামনে নিজেকে ঝুকির মুখে ফেলতে? মনে রাখতে হবে শচীন টেন্ডুলকার আসার আগ পর্যন্ত ডেসমন্ড হেইন্স ছিলেন ওয়ানডের সেরা ওপেনার। ওয়েষ্ট ইন্ডিজের বিখ্যাত পেস চতুষ্টয় নিয়ে তো লয়েড সর্বজয়ী দলে পরিণত করেছিলেন উইন্ডিজকে। এছাড়া ১৯৯৯ সালের পর শোয়েব আখতারের বলের সামনে অনেক সময়েই শচীন কিংবা লারাকে অসহায় লেগেছে। গাঙ্গুলী তো শোয়েবের সামনে সমানে নেচে চলেছেন। আরেক পেস ব্যাটারি ব্রেট লির নামও মনে রাখতে হবে। এরা সবসময়েই তাদের সময়কে জয় করে গিয়েছেন।

২.
পেস বোলারদের একটা সমস্যা হচ্ছে তাদের ক্যারিয়ারটা অন্য সব খেলোয়াড়দের তুলনায় অনেক ক্ষনস্থায়ী হয়। ইনজুরির সাথে লড়তে হয় পুরো ক্যারিয়ারেই, তাছাড়া একটা বয়সের পরে গতিটাও আগের মতো থাকে না। সেজন্য একজন ব্যাটসম্যান কিংবা স্পিনার যেখানে ৩৫ বছর বয়সেও দাপটের সাথে খেলতে পারে সেখানে ৩০ এর পরেই পেস বোলারদের দাপট কমতে থাকে যদি তারা তাদের পেস কমিয়ে অন্য দিকে নজর না দেন। ওয়াসিম আকরাম কিংবা গ্লেন ম্যাকগ্রাথের মতো বোলাররা ৩৫+ পর্যন্ত খেলে গিয়েছিলেন তাদের ভ্যারিয়েশনের জন্য।

পেস বোলার আসলে তৈরী করা যায় না, এরা জন্মায়। ভারত অনেকদিন যাবত চেষ্টা করেও এক কপিল দেব ছাড়া আর কোন পারফেক্ট পেস বোলার বের করতে পারেনি। যেখানে প্রতি জেনারেশনেই পাকিস্তানে পেস বোলার বের হচ্ছে। এমনকি একই সময়ে একাধিক পেস বোলার আসার কারণে আকিব জাভেদের মতো বোলারকে ক্যারিয়ার শেষ করতে হয়েছে আক্ষেপ নিয়ে।

অন্য সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশ কিছুটা নতুন ক্রিকেটে। কিন্তু সেই হিসেবে বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন পেস বোলারের জন্ম হয়ে গিয়েছে অলরেডি। মাশরাফি থেকে শুরু করে রাসেল, রুবেল এরকম কয়েকজন পেস বোলারের আগমন হয়েছে যেখানে শ্রীলঙ্কার মতো দেশে এক মালিঙ্গা বাদে আর কোন পারফেক্ট পেস বোলার আসেনি। বাংলাদেশে পেস বোলারের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজনের একজন তাসকিন আহমেদ।

৩.
২০১১ সালের অক্টোবরে ঢাকা মেট্রোপলিটিনের হয়ে বরিশাল বিভাগের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তাসকিনের অভিষেক হয়। ব্যক্তিগত ২য় টুয়েন্টি ২০ খেলাতেই চিটাগাং কিংসের হয়ে রাজশাহীর বিপক্ষে ৩১ রানে ৪ উইকেট নেন এবং ম্যান অব দি ম্যাচ হন।

২০১৪ সালে টি টুয়েন্টিতে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। একই বছরে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডেতে অভিষেকে হয়। সেই ম্যাচে তিনি ৫ উইকেট পান। প্রথম বাংলাদেশী ক্রিকেটার হিসেবে তিনি অভিষেক ওয়ানডেতে পাচ উইকেট নেন। ৫ মার্চ, ২০১৫ তারিখে বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ৪র্থ খেলায় তিনি ৪৩ রানের বিনিময়ে ৩ উইকেট দখল করেন। ঐ খেলায় বাংলাদেশ দল বিশাল রান তাড়া করে ৬ উইকেটের কৃতিত্বপূর্ণ জয়লাভ করে। এছাড়া ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তার টেষ্ট অভিষেকও হয়।

রুবেল হোসেনের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় দ্রুততম বলটি করেছেন তাসকিন আহমেদ। রুবেল হোসেন ২০০৯ সালে ICC World Twenty20 তে ১৪৯.৫ কিমি/ঘন্টা গতিতে বল করেন। তাসকিন ২০১৬ সালের এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৪৮ কিমি/ঘন্টা গতিতে বল করেন। পেস বোলারদের আরেকটা সমস্যা হচ্ছে গতি ধরে রাখতে না পারা। তাসকিন আহমেদ মোটামুটি ধারাবাহিক ভাবে ১৪৫ কিমি/ঘন্টা গতিতে বল করে চলছেন।

৪.
আপনার কাছে দশ কোটি টাকা থাকা একটা বিষয় আর এই টাকাটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো আরেকটা বিষয়। তাসকিন আমাদের জন্য একটা অসাধারণ সম্পদ। এখন এই সম্পদকে ঠিকভাবে কাজে লাগানোর দায়িত্ব আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের। ১৯৯৫ সালের আজকের দিনে জন্মেছেন আমাদের এই স্পিডস্টার। আজ তার ২১ বছর পূর্ন হলো। একটা সময় আসবে যখন স্বাভাবিক নিয়মেই তাসকিন তার মূল অস্ত্র গতিটা হারিয়ে ফেলবেন। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত তাসকিন তার গতি দিয়ে বিশ্বের যাবতীয় ব্যাটসম্যানদের ভীত করে রাখবে এই আশায় থাকলাম। বিশ্বের যে কোন ব্যাটসম্যান বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার সময় যেন তাসকিনকে নিয়ে আতঙ্কিত থাকে এই আশা করাটা এখন আর অলীক কল্পনা নয়।

মাশরাফি পরবর্তী যুগে একসময় বাংলাদেশের পেস বোলিং এর নেতৃত্ব তাসকিন আহমেদকেই দিতে হবে। সম্ভবত এক সময় বাংলাদেশের অধিনায়কও হবেন তিনি। জন্মদিনে এই কামনা করি তাসকিন যেন সুস্থ ভাবে তার ক্যারিয়ারটা শেষ করতে পারে। মাশরাফি’র মতো আক্ষেপ হয়ে যেন না থাকেন।

Leave a Reply