হাসিম আমলাঃ বাইশ গজের কবি

বর্তমান সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান কে, তা নির্বাচন করতে আমাদের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়তে হয়। অস্ট্রেলিয়ার স্টিভেন স্মিথ, দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স, ইংল্যান্ডের জো রুট, ভারতের বিরাট কোহেলি, নিউজিল্যান্ডের কেইন উইলিয়ামসন নিয়মিত ভাল নৈপুণ্য দেখাচ্ছেন। নিজেদেরকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যেকেই সবসময় লাইম লাইটে থাকেন। কিন্তু এমন একজন ক্রিকেটার আছেন যিনি আড়ালে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু দলে তার অবদান কারো থেকে কোন অংশে কম নয়। আড়ম্বরতা যাকে কখনো গ্রাস করতে পারেনি। সবসময় আড়ালেই থেকে গেছেন। একের পর এক সব রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। তারপরও কখনো উচ্চবাচ্য করেননি। আরো ভালো করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। নিশ্চয় এতক্ষনে বুঝে গেছেন ক্রিকেটারটি কে? হা ঠিকই ধরতে পেরেছেন। আমি ক্রিকেটের সমার্থক শব্দ মি. হাশিম আমলার কথাই বলছি। আমি একজন নায়কের কথা বলছি, আমি একজন কিংবদন্তীর কথা বলছি, আমি বাইশ গজের কবির কথা বলছি।

কাওয়াজুলু নাটালের সেই ছোট্ট হাশিম আমলার ক্রিকেটের সমার্থক শব্দ হওয়ার পথ অতটা সোজা ছিল না। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া যেকোন খেলোয়াড়ের জন্য সবসময় পরম আকাংক্ষিত ব্যাপার। নির্বাচকের ফোন পাওয়ার পর হয়ত নিজেকে পৃথিবীর অন্যতম সুখী মানুষ মনে হয়। তাই উচ্ছ্বাসের মাত্রাও হয় বেশি। কিন্তু হাশিম আমলা এই উচ্ছ্বাসটুকু প্রকাশ করার সুযোগ পাননি। উচ্ছ্বাস প্রকাশের বদলে বরং তাকে বলতে হয়েছিল ‘সবকিছুর আগে আমি একজন দক্ষিণ আফ্রিকান। মাই ব্লাড ইজ গ্রিন।’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছিল নানা ধরনের সমালোচনা। অথচ আমলা তো বটেই, তাঁর বাবা-মায়ের জন্মও দক্ষিণ আফ্রিকাতেই। তাঁর পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন ভারতের গুজরাট থেকে। ক্যারিয়ারের শুরুতে কোটা প্লেয়ারের তকমা পাওয়ায় হাশিম আমলার একজন চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পথ মসৃণ ছিল না। পথে বিছানো ছিল কাঁটা, আমলা সেগুলোকে ফুলে পরিণত করেছেন। হাশিম আমলার টেস্ট অভিষেক হয়েছিলো ২০০৪ সালে, ভারতের বিপক্ষে ইডেন গার্ডেনের ঘুর্ণি পিচে। ক্যারিয়ারের শুরুতেই আমলা সমালোচিত হয়েছিলেন তার দুর্বল টেকনিকের কারণে। দল থেকে ছিটকে পড়ে ফিরে গিয়েছিলেন কাওয়াজুলু নাটালের দলে; তাঁর আতুঁড়ঘরে। টেকনিক শুধরে দলে ফিরলেন যখন, ক্রিকেটবিশ্ব এক অন্য হাশিম আমলাকে পেল। ক্রিকেটীয় ব্যাকরণের বাধ্য ছাত্র তিনি, ব্যাকরণ মেনে এতটা পারফেক্ট শট এই পাওয়ার ক্রিকেটের যুগে আমলা ছাড়া কে-ই বা খেলে? প্রথার বাইরে কোন শট খেলেন না, অথচ উইলোর ছোঁয়ায় বল মাঠের সব কোণেই পৌঁছে যায় অদ্ভুত সাবলীলতায়। ক্যারিবিয়ানদের মতো গায়ের জোর নেই, অজিদের মতো ক্ষিপ্রতা নেই, নেই ভারতীয়দের মত খুনে আগ্রাসন অথচ আমলা যতোক্ষন ক্রিজে থাকেন, রানের চাকা ঘুরতেই থাকে।

নভেম্বর ২০০৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৮ পর্যন্ত হাশিম আমলা ২২টি টেস্টে সবুজ জার্সি গায়ে মাঠে নামেন। খুব বেশি ভালো করতে পারেননি এই সময়টায়। যেখানে মাত্র ৩৩.৯২ গড়ে সংগ্রহ করেন ১১৫৭ রান। অনেক বার তাকে বাদ দেয়ার দাবি উঠেছে দক্ষিন আফ্রিকার সংবাদ মাধ্যমে। কিন্তু তিনি দমে জাননি। বরং আরো বেশি পরিশ্রম করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। ২০০৮ সালের পর থেকে হাশিম আমলাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। হাশিম আমলার ব্যাট থেকে ছুটা শুরু করে রানের ফোয়ারা। ২০০৮ সালের মার্চ থেকে ২০১০ সালের জানুয়ারি, এই সময়ে ১৯ টেস্ট খেলা আমলা চারটি সেঞ্চুরিসহ সংগ্রহ করেন মোট ১৪৮২ রান। এ সময়ে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল ৪৯.৪০ যা পূর্বের চেয়ে ১৫.৪৮ বেশি। এই সময়টাতেই হাশিম আমলা নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে থাকেন। ফেব্রুয়ারি ২০১০ থেকে জুন ২০১২ সময়টাতে ১৮ টেস্টে ১টি ডাবল সেঞ্চুরি ও ৩টি সেঞ্চুরিতে আমলা সংগ্রহ করেন ১৬৯৩ রান।সেই সময়টাতে তাঁর ব্যাটিং গড় ৬২.৭০ যা পূর্বের চেয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৩০। জুলাই ২০১২ থেকে জুন ২০১৫ সময়টাতে আর ব্যাটিং গড় ছিল আরো ঈর্শ্বনীয়। এই সময়ে ২৩টি টেস্ট খেলে ৭০.০৯ গড়ে তিনি করেছিলেন ২৩১৩ রান যেখানে রয়েছে ১টি ত্রিপল সেঞ্চুরি, ১টি ডাবল সেঞ্চুরি ও ৭টি সেঞ্চুরি।

কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে জুলাই ২০১৫ থেকে নভেম্বর ২০১৬ সময়টাতে। এই সময়ে যেন আচেনা এক আমলাকে দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। হারিয়ে ফেলেছিলেন পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা। এ সময়টাতে ১৫টি টেস্ট খেলে ৩৪.৮৭ গড়ে করেছেন ৮০২ রান।

এরপর আবার ফিরে এসেছেন, দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করে বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি এখনো ফুরিয়ে যাননি। ক্রিকেটকে এখনো আরো অনেক কিছু দেওয়ার বাকি। শুধু টেস্টের কথা গেল। সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও তিনি কম যান না। একদিনের ক্রিকেটে হাশিম আমলার গড় ৫০+। টি-টিয়োন্টিতে ৩২+ গড়ের সাথে প্রায় ১৩০ স্টাইকরেট হাশিম আমলার সবধরনের ক্রিকেটে মানিয়ে নেওয়ার প্রমান হিসেবে যথেষ্ট ।

ওয়ানডেতে দ্রুততম সময়ে দুই, তিন, চার, পাঁচ এবং ছয় হাজার রান সংগ্রহের রেকর্ডগুলো তাঁর নামের পাশে, পেছনে ফেলেছেন ক্যারিবিয়ান গ্রেট স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস এবং সমসাময়িক বিরাট কোহেলিকে। দক্ষিন আফ্রিকার প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ট্রিপল সেঞ্চুরী করেছেন, প্রথম আফ্রিকান অধিনায়ক হিসেবে সেঞ্চুরী হাঁকিয়েছেন শ্রীলংকার বিপক্ষে। ২০১০ সালে একই পঞ্জিকাবর্ষে টেস্ট এবং ওয়ানডে দুই ঘরানার ক্রিকেটেই নামের পাশে যোগ করেছেন হাজারের অধিক করে রান। ফাফ ডু প্লেসির সাথে ২০১৫ বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে গড়া ২৪৭ রানের জুটিটা দক্ষিন আফ্রিকার হয়ে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের জুটি। আগের বছরই ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ডি ভিলিয়ার্সকে নিয়ে গড়েছিলেন ৩০৮ রানের জুটি; চতুর্থ উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে যেটি সর্বোচ্চ। এরকম আরো অনেক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। ক্রিকেটের এই কবিকে আরো বহুদিন বাইশ গজে দেখতে চাই, বাইশ গজে তার ব্যাটের আলতো ছোঁয়ায় নতুন নতুন সব মহাকাব্য রচিত হোক।

Leave a Reply