হাতুড়েসিংহে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?

বলুনতো ক্রিকেট খেলায় কোচের ভূমিকা কি? ফুটবলের মত ক্রিকেট অতটা কোচ নির্ভর না হলেও ক্রিকেটেও কোচের ভূমিকা নেহায়েত কম নয়। ক্রিকেটে একজন কোচের ভূমিকা অনেক। যিনি খেলোয়াড়দের প্রতিভাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগানোর মন্ত্র শেখাবেন। গাইড করবেন, শিক্ষা দিবেন কি করে সঠিক পথে এগিয়ে গেলে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। খেলোয়াড়দের বিশ্বাস-সামর্থ্য ও দুর্বলতা চিহ্নিত করেন কোচরা। তাদেরকে ভাল করে বুঝেন। তাদের নিয়ে কাজ করেন। কোচ জানেন খেলোয়াড়দের কিভাবে সফল হওয়ার মন্ত্র শিখাতে হয়। এছাড়া প্রতিপক্ষ নিয়ে বিশ্লেষণ করার কাজটাও কোচদেরই করতে হয়। ইতিহাস বলছে ক্রিকেটে কোচদের এর বাইরে তেমন কিছু করতে হয় না।অধিনায়ককেই ক্রিকেট দলের সর্বেসর্বা বলে মেনে নেওয়া হয়। দলের ব্যাপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে কথা বলা হয়। তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া।

এবার আসা যাক বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচ হাতুড়েসিংহের কথায়। পরিসংখ্যান বলবে, তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ইতিহাসের সফলতম কোচ। তার সময়ে দল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে,পাকিস্তানকে ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ করেছে। দক্ষিন আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজ জয়, ভারতকে দাপটের সাথে সিরিজ পরাজয়ের লজ্জা দেওয়া, এশিয়া কাপে রানার্সআপ হওয়া, ইংল্যান্ডকে টেস্ট হারের স্বাদ দেওয়া, শ্রীলংকাকে তাদের মাটিতে টেস্টে হারানো সবই হাতুড়েসিংহের সময়েই। তার ঘোর সমালোচকেরাও তার ক্রিকেটীয় প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তুলার সাহস পাবেন না। উপরে যা কিছু বলা হয়েছে তার সবকিছুই কোচের ইতিবাচক দিক। এখন চলুন বাস্তবতায় নজর দেয়া যাক।

সেই দিন দেখলাম হাতুড়েকে ক্রিকেটের হোসে মরিনহো বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হচ্ছে। হাতুড়েকে ক্রিকেটের হোসে মরিনহো বলা যায় এতে কোন আপত্তি নেই। আমার আপত্তি হল ক্রিকেটের হোসে মরিনহোকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করায়। ক্লাব ফুটবল আর জাতীয় ক্রিকেট দলকে এক সুতায় মিলানো চরম বোকামি। বেশিরভাগ ক্লাবের ক্ষেত্রেই দেখা যায় চলমান সাফল্যকে তারা প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এতে করে কোন খেলোয়াড়কে ছুড়ে ফেলতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। যেখানো চলমান সাফল্যই একমাত্র সফলতা সেখানে এইটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অনেক ক্লাবের ক্ষেত্রেই দেখা যায় ঠিক উল্টোটা যারা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নেই। জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমনিই হওয়া উচিত। ক্লাবে খেলোয়াড় ক্রাইসিস হলে নতুন খেলোয়াড় কিনে সেটা মেকআপ করা যায়। কিন্তু জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়ার সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েই সামনে এগুতে হবে যদি আপনি সফলতা পেতে চান। হাতুড়েসিংহে তাৎক্ষনিক সফলতার দিকেই মন দিয়েছেন। এতে তার লাভ দুইটা। প্রথমত, তার চাকরির নিশ্চয়তা এবং ম্যানেজমেন্টে প্রভাব বিস্তার করা সহজ। দ্বিতীয়ত, কোন কারনে এই চাকরি চলে গেলেও ভারি একটা সি.ভি. পেয়ে যাবে অন্য চাকরির জন্য। আর এক্ষেত্রে সে বিসিবিকেও পাশে পাচ্ছে। মাথামোটা বিসিবি কর্তারাও যে শর্টকাট মেথডই পছন্দ করেন। অথচ এতে করে ২০০৭ থেকে গড়ে উঠা ক্রিকেটীয় কাঠামোকে আমরা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। আপাতদৃষ্টিতে দেশের ক্রিকেট এগিয়ে যাচ্ছে মনে হলেও আমরা আমাদের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।

কোচ জাতীয় দল নির্বাচক কমিটির একজন সদস্য। কোচ নির্বাচক কমিটিতে থাকার সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি ভোগ করছি আমরা। অজি কোচ লেহম্যান এবং কিউই কোচ হেসন নির্বাচক কমিটিতে থাকলেও হাতুড়ের বিষয়টা তাদের থেকে আলাদা। তারা দুইজন সেই দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন, সেই দেষের ঘোরোয়া ক্রিকেটে কোচিং করিয়েছেন। দেশের ক্রিকেটের নাড়ি নক্ষত্র তাদের জানা। খেলোয়াড়েরাও নখদর্পনে। অথচ হাতুড়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে একদমই আনকোরা। তিনি নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘোরোয়া ক্রিকেটের একটি ম্যাচও মাঠে বসে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখেননি। নেটে বোলিং দেখে ভালো লাগলে তিনি জাতীয় দলের জন্য সেই বোলারকে সিলেক্ট করেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি তার ক্ষমতার অপব্যবহার একাদশ নির্বাচনেও করেন। অথচ ক্রিকেটের আদি যুগ থেকে চূড়ান্ত একাদশ নির্বাচনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটা অধিনায়কের জন্যই সংরক্ষিত। যুক্তিটা খুব পরিষ্কার। মাঠের পারফরম্যান্সের দায়দায়িত্ব যেহেতু অধিনায়কের, দল খারাপ করলে তাঁকেই দাঁড়াতে হয় কাঠগড়ায়—সহযোদ্ধাদের বেছে নেওয়ার ক্ষমতাও কেন তাঁর থাকবে না? সমস্যাটা এখানেই হচ্ছে। হাতুড়ে নিজেকে সর্বেসর্বা মনে করছেন। মাশরাফির চাওয়ার পরও তিনি নাসির হোসেনকে একাদশে রাখতে দেননি। আরাফাত সানি সাময়িক নিষিদ্ধ হওয়ার পর মাশরাফির চাহিদা ছিল আব্দুর রাজ্জাক। কিন্তু হাতুড়েসিংহে নিলেন লংগার ভার্সন স্পেশালিষ্ট সাকলায়েন সজীবকে। এছাড়া মিথুন, শুভাগতদেরকে একের পর এক সুযোগ দিয়ে গেছেন।
দুই আনকোরা লেগি জুবায়ের, তানভীরকে দলে নিয়ে আবার ছুড়েও ফেলেছেন।


হাতুড়েসিংহে বলেছেন তিনি তিন ধরনের ক্রিকেটে ভিন্ন দল দেখতে চান। অথচ তিনি টেস্ট থেকে বাংলাদেশের একমাত্র টেস্ট স্পেশালিষ্ট ব্যাটসম্যান মুমিনুলকে বাদ দিয়েছেন। কোচ কয়েকটা রিস্ক নিয়েছে, সেগুলো পে-অফ করেছে, এবং এটাই তাকে আরও আগ্রাসী করে তুলেছে। ইনিংস কখন ডিক্লেয়ার করা হবে এই ক্ষমতাও তিনি অধিনায়কের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন।

আজকের শচীন টেন্ডুলকার অত সহজে শচীন টেন্ডুলকার হয়নি। শচীনের পরিশ্রম, প্রতিভার প্রতি যথেষ্ট সম্মান রেখেই বলছি শচীন থেকে শচীন টেন্ডুলকার হওয়ার পিছনে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডেরও অবদান কম নয়। তারা সঠিকভাবে ব্রান্ডিং করেই আজ তাকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে। রাহুল – লক্ষনের মত টেস্ট স্পেশালিষ্ট, শেহওয়াগ- সৌরভের মত সাহসী ক্রিকেটার পেয়েও তারা শচীনের কদর ভুলে যায় নি। শচীনকে কেন্দ্র করেই তারা গেইম প্ল্যান ঠিক করত। অথচ আমাদের দেশের ক্রিকেটীয় কালচার ঠিক উল্টো। নতুন কেউ উঠে আসলেই আমরা পুরাতনের কদর ভুলে যাচ্ছি। এখান থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারলে উন্নতির এই ধারাবাহিতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। কোচের ক্ষমতা কমিয়ে অধিনায়কে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে শিকড় থেকে শিখরে যাওয়া যতটা কঠিন, তারচেয়েও বেশি কঠিন শেখরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই অবস্থান ধরে রাখার পিছনে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কোচের স্ট্র্যাটেজি। প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে হাতুড়েসিংহে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আশির্বাদ নাকি অভিশাপ?

Leave a Reply