সেই দিনের ২০ বছর পর।

১৩ই এপ্রিল ১৯৯৭ সাল এক বল এক রান দরকার। দুই ব্যাটসম্যান কথা বলে নিল। বল প্যাডে লাগতেই ভোঁ দৌড়। শুরু হলো আনন্দ দেশে ও দেশের বাইরে। সব ক্রিকেট প্রেমী বাঙালীরা নেমে গেলো রাস্তায় মিছিল করলো। কারন বাংলাদেশ দল আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেছে।

১৯৯৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ফাইনালের দল ২টি ছিলো বাংলাদেশ ও কেনিয়া। যে কেনিয়া ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ওয়েস্টইন্ডিজের মত দলকে ৭৩ রানে অলআউট করে চমক দেখিয়ে ছিলো। আর ব্যাপারটা এমন ছিলো বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলা নিশ্চিত । তবুও জেতা চাই। কিন্তু ফাইনাল ম্যাচে বৃষ্টি বাগরা দেয়ার সম্ভাবনা থাকায় ২দিনে ম্যাচ হবার ঘোষনা দেয় । আকরাম খান টসে জিতে ফিল্ডিং এর সিদ্ধান্ত নেয়। স্টিভ টিকোলার সেঞ্চুরিতে ভর করে কেনিয়া ২৪১ রান নেয়। এখনকার যুগে এটা বড় স্কোর না হলেও তখন কার বাংলাদেশ দলের জন্য এটা অনেক বড় স্কোর ছিলো। তবুও বাংলাদেশের মানুষ আশা করেছিলো তারা ম্যাচটা জিতবে।

ক্রিকেট যে বাংলাদেশেরর মানুষের কতটা জুরে আছে এটা যেনো তারই প্রতিচ্ছবি । সেদিন হয়ত অনেকেই রাতে ঘুমাতে পারেনি। বাংলাদেশ সময় সকাল ৭:৩০ মিনিটে খেলা শুরু হবার কথা । তখন তো আর ঘরে ঘরে টিভি ছিলোনা সবাই রেডিওতেই কান পেতে ছিলো। কখন খেলা শুরু হবে। কিন্তু ৭:৩০ মিনিটে রেডিও ধারাবিবরনি শোনাতে এসে খোদাবক্স মৃধা শোনালেন এক দুঃসংবাদ। মুশুলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সবাই তখন আফসোস করছে।

কিন্তু তখন মানুষের অবস্থা কেমন ছিলো তা আসলে আমার মত মানুষের বলা সম্ভব না । কারণ তখন আমার বয়স এক বছর। পরে ম্যাচ টার ভিডিও বহু বার দেখেছি কিন্তু সেই অবস্থায় ফিলিংস তো আর পাওয়া সম্ভব না। তবে বাংলাদেশের মানুষ যে কতটা ক্রিকেট প্রেমি তা যেনো তারা সেদিন প্রমাণ করে দিলো।

কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থামলেও মাঠে তখন হাটু সমান পানি। কিন্তু সেদিন যেনো অন্যকিছুরর জন্য অপেক্ষা করছিলো ক্রিকেট বিশ্ব।

মাঠকে খেলার উপযোগী করে তুলতে সেদিন খেলা দেখতে যাওয়া সকল বাঙালী মাঠে নেমে যায়। নিজেরাই পানি সরাতে থাকে যে যেভাবে পারছে। বাংলাদেশ থেকে যেদিন জানপ্রিয় অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদি ও তার স্ত্রী সুবর্ণা মুস্তফাও ছিলেন মাঠে তারও মাঠে নেমে যায় অন্য সবার মত। এমন কি বোর্ড প্রেসিডেন্ট ও মাঠ খেলার উপযোগী করতে নেমে যায়। তবু যেনো খেলা হতেই হবে। এমন দৃষ্টান্ত ক্রিকেট ইতিহাসে আর নেই। অবশেষে দুপুর ২:৩০ টায় মাঠ খেলার উপযোগী হয়ে যায়!

সেদিন এত কিছুর পর আরও চমক যেনো অপেক্ষা করছিলো বাংলাদেশেরর মানুষের জন্য। ডাক ওয়ার্থ লুইস নিয়মে টার্গেট দাড়ায় ২৫ ওভারে ১৬৬। বর্তমান যুগে যা হর হামেশাই ঘটে কিন্তু তখন ব্যাপারটা ছিলো ভিন্ন।ওভার প্রতি ৬ এর উপরে রান নিয়ে জেতা ম্যাচতো হাতে গোনার মতই ছিলো। তবু বাংলাদেশ সেটা করেছিলো। শুরুতেই নিয়মিত ওপেনার আতাহার আলীর জায়গায় নামানো হয় পিন্চ হিট করতে পারা মোহাম্মদ রফিককে। তাকে নামানোটা যে সার্থক তা তিনি প্রমান করেরেছিলেন সেদিন। করেছিলেন ২৫ রান। সেই দিন দলের অধিনায় আকরাম খান অধিনায়কের মত ৬৩ রানের একটা ইনিংস ছিলো ।

এই ম্যাচের উত্তেজনা বোঝাতে লাস্ট ওভারটা ভালোই সাহায্য করে। লাস্ট ওভারে দরকার ছিলো ১১রান। আর প্রথম বলেই ছক্কা মেরে ব্যাবধান ৫ বলে পাঁচ রানে করে নিলেন খালেদ মাসুদ পাইলট। পরের বল মিস । ব্যাবধান ৪ বলে ৫ রান। পরের বলে ওয়াইড দিলেন বোলার।ব্যাবধান হয়ে দাড়ায় ৪ বলে চার রান।। পরের বলে সিঙ্গেল। ৩বলে তখন ৩ রান দরকার। স্ট্রাইকে শান্ত। গ্যালারীর উত্তেজনা তখন রেডিও তেও শোনা যাচ্ছিলো। পরের বল মিস। ২বলে ৩ রান দরকার । পরের বলেই শান্তর জোরালো শট ২ রান আসে এ থেকে। এখন দরকার ১ বলে ১ রান। তখন মানুষের অবস্থা কেমন ছিলো অমি দেখিনি। তবে যতটুকু শুনেছি সেটা এমন “সারা বাংলাদেশ যেনো তখন থমকে যায়, সবাই যেনো পিন পতন নিরবতা পালন করছে কি হয় এই বলে ” ম্যাচ টাই হলে কেনিয়াকেই জয়ী ঘোষনা করা হবে”।

বলটা শান্তর পেডে লেগে ফাইন লেগের দিকে যেতেই দৌড়ে দুই প্রান্ত অতিক্রম করে উদযাপন শুরু করলেন দুই ব্যাটসম্যান সহ মাঠে থাকা সব বাংলাদেশী থেকে সারা বাংলাদেশ । রাস্তায় রাস্তায় বিজয় মিছিল হয়েছিলো।

এই জয়টা বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভিত গড়ে দিয়েছিলো এই জয় টা না পেলে হয়ত আমরা ১৯৯৯ এর বিশ্বকাপে পাকিস্তান কে হারাতে পারতাম না। হয়ত আমরা টেস্ট স্টেটাস পেতাম না। হয়ত আমাদের ক্রিকেট এত দূর এত দ্রুত আসত না।

১৩ ই এপ্রিল তাই বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রেমীদের জন্য বিশেষ একটা দিন। এই দিন রচিত হয়েছিলো একটি ইতিহাস। যার রচয়িতা বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ। এ ম্যাচ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট।

Leave a Reply