ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার ফর ইন্ডিয়া!

বোর্ডার- গাভাস্কার ট্রফিটা এবার তাহলে ভারতই রেখে দিচ্ছে। দুশ্চিন্তা করো না ক্যাঙারু বাহিনী। পরের বার তোমরাই ঘরে নিবে এই ট্রফি।

কি শুরু করলাম বলেন দেখি! এখনো সিরিজই শুরু হলো না, অথচ আমি এবারের ট্রফি তো ভারতের হাতে তুলে দিলামই, পরের আসরের বিজয়ীর নামও ঘোষণা করে দিলাম। রহস্য বৈকি।

১৯৯৬-৯৭ সাল থেকে শুরু হওয়া বোরডার- গাভাস্কার ট্রফি এখন পর্যন্ত চলেছে এই ক্রমে। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, অস্ট্রেলিয়া। আমার ভবিষ্যৎবাণীর রহস্য এই ধারাতেই লুকিয়ে।

আমাকে লিখতে বলা হয়েছিলো, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে, ভারত- অস্ট্রেলিয়া সিরিজে কি হতে পারে, একটু বাড়িয়ে বললে, বিশেষজ্ঞ মতামত। অথচ শুরুতেই আমি যাবতীয় উত্তেজনায় জল ঢেলে দিয়ে বললাম, ভারতই জয়ী হতে যাচ্ছে। আসলে ধারার সাথে বাস্তবতাও বলে, ভারতের জয়ী হবার আয়োজন সম্পন্নই আছে।

র‍্যাংকিং আপনাকে এর উল্টোটাই বলবে। জাদেজা মাঝে ঝামেলা না বাধালে, শিরোনাম হতো এমন, র‍্যাংকিংয়ের এক আর দুইয়ের লড়াই। দলগত র‍্যাংকিংয়ের এক নাম্বারে ভারত তো দুইয়ে অস্ট্রেলিয়া। ব্যাটিং র‍্যাংকিংয়ে স্টিভ স্মিথ, ভিরাট কোহলি, জো রুট কেন উইলিয়ামসনের মাঝে এতই মিউজিকাল চেয়ারের খেলা চলে যে কখন কে নাম্বার ওয়ান থাকেন, তা বলতে গেলে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়। এখন এই সিরিজকে র‍্যাংকিংয়ে গুরুত্ববহ করতেই কিনা স্টিভ স্মিথ সবার উপরে, তার পরে পরেই ভিরাট কোহলি। বোলিং র‍্যাংকিংটাই আসলে গোল বাধালো। অশ্বিন আর হ্যাজলউডের মাঝে বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন ভারতেরই রবীন্দ্র জাদেজা।

আপনিই বলুন, এই সিরিজ জমজমাট না হয়ে পারে! সময়ের সেরা প্লেয়াররা যখন মুখোমুখি। তবুও সিরিজ শুরুর আগে হরভজন সিং যখন বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া যদি খুব ভালো খেলে তবে ফল হবে ৩-০, অন্যথায় ৪-০ ই সই’ দ্বিমত করার লোক খুব একটা পাওয়া যায় না।

সিরিজ ভারতের মাটিতে। ভারতকে এগিয়ে রাখতে এই একটি তথ্যই যথেষ্ট। সর্বশেষ ঘরের মাঠে কবে ভারত ম্যাচ হেরেছিলো, তা মনে করার জন্য গুগল ছাড়া উপায় নেই। এই তথ্য যদি অজিদের মাঝে আতঙ্কের সঞ্চার করে, তবে এর চেয়েও ভীতি জাগানিয়া তথ্য, সর্বশেষ ১৯ টেস্টে ভারত হারতে ভুলে গেছে, তা ঘর হোক অথবা পর।

অজিরা যদিও ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করেই ভারতের বিমানে চড়েছে, তবুও এশিয়ায় সর্বশেষ ৯ ম্যাচেই পরাজয়, দারুণ লড়াইয়ের প্রত্যাশা মিয়ম্রাণ হয়েই যাচ্ছে। জয়া- সাঙ্গা বিহীন দলের কাছেই যখন হোয়াইটওয়াশ হয়েছে এই এশিয়ায়, অপ্রতিরোধ্য ভারতের কাছে তো স্রেফ উড়ে যাবার কথা তাঁদের।

টেস্ট ম্যাচ জিততে হলে কি করতে হবে? ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং বিপক্ষের চেয়ে ভালো করা লাগবে, এইতো। উপরে যা বলেছি, তার সাথে এই মৌলিক ব্যাপারগুলোও ভারতের পক্ষে যোগ করুন।

স্যার ডন ব্র‍্যাডম্যান এখন ক্রিকেট খেললে তাঁর অতিমানবীয় গড় ধরে রাখতে পারতেন নাকি কে জানে, তবে এ যুগের ব্র‍্যাডম্যান অস্ট্রেলিয়া পেয়েই গিয়েছে। ষাটের উপরে গড় নিয়ে ভারতে এসেছেন স্টিভ স্মিথ।

স্টিভ স্মিথকে ব্র‍্যাডম্যান বলায় মনে এলো, বিরাট কোহলিকে কি বলা যায় তাহলে! চাপ শব্দটাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন সেই কবেই। দলের সেরা সবকিছু মানেই যে কোহলি। সমসাময়িক সবাইকেই ছাড়িয়েছেন, এখন লড়াই নিজের সাথেই। টানা চার সিরিজে ডাবল সেঞ্চুরি, ব্র‍্যাডম্যানও পারেননি এই কীর্তি গড়তে। সেটা আরো উপরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এবারই।

ব্যাটিংকে পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ বানানো এই ব্যক্তিদ্বয়ের ব্যক্তিগত পারফরমেন্স যে সিরিজের একটি এসপার ওসপার করে দেবে, তা আমার মতো ক্রিকেট না বোঝা ব্যক্তিটিও বোঝেন।

অস্ট্রেলিয়ার এই ব্যাটিং লাইনআপে স্টিভ স্মিথ ছাড়া ভারত কাঁপানোর মতো ব্যাটসম্যান থাকতে পারেন আর একজনই, ডেভিড ওয়ার্নার, দ্যা নেইম। আমি লেখার শুরুতেই যেই ভবিষৎবাণী দিয়েছি, কাল সিরিজ শুরুর প্রথম ঘন্টায় বুমেরাং হয়ে যেতে পারে ওয়ার্নারের তান্ডবের কারণে।

তবুও বলছি, ভারতই জিতবে। ভিরাট কোহলি ছাড়াও এই দলের বাকি প্রত্যেক ব্যাটসম্যানই এমনভাবে ব্যাট চালান, টেল এন্ডার বলতে কিছুই থাকে না। ট্রিপল সেঞ্চুরির পরেও করুণ নায়ারকে বেঞ্চ গরম করতে হয়, এই তথ্য যদি এই ভারতের শক্তি বোঝাতে পারে। লোকেশ রাহুলের এক ফিফটির বিপরীতে চার সেঞ্চুরি, চেতেশ্বর পুজারা আর মুরালি বিজয়ের উইকেটে একসঙ্গে কিছুক্ষণ কাটানো মানেই সেঞ্চুরি জুটি, অফ স্পিনার হিসেবে দলে আসা রবিচন্দ্রন অশ্বিনের নিয়মিত বড় ইনিংস খেলা সবই প্রমাণ করে, ব্যাটিং তাঁদের কাছে রোজ সন্ধ্যায় পূজো দেয়ার মতোই ব্যাপার।

অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ ঠিক বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে না এই কারণে যে, ডেভিড ওয়ার্নার, স্টিভ স্মিথ আর উসমান খাজা বাদে দলের অধিকাংশ ব্যাটসম্যানের অভিজ্ঞতা ঘরের মাটিতে চার টেস্ট। অমিত সম্ভাবনা নিয়ে ভারতে আসছেন পিটার হ্যান্ডসকম্ব, ম্যাট রেনশ, নিক ম্যাডিনসনেরা, তবে কুড়ি থেকে ফুল হয়ে ফুটবেন নাকি সেটা এই সিরিজেই অনেকাংশে পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে এই সিরিজে। তার আগে যে, ভারত ব্যাটিংয়ে পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে, তা না বললেও চলছে।

বোলিং সেই পার্থক্য টানার কোনো সুযোগই দিচ্ছে না। অশ্বিন- স্টার্ক, জাদেজা- হ্যাজলউড একেবারে উত্তেজনার থালা সাজিয়ে উপস্থিত। তবুও খেলাটা ভারতের মাটিতে, আর ঘরের মাঠে অশ্বিন-জাদেজা জুটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বর্ণালী সময়ের ‘ফাস্ট ফোর’ বোলার কিংবা পাকিস্তানের ‘টু ডাব্লিউ’ জুটির মতোই ভয়ংকর কিনা, এ আলোচনাও উঠছে। নাহ, অস্ট্রেলিয়ার জন্য কোনো সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। পরিসংখ্যানে আগ্রহীদের জন্য সংযুক্তি, অশ্বিনের ২৫৪ টেস্ট উইকেটের ১৯৫ টি শিকারই ঘরের হাওয়া-জলে। তবুও, অস্ট্রেলিয়ার আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলছেন মিচেল স্টার্কের কিংবা হ্যাজলউডের বোলিং গড়, ঘরের তুলনায় পরের মাটিতেই ভালো।

সোয়া যুগ আগে, স্টিভ ওয়াহর সর্বজয়ী দল এসে হাজির হয়েছিলো উপমহাদেশে। সব ঘাট-মাঠ জয় করে এসে বাকি ছিলো এই ভারত জয় করাই। তিনি নিজেই যাকে বর্ণনা করেছিলেন, ‘ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার’ বলে। ভিভিএস লক্ষ্মনের ২৮১ রানের মহাকাব্য কিংবা রাহুল দ্রাবিড়ের চীনের প্রাচীর হয়ে ওঠার কারণে যেই অভিযান অপূর্ণই থেকে যায়।

ঘরের মাটিতে টানা নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ কিংবা তারও আগে ওয়েস্টইন্ডিজ আর শ্রীলংকাকে হারানোর পর এবারের বোর্ডার- গাভাস্কার ট্রফি ভারতীয় মিডিয়ায় পরিচিতি পেয়েছে ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার হিসেবেই। অস্ট্রেলিয়া কি পারবে, ২০০১ সালের ইন্ডিয়া হতে! স্টিভ স্মিথ আর ডেভিড ওয়ার্নার কি পারবেন, লক্ষ্মণ আর দ্রাবিড় হতে?

যদি পারেন তবে পুরোটা সময় ভারতকে জিতিয়ে যাওয়া আমার মতো ক্রিকেটপ্রেমীরাই সবচেয়ে খুশি হবেন। ‘ঘরে বাঘ, বাইরে বিড়াল’ এই টেস্ট ক্রিকেট যে চাই না।

Leave a Reply