ইন্দো-বাংলা দ্বৈরথ

উপমহাদেশীয় ক্রিকেট মানেই ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে তা এক স্পেশাল প্যাকেজ। যে প্যাকেজ আবেগ, ভালবাসা, উত্তেজনা আর লড়াই এর সংমিশ্রণে গঠিত। উপমহাদেশের বাইরে ক্রিকেটকে শুধুমাত্র প্রফেশনের চোখে দেখা হলেও এখানে এটি প্রফেশনের চাইতেও বেশি কিছু। পাক-ভারত দ্বৈরথ কিংবা পাক-বাংলা লড়াই এখানে পায় ভিন্ন মাত্রা। বিগত কয়েক দশক ধরে পাক-ভারত লড়াই ক্রিকেটমোদিদের মনে বিনোদনের খোঁড়াক জুগিয়ে আসলেও কালের পরিক্রমায় তা হারিয়েছে রঙ। ২০১২ এর এশিয়া কাপের পর থেকে মোটামুটি ইন্দো-বাংলা লড়াই দর্শক মনে জায়গা পেতে শুরু করেছে। ২০১৫ এর বিশ্বকাপের পর তা পেয়েছে ভিন্ন মোড়ক, নতুন উত্তেজনা। উপমহাদেশীয় অ্যাশেজ বললেও এটাকে ভুল হবে না।

১৯৮৮ সালের ৮ই অক্টোবর, বাংলাদেশের এম.এ আজিজ স্টেডিয়ামে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার প্রথম আন্তর্জাতিক ওডিআই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৮ সাল হতে ২০১৭ অবধি মোট ৩২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। হেড টু হেড লড়াইতে ভারতের পাল্লাই ভারি। এখন পর্যন্ত মোট ৩২ বার মুখোমুখি হয়ে ভারত জয় লাভ করেছে ২৬ বার আর বাংলাদেশ জয়ের মুখ দেখেছে ৫ বার আর একটি ম্যাচ হয় পরিত্যক্ত। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয় ২০০৪ সালে। এক অপরিণত বাংলাদেশ সেদিন ইতিহাস তৈরি করেই জিতেছিল। গোটাদেশ ভেসেছিল ম্যাচ জয়ের আনন্দে। তখন ভারত-বাংলাদেশ লড়াই এ এতোটা উত্তেজনা ছিলো না। বিশ্ব ক্রিকেটে সবে মাত্র হাটতে শেখা বাংলাদেশের কাছে তা বিশ্ব জয়ের সমতুল্য হলেও মাইটি ভারতের জন্য তা ছিলো আপসেট। এরপর ভারত বাংলাদেশকে অহরহ হারালেও বাংলাদেশকে ২য় জয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় আরও তিনটি বছর। সময়টা ২০০৭ সাল, ক্যারাবিয়ান দ্বীপে বসে বিশ্বকাপের আসর। গ্রুপ পর্বে ভারতের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। ভারতকে অল্প রানে আটকে ফেলে দুই দামাল তরুণ সেনানী তামিম ইকবাল আর মুশফিকুর রহিমের দৃঢ়তায় ভর করে ভারতের বিপক্ষে ২য় জয়ের দেখা পায় বাংলাদেশ। অনেকের মতে সেই থেকেই নাকি বাংলাদেশের উপরে ওঠার শুরু। অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে অনেক ম্যাচ জয়ে। বাংলাদেশের ওডিআই এর সেরা সাফল্যগুলোর মাঝে অবশ্য এটি একটি। এটা নিয়ে কোনো প্রকার দ্বিধা নেই। এরপর ৫ টি বছর কাটলেও প্রতিবেশী দেশের বিপক্ষে জয় আসেনি একটিও। ২০১২ সালে সেবার এশিয়া কাপের আসর বসে বাংলাদেশে। সবাইকে চমকে দিয়ে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ তুলে নেয় আরেকটি জয়। ভারতের দেয়া লক্ষকে টপকে যায় সহজেই। এ আসর থেকেই কেন যেনো আমরা বিশ্বাস করতে শিখি চাইলেই আমরা হারাতে পারি ভারতকে। সাকিব তামিম, মুশফিক আমাদের দিতে থাকে সেই আশা। আশা, প্রতিশ্রুতি আর পারফরমেন্সের ভেলায় ভেসে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠি আমরা। দেখা হয় আবারও বিশ্বকাপ ট্রফির তুমুল দাবিদার ভারতের সাথে। সে ম্যাচে বাংলাদেশ পরাজয় বরণ করলেও বিশ্ব ক্রিকেটের বুকে রচনা করা হয় এক কালো অধ্যায়ের। এটি নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক থাকলেও আম্পায়ারদের কিছু পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের কারণে ম্যাচ থেকে ছিটকে হেরে যায় বাংলাদেশ। ম্যাচের পক্ষপাতমূলক আচরণকে ঘিরে প্রত্যেকটি বাংলাদেশী সমর্থকের হৃদয়ে তৈরি হয় এক ক্ষতের। অবশ্য সে ক্ষত শুখানোরও উপলক্ষণ তৈরি করে বাংলাদেশ টিম। ২০১৫ সালে দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ জয় লাভ করে বাংলাদেশ। এতে বাংলাদেশীদের বিশ্বকাপ ক্ষত যেমন শুখিয়ে যায় তেমনি ভারতীয়দের সাথে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাড়তে শুরু করে দূরত্ব। সৌহার্দ ভুলে সম্পর্ক রূপ নেয় সাপ নেউলে তে। সংবাদ সম্মেলন, পেপার নিউজে এগুলো নিয়েও কম কথা হয়নি।

তবে প্রায় দুই বছর আবার ভারত বাংলাদেশ মুখোমুখি হবার উপলক্ষ ফিরে এসেছে। আজ ১৫ জুন বেলা ৩.৩০ তে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হবে দুটি দল। সংবাদ সম্মেলন, টক-শো, নিউজপেপারে চলছে দুই দলের সাবেকদের কথার লড়াই। মাঠের লড়াইকে ছাপিয়ে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এগুলোই। ম্যাচের আগেই ছড়াচ্ছে দারুণ উত্তাপ। কথা লড়াই তে ক্রিকেটাররা নিজেরা না জড়ালেও তারাও যে ম্যাচকে ঘিরে তেতে আছেন তা বোঝা যাচ্ছে তাদের ভাবভঙ্গিই দেখেই।

আজ দিন শেষে কার জয় হবে জানি না তবে ইদানীং পাক-ভারত লড়াইকে ছাপিয়ে মাঠ ও মাঠের বাইরে ইন্দো-বাংলা লড়াই যে বর্তমানে আগুনসম অকথিত যুদ্ধে পরিণত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্রিকেটার থেকে দর্শক কেউ কাউকে দিতে চাই না একবিন্দু ছাড়। ফেসবুক থেকে টুইটার, নিউজপেপার থেকে টিভি টক-শো সবই আজ কাঁপছে ইন্দো-বাংলা লড়াইকে ঘিরে। যেই জিতুক না কেনো আজ পৌছে যাবে সরাসরি ফাইনালে। আজ আবারও এক দারুণ বাংলাদেশ-ভারত দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায় পুরো ক্রিকেট বিশ্ব।

Leave a Reply