দাদা,বড্ড লেগেছে!

ঘটনাটা বেশি দিন আগের নয়। গত মার্চে অনুষ্ঠিত টি২০ বিশ্বকাপের। আইসিসির মস্তিষ্কজাত ১ম পর্ব নামের আড়ালে বাছাইপর্ব অতিক্রম করে বাংলাদেশ সুপার টেনে। ১ম পর্বের খেলা ছিলো বরফে ঢাকা ধর্মশালায়, বাংলাদেশ থেকে যোজন যোজন দূরে।সাপোর্ট তাই তেমন আশা করেননি কেউ। তবুও যে কয়জন দর্শক ছিলেন মাঠে, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বলেই গলা ফাটিয়েছেন।

সুপার টেন পর্ব মোটামুটি স্বস্তির বাতাস নিয়েই আসে আমাদের প্লেয়ার, দর্শক তথা ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদদের মাঝে। যার কারণ ১ম পর্বের বৈতরণী পার হওয়ার চেয়েও বেশি ছিলো সুপার টেনের ভেন্যু। খেলাটা যে আমাদের বাড়ির উঠোন কলকাতায়।

সেই কলকাতা, দেশভাগের পর হৃত্বিক ঘটক বাংলাদেশ ছেড়ে যেখানে যাওয়ার পর বলেন, ‘দেশটারেই আলাদা করতে পারিছো,মনটা না।’

মন তো আত্মিক বিষয়, বাহ্যিক বিষয়ও কি আলাদা? মুখের বুলিটাই যে এক। বাঙলা আর বাঙালি তো আমরাই।

তাই সেই আমাদের আরেক বাড়িতে খেলা গড়ালে আমরা আশা করতেই পারি, স্লোগান উঠবে,জয় বাংলা। জয় সাকিব, তামিম, মাশরাফি। কলকাতা কিছুতেই বুঝতে দিবে না,মাশরাফিরা মিরপুরে নেই।

আশাটা আরো বেড়ে গিয়েছিলো প্রতিপক্ষ দেখে। ইন্ডিয়ানদের যদি বলা হয়, কি অপছন্দ করো? একেকজনের একেক উত্তর আসবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রথম অপছন্দ আমিই বলে দিতে পারি, পাকিস্তান।

পাকিস্তানের সাথেই খেলা গড়ানোর পর যথারীতি স্লোগান উঠলো। আশ্চর্যজনক ভাবে শুনলাম, ভাষাটা বাংলা নয়। অবিশ্বাস্য ভাবে শুনেছিলাম, জিতেগা ভাই জিতেগা, পাকিস্তান জিতেগা। যা শুনে আপাত শক্ত মানুষ বলে পরিচিত সাকিব আল হাসান বলেন, কিঞ্চিৎ অবাক তো অবশ্যই।

ম্যাচের পর কলকাতারই জনপ্রিয় অভিনেতা পরমব্রত চ্যাটার্জী স্ট্যাটাস দিলেন, বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ দেখতে বসলেই মনে হয়, দুই বাঙলার মানুষ এত ঘৃণা পায় কোথায়?

আসলেই তো,এত ঘৃণা কেন? আমরা তো একই সত্ত্বা,বাঙালি। শুধুমাত্র এক বাঙালি প্লেয়ার খেলার কারণে এক দেশের মানুষ আরেক দেশকে সাপোর্ট করছে, এই দৃশ্য দেখেছিলো বিশ্ব। সেই বাঙালিদের কিভাবে দূরে ঠেলে দেই! সেই প্লেয়ারের কথা মনে করে হলেও। আদর করে সেই প্লেয়ারের নামও দিয়েছিলো কলকাতা, দাদা। আমরাও কম যাই না, তাকে দাদাই বলি। আমাদের দাদা।

কিন্তু দাদা,ভালোবাসাটা কি একপাক্ষিক হতে পারে? আমরা ভালোবেসেই যাবো,আপনারা ব্যাথা দিয়েই যাবেন, কেমন কথা এটা?

আঘাত নাকি যত কাছের মানুষ দেয়, ব্যাথার তীব্রতা বাড়ে। বীরেন্দর শেবাগ যখন বলে,বাংলাদেশ অর্ডিনারি ক্রিকেট টিম, ২০ উইকেট নিতে পারে না। কষ্ট পাই, প্রতিবাদও করি। জিওফ বয়কট ,চ্যাপেল যখন বলেন,বাংলাদেশের টেস্ট খেলার সামর্থ্য নেই।কষ্ট তো পাই-ই না,বরং প্রতিবাদের ভাষা আরও কড়া হয়। কিন্তু কথাটা যখন আমার দাদা বলেন?

যখন আমার দাদা বলেন, বাংলাদেশ যদি ইন্ডিয়ার সাথে মিরপুরের সেইম পিচে খেলতো, ১০০ রান করাই দূরহ হতো, কথাটা শুনে কষ্ট এত পরিমাণে পাই, প্রতিবাদের ভাষা আর জানা থাকে না।

দাদা যখন বলেছেন, কথা মেনেই নিবো। প্রতিবাদ করবো না। আসলে মেনে নিতেই হচ্ছে। আমাদের পারফরমেন্স যে ততটা ভালো নয় টেস্টে। তাই এখন যেই কথাগুলো বলবো, প্রতিবাদ না, ছোট ভাই হিসেবে আক্ষেপ থেকেই বলবো দাদা।

আমার স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে, গত বছরের কথা। আইসিসি আপনাদের নাগপুরের পিচকে ‘বাজে’,’জঘন্য’ বলে আখ্যা দেয়।আমাদের পিচটা কি তার চেয়েও বাজে ছিলো? অন্তত ইংলিশ ক্যাপ্টেন আপনাকে হতাশ করবেন। তিনি যে বলেছেন,’কিউরেটর ভালো পিচ বানিয়েছিলেন। ৫ দিন উইকেট একই রকম ছিলো।’

মিরপুরের পিচ খারাপ ছিলো মেনেই বলি কিন্তু সেই পিচেই যে একজন ব্যাটসম্যান শতক হাঁকিয়েছেন, স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন তিন বাঁহাতি। দেখেছিলেন কি?

নাগপুরের উইকেটকে আইসিসির বাজে বলার কারণ, উইকেটে সাপের মতো বাঁক। হয়তোবা তখন আপনারাই বলেছিলেন, ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ায় গেলে তো আর আমাদের কথা ভেবে তারা স্পিনিং ট্র‍্যাক বানায় না, সিমিং উইকেট বানায়। আমরা বানালেই বাজে?

কথাটা দাদা,আমরা বলি এখন? হোম এডভান্টেজ তো এটাই,তাই না?

হ্যা দাদা। আপনি আবারো বলবেন, এডভান্টেজ নিতে যেয়ে তুমি ক্রিকেটের শুদ্ধতা নষ্ট করছো। তোমাকে টেস্ট স্ট্যাটাস দেওয়াটাই ভুল হয়েছে। আমার তখন কিছু বলার নেই। কেবল মনে পড়ছে, আপনার ক্যাপ্টেন্সির সময়, কিছু টেস্টে ভারতের একমাত্র পেসার ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি। হ্যা দাদা,আপনার নামই বলছি। কিছু বল করে বলটা দিয়ে দিতেন হরভজনের কাছে, যা উইকেট নিয়ে আয়। লেলিয়ে দিতেন বললে কি রাগ করবেন?

হয়তোবা দাদা আপনি ভারতের স্পিনারদের কোয়ালিটি বুঝাতেও একথা বলতে পারেন। আপনার দলে টেস্ট ক্রিকেটের দ্রুততম ২০০ উইকেট দখলকারী বোলার। আপনি সে কথা বলতেই পারেন। কিন্তু দাদা,ইংলিশ স্পিনার মইন আলী বা আদিল রাশিদ ইংল্যান্ডের উইকেটে বল করে ইনিংসে ৫ উইকেট বা ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়েছে। সিমিং কন্ডিশনে এই বোলিং ফিগার কি একজন স্পিনারের মান বোঝাতে যথেষ্ট নয়? হয়তো আপনার দেশের স্পিনারের মতো নয়, কিন্তু একেবারেই কি ফেলনা?

আপনারা এখন টেস্টে নাম্বার ওয়ান টিম। অনেক ম্যাচ জিতেছেন। কিন্তু আপনাদের ঘরের মাঠে কয়টা ম্যাচে প্রতিপক্ষ গত বছর দুয়েকের মাঝে নাজেহাল হয় নাই, বলবেন কি? উইকেট তো চাহিদামতই বানিয়েছিলেন তাহলে।

১৯৩২ সাল থেকে টেস্ট খেলেন আপনারা, আর মাত্রই ১৬ পেরিয়ে ১৭তম বর্ষে পা রাখলাম আমরা। স্পিন দিয়ে যদি আপনারাই ঘায়েল করেন, আমরা তো মাইনফিল্ড পুঁতে রাখতেই পারি।

জ্যারর্ড কিম্বার কিছুদিন আগে বলেছিলেন, যেই দিন বাংলাদেশকে স্লেজিং করতে সবাই চেষ্টা করবে, ভয় ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে, ভাববা তোমরা বড় দল হয়ে গেছো। জিওফ বয়কট, ইয়ান চ্যাপেল, রমিজ রাজা হয়তো আমাদের বড় দল প্রমাণের জন্যই এত সব করছেন। কিন্তু সবাই যদি আমাদের প্রমাণের জন্য লেগে যায়, অনুপ্রেরণা আসবে কোত্থেকে দাদা?

আমরা তো আপনাকে সেই মহিরূহ হিসেবে কল্পনা করি, যে পাড়ায় কারো সাথে ঝগড়া বাধালে আমাকে আগলে দাঁড়ায়, কিন্তু ঘরে আসলে ঠিকই শাসায়। বাহিরেই আমাকে শাসন করবে, এটা তো আমি চাই না।

কষ্ট পাওয়াটাই কি স্বাভাবিক নয় দাদা?

বড্ড লাগালেন দাদা।

 

Leave a Reply