আমি নায়কের গল্প বলছি

আমাদের চলচ্চিত্র জগৎ নাকি এক ক্রান্তিকাল পার করছে! ভালো মৌলিক কোন গল্প নেই, নেই অভিনয় দক্ষতা , ভালো কারুকাজ নেই, এরকম আরো কত অভিযোগ যে চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের! চলচ্চিত্রে নাকি নায়ক সংকটও প্রখর। পার্শ্ববর্তী দেশে যখন শাহরুখ খান, আমির বা সালমান খানকে নিয়ে সে দেশের জনগণের মাতামাতি দেখি, সাধারণ আমজনতা হিসেবে আমার-আপনার আফসোস হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইশ! আমরাও যদি তেমন কোনো সিনেমা বানাতাম!!! আমদেরও যদি একটা স্বপ্নের নায়ক থাকতো!!!

স্যরি, ভুল বললাম। সিনেমা তো আমরাও দেখি। দেখি মানে কি, মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে থাকি দেখার জন্য। সিনেমার প্রতি পরতে পরতে যে ড্রামা, সাসপেন্স, থ্রিলার আর রোমান্সের হাতছানি! পার্থক্য হলো, সিনেমাটা আমরা পর্দায় দেখি না। দেখি বাস্তব জীবনে।

আমাদের মুগ্ধতা সিনেমা নিয়ে বললেও আবার ভুল হবে। সিনেমার নায়ককে নিয়েই আমাদের যাবতীয় মুগ্ধতা। আর তাকে দেখার জন্যই আমাদের সিনেমাটা দেখা লাগে। নায়ক তো আমাদেরও আছে। শুধু অভিনয়টা বাস্তব জীবনের পর্দায় করেন আরকি! আসলে নায়কে আমরা এতটাই মুগ্ধ, গত দেড় দশক ধরে হলে কেবল একটা সিনেমাই অবিরাম চলছে। শত বাধাতেও যার বিরাম নেই, দেশকে গর্বিত করতে ক্লান্তি নেই।

নায়কের নাম ‘মাশরাফি’। আমাদের সিনেমার নামও!

নায়ক হতে কি লাগে???? নিখুঁত বাচনভঙ্গি, অ্যাকশন, রমণীমোহন চেহারা, অভিনয়। আমাদের নায়কের বিবরণ দিতে গেলে শুধু এসবই যথেষ্ট নয় যে!!!

ধুমকেতুর মত আবির্ভাব,কথাটা কেবল আমাদের নায়কের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। খুলনার স্থানীয় ক্রিকেট লিগে ঝড় তোলা যদি সিনেমা তৈরির ঘোষণা হয়, তাহলে বলতেই হচ্ছে ট্রেলারের ১ম দর্শন অ্যান্ডি রবার্টস নামের এক জহুরির চোখে। যা দেখে তিনি বলেই দিলেন, এই নায়কই সিনেমা চালাবে আগামী দিনে। তার কথা বিসিবি নামক চলচ্চিত্র সংস্থার এতটাই মনে ধরলো যে ১ম শ্রেণির ক্রিকেট সহ অন্য গানগুলো মুক্তির আগেই চলচ্চিত্র হলে।

এত আশা যার উপর, সেই সিনেমাটা কেমন?? জিম্বাবুয়ে নামক ভিলেন গ্যাঙয়ের ৪ জনকে শুরুতেই গুড়িয়ে দিয়ে জানান দিলেন, বাঁচাতেই এসেছেন তিনি। গ্র‍্যান্ট ফ্লাওয়ার নামক গ্যাঙ লিডারই তার ১ম শিকার। পুরো চলচ্চিত্র শিল্পের মাঝে আশার সঞ্চার। একজন নায়ক তো পাওয়া গেলো, অবশেষে!

যখনই তার মাঝে অক্সিজেন খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা, তখনই ইঞ্জুরি নামক পাইরেসির আঘাত। যেই পাইরেসি তাকে পুরো সিনেমা জুড়েই জ্বালিয়ে মেরেছে।

উড়ার শুরুতেই আঘাত আসলে নতুন উঠে আসা নায়কের দমে যাওয়াই স্বাভাবিক। আর শত্রু যদি ঘরে থাকে, তাহলে তো কিছু করার আশাই থাকে না। ট্রেভর চ্যাপেল নামক ঘরের শত্রু বিভীষণের জন্যই তো নায়ক তার সামর্থ্যের পুরোটা প্রদানে ব্যর্থ। জোর করে লড়াই চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন নায়ক শুধু তার জন্যই।

পাইরেসির কবলে পরলে সিনেমার মার খাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বেশির ভাগ বোদ্ধা তাই বলেই দিয়েছিলেন, এই সিনেমাও শেষ।

তারা তো আর জানতেন না, নায়ক আমাদের কি জিনিস। ৫ বছর বয়সে ৩ তলা ছাদ থেকে পড়ার পরও বেঁচে যাওয়াটা যার কেবলই একটা উদাহরণ। নায়ক আবারো উঠে দাঁড়ালেন। হয়তো আগের চেয়েও বেশি চোখ টানতে।

ইংলিশরা এবার টের পেলো তার ঝাঁজ। যা দেখে নাসের হুসেইন বলে বসলেন, ওকে কাউন্টিতে পাঠাও। আমি দেখবো বাকিটুকু। পুরষ্কার আনবে সিউর।

কিন্তু বলেছিলাম না, চোট নামক পাইরেসির কথা। আক্ষেপে পোড়ালো তাকে আবারও। ১৪ মাস ব্যবসা বন্ধ।

ফিরলেন আবারো। ভারত তার বিষে নাকাল। যার দরুণ ভারতকে হারানোর তৃপ্তি পেলো আমাদের গ্যাঙ।

পাইরেসির লীলাখেলা চলেছে চলচ্চিত্র মুক্তি প্রাপ্তির দিন থেকে আজ পর্যন্ত। এরই মাঝে দিয়েছেন, কার্ডিফের সাফল্য। ইংলিশ মাটি জয়ের সাফল্য। নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে হারানোর পরদিন তার পারফরমেন্স ছিলো ৯.৩-২-৩৮-৪। নিউজিল্যান্ড জয় তার সৌজন্যেই।

নায়করা তো সিনেমায় নেতৃত্বই দেন। আমাদের নায়ক পুরো একটা দেশকে টেনেছেন।  কখন??? টানা ১০ ম্যাচ হারার পর। আর এমনভাবে টেনেছেন, সেই ১০ ম্যাচ হারার পর দেড় বছরে আর কোনো লড়াই হারেনি তাঁর দেশ। নায়কেরাই তো এটা পারেন। বিরুদ্ধ কন্ডিশন জয়ের মন্ত্র শিখিয়েছিলেন দলের বাকি সবাইকে। নায়ক তো এমনই।

সিনেমা তো কেবলই লড়াই না। রোমান্সও মিশে আছে এখানে। ভাঙা পায়ে বউয়ের জন্য মোটরসাইকেল চালানোটকে আমি অবশ্য রোমান্টিসিজম না বলে পাগলামিই বলবো।

এমন পাগলামি এটাই প্রথম না। তাইতো তার এক গুরু তাকে নামই দিয়ে দিয়েছেন, পাগলা। দলকে সুখী করতে যার জুড়ি মেলা ভার।

আর সব সিনেমাই নাকি কিছু না কিছু শিক্ষা দেয়। আমাদের নায়ক তাই মাঝে মাঝেই বলে বসেন,”যদি সব লোক রাস্তায় একদিন ময়লা ফেলা বন্ধ করতো, নিয়ম মানতো, দেশ বদলে যেত” ধরনের কথা-বার্তা।

সবই তো পেয়ে গেলেন সিনেমার উপাদান। বলেছিলাম না, আমরা প্রতিনিয়ত একটা সিনেমা দেখে চলেছি।

অভিনয় দক্ষতা খুঁজে পেলেন না?? ইঞ্জুরির নিয়ে ১৫ বছর লড়াই, আপনি কিন্তু বুঝেন না তা লড়াইয়ের সময়। কেনো জানেন??? ওই নিঁখুত অভিনয়টার জন্যই।

এ তো গেলো সিনেমার কাহিনি। সিনেমার বাইরেও যে কিছু গল্প আছে।

নায়কেরা এমন কিছু করেন, যা দেখে তার ভক্তরা কপি করায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কলার উঁচু করে রাস্তায় চলে নি, এই প্রজন্মের এমন কোনো ছেলে বোধহয় পাওয়া যাবে না। স্টাইলটা আমাদের নায়কেরই সৃষ্টি।

নায়কদের রমণীমোহন হতে হয়। আশ্চর্যজনক বলতে হচ্ছে, উনার নারীভক্ত আর পুরুষভক্তের সংখ্যা সমান। হয়তোবা কিঞ্চিৎ বেশিই। নায়কের তো ভক্তই থাকে।

হয়তো কোনো নায়কের ফ্যানকে বলতে শুনা যায়, আমি তার মতো হতে চাই। ফ্যানের বাবা-মা তাতে হয়তো বেঁকে বসেন। এক্ষেত্রে উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম। সব বাবা-মা যেন প্রার্থনাই করেন, তার সন্তান যেন মাশরাফি হয়। মানুষ মাশরাফি হওয়া আর হিমালয় জয় করার মাঝে যে আমি কোনো তফাৎ দেখি না।

কেন??? মানুষ মাশরাফি কি জিনিস???

একটা উদাহরণ দিই, ২০১৪ সালে শ্রীলংকার সাথে মুশফিক চোটে পড়েন, নিয়ম মতো ক্যাপ্টেন্সি পাওয়ার কথা সহ-অধিনায়ক তামিম ইকবালের। কিন্তু বিসিবি(পড়ুন পাপন সাহেব) দায়িত্ব দিলো মাশরাফিকে। যত ভালো মানুষই হন, তামিমের ক্ষোভ থাকারই কথা।কিন্তু টিমের সবাইকে জিজ্ঞাসা করলে হয়তো দেখা যাবে, মাশরাফির সবচেয়ে বড় ভক্ত ওই তামিম ইকবালই। কারণটা মানুষ মাশরাফিই।

আরো জানতে চান তাঁর সম্পর্কে??? ছোটবেলায় ইসলাম শিক্ষা বইতে আখলাকে হামীদাহ পড়েছিলেন??? সব উত্তম গুনাবলি??? সেগুলোই বসিয়ে দিন। একটা মাশরাফিকেই পাবেন তার ভেতর।

তাই বলে ভাববেন না, আমাদের নায়কের কোনো দোষ নেই। তিনি বড্ড অসামাজিক। সেলফি তুলা, ফেসবুকে তা পোস্ট করা এসবে তার খুব বিরক্তি। ভক্তদের জড়ায় ধরতেই তিনি ভালোবাসেন। অসামাজিক না তো কি????

আর এটাই আমাদের নায়কের গল্প। সাধারণের মাঝে যিনি অসাধারণ। অন্যতমের মাঝে শ্রেষ্ঠ।

আর নায়কের এই শ্রেষ্ঠ গল্পটার সূচনা আজ থেকে ঠিক দেড় দশক আগে, ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর। যিনি কেবলই একজন নায়ক নন, একটা জাতির অনুপ্রেরণা। স্বপ্নের সারথি।

Leave a Reply