মাশরাফি বিন মর্তুজা একটি আবেগের নাম

মাশরাফি বিন মর্তুজা নামটার অর্থ কি?
হবে কিছু একটা! আরেকজনের নামের অর্থ দিয়া করবো কি আমি!

মাশরাফি বিন মর্তুজা কে?
আমমম… একজন পেস বোলার, একজন সফল অধিনায়ক? আর কিছু তো মাথায় আসে না!

শেষের দুই লাইন কোনদিনও কোন বাঙালি ক্রিকেট সমর্থক এর মনেও আসে না, মুখে দূরে থাক।

কারণ?

তিনি মাশরাফি বিন মর্তুজা, তিনি ম্যাশ, তিনি গুরু।

এখন কেউ হয়ত আমায় একটা ক্রিকেট বিজ্ঞানী মার্কা প্রশ্ন ছুড়ে মারবেন? কি আছে এই মাশরাফির? ১৫০+ কি.মি. গতি? ধুর নাই।

ভয়ংকর সুইং? কাটার টাটার করে মাঝে মধ্যে, পেস ই নাই, সুইং আসবো কই থেইকা, ওই সুইং তো বিষদাঁত ছাড়া সাপ।

এইবার আমাকে এই ক্রিকেট মহাজ্ঞানী বড়ই ঝামেলায় ফেলবেন এই প্রশ্ন কইরা, তাইলে এত লাফানির কি দরকার? সে তো কেউ না।

তখন আমি বলবো, সবার সব কিছু লাগে না। কিছু কিছু মানুষ না থাকার মাঝেই অসাধারণ, তা ক্রিকেট হয়ত বুঝবে না, আবেগ বুঝবে।

মাশরাফি বাংলাদেশ ক্রিকেটে এসেছিলেন ভয়ংকর এক গতিদানব হিসেবে। ভারতে গিয়েছিলেন ১৭ বছর বয়সে, মরা উইকেটে ব্যাটসম্যানকে বারবার বিট করেছেন, বারবার ব্যাকফুটে নিয়ে গিয়ে কাপিয়ে দিয়েছেন।
তারপর আন্তর্জাতিক অভিষেকে নিজেকে চেনালেন গ্রান্ট ফ্লাওয়ারকে তুলে নিয়ে। বাংলাদেশ স্বস্তি পেলো, অবশেষে সত্যিই পেসার পেলো বাংলাদেশ!

পরের ১৩টি বছর হতাশা আর আনন্দের অতি আক্ষেপ মেশানো গল্প। বারবার ইঞ্জুরিতে পড়েছেন, ফিরেছেন, আনন্দোল্লাস করেছেন, করিয়েছেন, কেঁদেছেন, কাঁদিয়েছেন। ২০০৫ ভারত বধ অথবা ২০০৭ এ ভারতকে ছিটকে দেওয়া, ২০০১ সালের হাটু অথবা ২০১১ সালের  গোড়ালি ইনজুরি, মাশরাফি আমাদের চোখে জল বহুবার এনেছেন।

আমি মাশরাফিকে কোনদিনও ক্রিকেটার হিসেবে দেখিনি। জাদুকর হিসেবে দেখেছি। নাহলে বলুন তো, ২০১৪ সালে আফগানিস্তানের কাছে গো হারা দল কিভাবে পাকিস্তান, ভার‍ত, দক্ষিণ আফ্রিকাকে দুমড়ে মুচড়ে দেয়? আর কিভাবেই তারা বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডকে ছিটকে দেয়? বিশ্বাস হয়? হওয়ার কথা না। কিন্তু করতে হয়। জাদু দেখা যায় না, কিন্তু জাদু অনুভব করা যায়, একজন জাদুকরের জাদুর মধ্যে দিয়ে!

আজকের মুস্তাফিজ, তাসকিন, রুবেল, আল আমিনদের দেখে কতই না ভালো লাগে। এই মাশরাফি মানুষটা না থাকলে হয়ত এরা ব্যাগ কাধে ভার্সিটিতে যেত, কিট ব্যাগ নিয়ে মিরপুর স্টেডিয়ামে ঢোকার বদলে!

মানুষ মাশরাফিকে কি বলবেন আপনি? মহামানব? বলাই যায়। ১২টি ইঞ্জুরি, ৭টি অপারেশন, প্রায় পঙ্গু অবস্থায় যখন দৌড়ে যান বল করতে তখন তাকে কি বলবেন? রোমান গ্ল্যাডিয়েটররাও হয়ত এই মাশরাফিকে স্যালুট করতো। ঘুম থেকে উঠে পা বাকাতে প্রায় আধা ঘন্টা লাগে, অবসর নিলে হয়ত পঙ্গুই হয়ে যাবেন। তবুও ব্যাথা নিয়ে খেলতে নামেন, লুকিয়ে পেইনকিলার খেয়ে।

তবুও মাশরাফি খেলে যান।

দল হারলে একা একা বসে কাঁদেন, কাউকে বলেন না। পুরো দলের বড় ভাই, এই রাগ করছেন তো আবার এসে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করছেন।

তিনি বন্ধুর মৃত্যু সংবাদে কেঁদে রাত কাটাতে পারেন, সেই কান্নার ঘোর নিয়ে মাঠে নেমে মহাপ্রতাপশালী এল সাম্রাজ্যকে ধুলিস্মাৎ করে দিতে পারেন।

আপনি তাকে কি বলবেন? বলার কি কিছু আছে?

নাহ নেই।

মাশরাফি কি জানতে চান?

আফগানিস্তান এর সাথে তৃতীয় ওয়ানডেতে যখন পড়ে গেলেন বল করতে গিয়ে, এক সাথে মিরপুর স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে পুরো বাংলাদেশ থমকে গিয়েছিলো, সবার মনে একটিই প্রার্থনা, “খোদা, মাশরাফির যেন কিছু না হয়”। আর কিছু বলা লাগবে কি?

মাঠের মধ্যে তার ফ্যান ঢুকে পড়ায় যেভাবে নিরাপত্তা রক্ষীদের কাছে থেকে তাকে রক্ষা করেন, তা একমাত্র মাশরাফিই পারেন।

শুরুতে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, মাশরাফি বিন মর্তুজা নামের অর্থ কি?

জানি না আমি। দরকারও নেই।

কারণ আমি জানি, মাশরাফি মানে তিনি, যিনি মাথা নোয়াবেন না, যিনি পড়ে গিয়ে আবার উঠবেন, এক সাথে সবাইকে হাসাবেন, সবাইকে কাদাবেন। তিনি সেই ব্যাক্তি যার প্রতিটা ব্যাথায় বাঙালি ব্যথা পায়, যার জন্য আমি আমার হাটু জোড়া খুলে দিতে রাজি আছি।

আমি জানি মাশরাফি মানে মাশরাফি, আর কিছু জানার কি বড় দরকার?

শুভ জন্মদিন গুরু, বাংলার ইতিহাসে অনেকেই আসবেন, আরেকজন মাশরাফি বিন মর্তুজা আসবেন না!

আফসোসটা পরের প্রজন্মের জন্য তোলা থাকুক, আমি নাহয় ইশ্বরকে ধন্যবাদই জানাই!

Leave a Reply