ওডিআই ক্রিকেট ও বাংলাদেশের সাফল্যের অলিগলি

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাস সময়ের সাথে ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধশালী। এদেশের ক্রিকেট ইতিহাস মাত্র ৩৩ বছরের ইতিহাস। সংখ্যার হিসেবে কম দেখালেও আজ এই ২০১৭ এর বাংলাদেশ হতে পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠখড়। লিকলিক করে বেড়ে উঠেছে এদেশের ক্রিকেট অবকাঠামো।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ করে আসলে ১৯৭৯ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে। সেবারের টুর্ণামেন্টে চার ম্যাচের দু’টিতে তারা হেরে যায় এবং দু’টিতে জয়লাভ করে। এর ঠিক সাত বছর পর ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ এশিয়া কাপে ক্রিকেটে তারা তাদের সর্বপ্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচটি খেলে পাকিস্তানের বিপক্ষে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি জেতে এবং এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। বিশ্বকাপে তারা পাকিস্তান এবং স্কটল্যান্ডকে পরাজিত করে। ১৯৯৭ সাল থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আইসিসি ওয়ানডে খেলুড়ে দেশ হিসেবে ওয়ানডে খেলে আসছে।

সেই থেকে শুরু আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রচিত হয়েছে একগাদা সাফল্য। সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হয়েছে অসখ্য পালক। সেই ১৯৯৯ এ গ্রেট পাকিস্তান ও ২০০৪ এ ভারত বধ দিয়ে শুরু এরপর একেএকে পরাস্ত হয়েছে সব টেস্ট খেলুড়ে দেশ। ১৯৯৭ এর পাকিস্তান বধ, ২০০৪ এ ভারতের বিরুদ্ধে জয় অথবা ২০০৫ এ অজেয় অজিদের বিপক্ষে কার্ডিফের জয়, ২০০৭ বিশ্বকাপে স্পোর্টস অফ স্পেনের ভারতের বিপক্ষে সেই জয় বা ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় কিংবা সর্বশেষ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে জয়ের কথাই বলুন না কেন সবগুলোরই রয়েছে একেকরকম মাহাত্ম্য সময়ের বিচারে। আজকের সাকিব, তামিম, মাশরাফি, রিয়াদ, ফিজরা এমনি এমনি গড়ে ওঠেননি। রাতারাতি ওডিআই র‍্যাংকিং এর ৬ নং দল হয়ে ওঠেনি বাংলাদেশ ।

সেই ১৯৯৭ সাল থেকেই আইসিসির অবহেলার পাত্র হয়ে এক অসম প্রতিযোগীতার বিরুদ্ধে লড়াই করে আজ উঠে এসেছে এ পর্যায়ে। কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যাওয়া আতাহার আলী, সুজন মাহমুদ, মিনহাজুল নান্নু কিংবা রকিবুল হাসান, মেহরাব হোসেন, আকরাম খানের মতো কিছু নাম আইসিসির রেকর্ড বুকে খুজলে আপনি হয়তো পাবেন না কিন্তু তারাই মূলত বাংলাদেশকে দিয়ে যান আজকের এই বাংলাদেশ হওয়ার মূল ভিত। এরপরে হাবিবুল বাসার, আশরাফুল, রফিক, রাজ্জাক, আফতাব আহমেদদের হাতে ধরে এসেছে অনেক সাফল্য।

১৯৯৯ এ পাকিস্তান ও ২০০৪ এ ভারত বধের মাধ্যমে বড় দলকে হারানো শুরু। এরপর ২০০৫ সালে আশরাফুলের সেঞ্চুরি এর কল্যাণে অজিদের বিপক্ষে আসে বড় জয়। তারই ধারাবাহিকতায় টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে প্রথমবারেরর মতো জিম্বাবুয়ের সাথে সিরিজ জয় লাভ করে বাংলাদেশ । এছাড়া ২০০৭ এর বিশ্বকাপে এ মোস্ট ফেবারিট ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে সুপার আটে জায়গা করে নেয়। ২০০৮ এ ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ওয়েস্ট ইন্ডিজে ৩-০ ও ২০১২ তে দেশের মাটিতে ৩-২ ব্যবধানে এবং ২০১০ ও ২০১৩ সালে পরপর দুবার নিউজিল্যান্ডকে দেশের মাটিতে বাংলাওয়াশ করে সিরিজ জয় করে বাংলাদেশ। আবার ২০১২ ও ২০১৬ তে পরপর শ্রীলংকার সাথে লংকা দ্বীপে যেয়ে সিরিজ ড্র করে দেশে ফেরে টাইগাররা ।

২০১১ সালেও সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকে। ইংল্যান্ডের মতো টিমকে বিশ্বকাপের মঞ্চে হারিয়ে তাদের দেয় বিগ আপসেট। ২০১২ এশিয়া কাপের মঞ্চে ভারত, শ্রীলংকাকে পেছনে ফেলে সবাইকে অবাক করে পৌছে যায় ফাইনালে। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ জায়গা করে নেই ইতিহাসের পাতায়। ইংল্যান্ডকে পুনরায় বিশ্বকাপের স্টেজে হারিয়ে জায়গা করে নেয় কো.ফাইনালে। বিশ্বকাপ পরবর্তী ইতিহাসতো সবারই জানা। টানা পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পাই প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়। আর রিসেন্টলি ২০১৭তে সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হয় আরও একটি পালক, একটি রঙিন পালক। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিব-রিয়াদের অসাধারণ পারফরমেন্সের উপর ভর করে নিউজিল্যান্ড,অস্ট্রেলিয়ার মতো শিরোপা প্রত্যাশী দলকে পেছনে ফেলে জায়গা করে নেই চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিতে। সত্যি বলতে এটি একটি অভাবনীয় সাফল্য। যে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলতে পারায় একসময় স্বপ্ন ছিলো বাংলাদেশের আর সে টুর্নামেন্টেই দীর্ঘ ১১ বছর পর খেলতে যেয়ে সেমিতে উঠেছে আজ বাংলাদেশ।

বিগত কিছু বছর ধরে বাংলাদেশ মোটামুটি ভালই সাফল্য পাচ্ছে। তবে আজকের এই বাংলাদেশ হয়ে ওঠা কিংবা এতগুলো সাফল্য বা কীর্তিগাথা জয় রাতারাতি আসেনি। সেই ১৯৯৯ এ পাকিস্তান থেকে ২০১৭ এর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষের জয় সবই জানান দেয় বাংলাদেশের জয়গানের, সাফল্যের সূচনার। দীর্ঘদিনের ভাল খেলে আসার ফলই আজ পাচ্ছে বাংলাদেশ। ওডিআই র‍্যাংকিং এ ৬ নং এ উঠেছে। ছোট টিম থেকে আস্তে আস্তে হয়ে উঠছে ক্রিকেট বিশ্বের পরাশক্তি, মাইটি বাংলাদেশ। সেদিন হয়তো আর বেশী দূরে নাই যেদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে ট্রফি জয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে। আর হয়তো সত্যিই একদিন ইতিহাস রচনা করে সত্যিকারের বিশ্বকাপ ঘরে তুলে আনবে বাংলাদেশ। জয় আসবে এদেশের ক্রিকেটের, বাজবে সাফল্যের জয়গান। আর সেদিনটির আশায় আমাদের প্রতিটি বাঙালীর এই স্বপ্নিল বেঁচে থাকা।

Leave a Reply