এই দিনে মনে পড়ে সেই দিন

২০১৬ বিপিএল টা শেষ হয়ে গেলো। চ্যাম্পিয়ন ঢাকা ডায়নামাইটস, রানার্সআপ রাজশাহী কিংস। টুর্নামেন্ট সেরা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। পুরষ্কারটা ঘোষণার সাথে সাথেই আমার মনের স্মৃতির পাতা উল্টোনো শুরু, থামলো গিয়ে ২০১৪ তে। সেই বীভৎস ২০১৪ তে! জিম্বাবুয়ে সিরিজ শুরুর ঠিক আগে।

২০১৪ সালটা ভয়াবহ ছিলো বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য। ঘরের মাঠে ভারত পাকিস্তান শ্রীলংকা তো বটেই, হারতে হয়েছিলো আফগানিস্তান হংকং এর কাছেও। সেই ব্যর্থ বাংলাদেশ দলের অন্যতম ব্যর্থ সদস্য ছিলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। জিম্বাবুয়ে সিরিজেই দলে পালা বদলের চিন্তা ভাবনা। রিয়াদ কি থাকবেন? অনেক ভাবনা চিন্তার পর বলা হলো প্রস্তুতি ম্যাচে খেলবেন তিনি। সেই ম্যাচের পারফরমেন্স এর উপর ভিত্তি করে ঠিক করা হবে জিম্বাবুয়ে সিরিজে দলে থাকবেন নাকি মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ!

কি হয়েছিলো প্রস্তুতি ম্যাচে?

সেটা বলার আগে স্মৃতির পাতা আরেকটু উল্টে দেই। এবার ২০০৯ সালে। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের অভিষেক। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর দ্বিতীয় দলের সাথেই সিরিজ বলা যায়। টেস্ট অভিষেকেই ৫ উইকেট। ওয়ানডে অভিষেক যদিও ২০০৭ এ, শ্রীলংকার সাথে। ২০১০ পর্যন্ত দলে আসা যাওয়া। ২০১০ এশিয়া কাপে অতিমানবীয় ফিনিশিং করলেন বাংলাদেশ ইনিংসের। খেললেন ২০১১ বিশ্বকাপ, ২০১২ এশিয়া কাপ। এরপর এলো ২০১৪।

এত বাজে সময় আর কখনোই কাটাননি রিয়াদ। জিম্বাবুয়ে সিরিজের আগে ২০১৪ এর ৯ ওয়ানডে ইনিংস এ ফিফটি নেই একটিতেও, সর্বোচ্চ ৪১। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৭। জিম্বাবুয়ে সিরিজে কি থাকবেন রিয়াদ?

সেই প্রস্তুতি ম্যাচ। অনেকেই হয়ত ভেবেছিলেন রিয়াদের ক্যারিয়ারটা বোধহয় এখানেই শেষ। কিন্তু উপরে একজন যে তার দিকে তাকিয়ে হাসছেন!

বৃষ্টিতে ভেসে গেলো প্রস্তুতি ম্যাচ। অভিজ্ঞ হিসাবে নির্বাচক প্যানেল তাকে দলে রেখে দিলেন। এরপর?

রূপকথার শুরু! ১৭৯ রান করলেন। এক ম্যাচে ম্যাচ বাঁচানো ৮২ করলেন, আরেক ম্যাচে কঠিন এক ফিফটি। বল হাতে সুযোগ পাননি যথেষ্ট। তারপরও নিলেন ৩টি উইকেট।

২০১৫ অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত হলেন। সেখানে তিনি যেন জুলিয়াস সিজার! এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। প্রথন ম্যাচে আফগানিস্তান এর সাথে ২৩, পরের ম্যাচে শ্রীলংকার সাথে ২৮। পরের ম্যাচে ৬২ করে দলকে সাহায্য করলেন স্কটল্যান্ড এর ছুঁড়ে দেয়া ৩১৮ রান তাড়া করতে। তবে ক্রিকেট ইশ্বর বসে ছিলেন শেষ চমকটা দিতে!

ইংল্যান্ডের সাথে সেই বিখ্যাত জয়ে খেললেন ১০৩ রানের এক অসাধারণ ইনিংস। হয়ে গেলেন দেশের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ সেঞ্চুরিয়ান। পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের সাথেও সেঞ্চুরি, এবার একটু এর জন্য হাত ফসকে গেলো জয়। কোয়ার্টারে ভারতের কাছে হারের ম্যাচে করলেন ২১।

দেশে ফিরে পাকিস্তান এর সাথে খুব ভালো অবশ্য খেললেন না। ভারতের সাথে সিরিজটাই মিস করলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে দরকার পরেইনি বলতে গেলে। জিম্বাবুয়ে সিরিজও জিতলো বাংলাদেশ। বিপিএল ২০১৫ তে ও অসাধারণ খেললেন, বরিশাল বুলসকে নিয়ে গেলেন ফাইনালে।

২০১৬ এশিয়া কাপ টি২০ তে দুর্দান্ত ফিনিশিং করেন প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই। তাকে সেই মুহুর্তের বিশ্বের সেরা ফিনিশার হিসেবে আখ্যায়িত করেন ভারতীয় কমেন্টেটর হার্শা ভোগলে।

২০১৬ টি২০ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে সেই জেতা ম্যাচ হেরে যাওয়ায় সমালোচিত হন। নিন্দুকরা যে খারাপ দিকটা বড় বেশী দেখে!

আফগানিস্তান সিরিজ, ইংল্যান্ড সিরিজ শেষ করে বিপিএল খেললেন। দুর্বল এক খুলনা দলকে প্রায় একা হাতে সেমিফাইনাল পর্যন্ত টেনে আনলেন, যেন তিনিই গ্রীক উপাখ্যানের বীর। তবে দুর্বল দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর নায়কের জয় সর্বদা রূপকথায়ই হয়। বাস্তবটা গ্রীক ট্র‍্যাজেডির মত। তাই সেমিতেই বিদায় মাহমুদুল্লাহ এর। তবে ঠিকই তুলে নিয়েছেন সেরা খেলোয়াড় এর তকমা। ৩৯৬ রান, ১০ উইকেট আর অসাধারণ অধিনায়কত্বের জোরে।

আজ যখন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের নামটা বিপিএল এর সেরা হিসেবে পড়া হলো। স্মৃতির পাতা তাই সেই বৃষ্টিস্নাত প্রস্তুতি ম্যাচে ফিরে গেলো। দল থেকে প্রায় বাদ পড়তে গিয়ে আজ তিনি দলের অন্যতম কান্ডারী, একে রূপকথা না বলে থাকতে পারবেন? পারবেন না, চেষ্টাও করার দরকার নেই। শুধু অপেক্ষায় থাকি, রূপকথা শুনে যাবার, দেখে যাবার।

সত্যি, ইশ্বরের খেলা, বুঝা বড় দায়, বুঝার চেষ্টা না করাই শ্রেয়তর!
আমরা নাহয় রূপকথাটাই উপভোগ করলাম!

Leave a Reply