আজ তাঁর আটাশ হলো

একটি প্রেমের গল্প বলবো। যেখানে প্রেমিক বারবার প্রত্যাখ্যাত, কিন্তু ভালোবাসা অবিরত। ফিল হিউজের সাথে ক্রিকেটের প্রেমের গল্পটা এমনই।

কবিগুরুর কথাটা মনে পড়ছে খুব,’জন্মদিন মোরে নিয়ে যায় মৃত্যুদিনের কাছে’। কথাটা তিনি বলেছিলেন, একটা জন্মদিন আসা মানেই জীবনের আয়ুস্কাল থেকে একটা পাতা খসিয়ে ফেলা অর্থে। কিন্তু একজন কথাটাকে এভাবে ভাবানুবাদ থেকে আক্ষরিক অনুবাদ বানিয়ে ফেলবেন, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আর মৃত্যু যদি হয় প্রেমিকার হাতে, তবে অধিক শোকে পাথর হয়ে যেতেই হয়।

এক কলাচাষীর ছেলে ফিল। ভালোবাসতেন খেলতে, তা রাগবি হোক বা ক্রিকেট। ১২ বছর পর্যন্ত চালিয়ে গিয়েছিলেন দুটোই। হয়তো বাবার এক উপদেশমূলক কথায় জীবন নিয়ে সিরিয়াস হয়ে বাদ দিলেন রাগবিকে। ভালোবাসার গল্প শুরু হচ্ছে।

আচ্ছা, ক্রিকেটকে তো তিনি অনেক ভালোবাসতেন। সেই ক্রিকেট বিধাতা তার সাথে এমন করতে পারলেন? একবার কি মনেও পড়েনি, ক্রিকেটের জন্য তিনি কি করেছেন? রাগবির সাথে সম্পর্কছেদের পরে ক্রিকেটকে ছেড়ে যে আর তিনি একদিনও কাটাননি, সেই কথা কি ক্রিকেট বিধাতা ভুলে গিয়েছিলেন ক্ষণিকের জন্য? তিনদিন পরে তার জন্মদিন, এটা ভেবে বাঁচিয়ে রাখা যেত না আর কিছুদিন?

ক্ষণিকের জন্য বলাটা ঠিক হচ্ছে কি? বিধাতা যে তাকে বারবারই পরীক্ষার সম্মুখীন করেছিলেন। যদিও ভালোবাসার প্রমাণ দিয়ে সব বাধা পেরিয়ে তিনি প্রতিবারই ফিরছিলেন ক্রিকেটে। সংখ্যার হিসেব যদি চান,সংখ্যাটা ছয়বার।

ভালোবাসার সূচনাটা কিন্তু মধুরই ছিলো। যখন রাগবি ছেড়ে ক্রিকেটে পাকাপাকি মনোযোগ দিলেন, ভালোই লাগছিলো দুইজনকে। ‘মনিকাঞ্চন যোগ’ বাগধারাটি বলাই যায় তাদের নিয়ে। শুরুর কিছুদিন ছেলেটা নিজ গন্ডিতে থেকে তাদের সম্পর্ক চালিয়ে গেলেও বুঝেছিলেন ওকে আরো গভীরভাবে চাই আমার। তাইতো ভালোবাসার টানে চলে যান দূর সিডনিতে। সম্পর্কটাকে আরো মজবুত করতে। সেখানে যেই গুরু তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন, সেই প্রেমগুরু(পড়ুন কোচ) যদিও তার প্রেমে সফলতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, তোমার ভালোবাসা আছে ক্রিকেটের প্রতি। কিন্তু, টিকতে পারবে তো??

ছেলেটা হয়তো বলেননি, গুরু আপনি কি ভুলে গেলেন, ভালোবেসে জয় করা যায় সবকিছু। কে জানে, জবাব হয়তো সবার সামনেই দিতে চেয়েছিলেন। মেয়েকে নিয়ে লড়াইয়ের সূচনার শুরুতেই।

জবাব দিয়েছিলেনও। সবাই চেয়েচেয়ে দেখছিলেন, এক আনকোরা যুবক কিভাবে শেফিল্ড শিল্ড নামক ময়দানে লড়াই শুরুই করলেন ১৪১ রান করে। আউট তো হননি, মেয়ের অভিভাবকও মুগ্ধ হয়েছিলেন সেই ইনিংস দেখে।

অভিভাবকদের এমন মুগ্ধ তিনি বারবারই করছিলেন। ২০০৬-০৭ শেফিল্ড শিল্ড সিজনে ৭৫২ রান কিংবা পরের বছর অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ মঞ্চে লড়াইয়ে নামার মাধ্যমে। তবুও অভিভাবকরা ঠিক ভরসা পাচ্ছিলেন না একেবারে বাঘা প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করাতে। তিনিও অপেক্ষা করছিলেন। এই ভেবে সামনে আরো অনেকদিন আছে, প্রেমটা আরো গাঢ় করি।

গাঢ় মাত্রাটা বেশিই হয়ে গেলো, তাইতো অভিভাবকরা নামিয়েই দিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নামক কঠিন মাঠে। প্রথমবারের মত সেই মঞ্চে নামার উত্তেজনাতেই কি না, কোনো রান নামক ফুল অর্পণের আগেই প্যাভিলিয়নে তিনি। যদিও পরের ইনিংসেই সামলে উঠেছিলেন ৭৫ রান করে।

তবে বড় ধাক্কাটা দিলেন পরের টেস্টে। টানা দুই ইনিংসে শতকের বেশি রান। এত কম বয়সে, এই কীর্তি গড়ে ভেঙেছিলেন ১৯৬৫ সালের রেকর্ড। কীর্তিটা বিরল ছিলো, বুঝলেন তো…

অভিভাবকরাও খুশি। এই ছেলের হাতে নিশ্চিন্ত মনে মেয়ে দেয়া যায়, তা ভেবেই খুশি তারা। প্রেমটা ভালোই চলছিলো।

কিন্তু ভিলেন হাজির। শর্ট বলে নাকি তিনি দুর্বল। সেটায় বাস্তব ভিত্তি দিলেন ফ্লিনটফ। শর্ট বলে এমনই নাস্তানাবুদ, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের অভিভাবকরা তাই ভুলে গেলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার মাঠের সেই ইনিংস। নতুন ছেলের খোঁজ আবার তাদের।

তিনি কিন্তু হাল ছাড়েননি। শৈশবের প্রেম কি এত সহজেই ভোলা যায়? আবারো ফিরলেন আতুঁড়ঘরে। আবারো রান করলেন। আবারো ফিরলেন। এবার আর সন্ন্যাসী বেশে নয়। রঙিন পোশাকে। অভিষেকটাও রাঙালেন সেঞ্চুরি করে। যেই কীর্তি খুব কম অস্ট্রেলিয়ানেরই আছে।

কিন্তু প্রেমের সেই সুরটা যেন কেটে গিয়েছিলো মাঝের এই সময়টায়। তাই আবারো আরেক অজুহাতে বিচ্ছেদ। ফিরলেন কিছুদিনের মাঝেই। এই ফেরা আর বিচ্ছেদের খেলা চলেছে বেশ কিছুদিন।

একবার লর্ডস টেস্টের পর দূরে চলে গেলেন বেশ কিছুটা। পণ করেছিলেন হয়তো, আবার যদি ফিরেন, আর হারাতে দিবেন না ক্রিকেট নামক অনিন্দ্য সুন্দরীকে।

অভিভাবকরা যদিও এর মাঝে অনেকেরই পরীক্ষা নিয়েছেন। কিন্তু মনে ধরেনি কাউকেই। চিন্তা করলেন, সেই ১৭০ সে.মি ছেলেটাকে আবার টেস্ট করি। ডাক পেলেন আবার।

তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, এবার জন্মদিনটা আমার ভালোবাসার সাথেই পালন করবো। অনেক প্ল্যানও হয়তো করেছিলেন। ৩০ নভেম্বর যে তার জন্মদিন।

সব স্বপ্ন সত্যি হয় না, কথাটাকে প্রমাণ করতেই যেন তার পরের দৃশ্যগুলোর অবতারণা। গল্পকে ট্র‍্যাজিক বানাতে ক্রিকেট বলের আঘাতেই ঢলে পড়লেন ক্রিকেট মাঠে। হাসপাতালে নেওয়া হলেও তিনিই বোধহয় আর ফিরতে চাইলেন না। আমার প্রেমিকার হাতে আমার মৃত্যু, এই গর্বটা তিনি হাতছাড়া করতে চাননি তাই হয়তো।

কিন্তু কেন? তার কি মনে পড়লো না, ডেভিড ওয়ার্নারের কথা, মাইকেল ক্লার্কের কথা? বা গল্পটার নায়কদের কথা? যেই নায়কদের এতদিন পৃথিবী জেনে এসেছিলো নিষ্ঠুর হিসেবে সেই দিনটার পর তারা যেন হয়ে গেলেন উন্মাদ। ৬৩ রানের সময় ব্যাট উঠানো, পিচে ওয়ার্নারের চুমো খাওয়া, জনসম্মুখে ক্লার্কের কান্নার রোল তোলা, অফিসিয়াল স্কোরবোর্ডে পরিবর্তন আনা, এগুলো তো ছিলোই। বিশ্ব অবাক হয়ে দেখলো, ব্যাটসম্যানের বাউন্সারের আঘাত লাগলে অস্ট্রেলিয়ানরা বাঁকা হাসি দিচ্ছে না, বরং ‘আর ইউ ওকে’ বলে এগিয়ে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার দ্বাদশ প্লেয়ার একজন মৃত ব্যক্তি, বিস্ময়কর হলেও সত্য।

এত চেঞ্জ যিনি এনে দিয়েছেন, সেই মানুষটা কি এসব দেখছেন? বেঁচে থাকলে আজ তিনি এসব দেখতেন না হয়তো। তবে এসব না হলেও তিনি যদি বেঁচে থাকতেন তবেই বোধহয় বেশি ভালো লাগতো।

হয়তোবা ম্যাকসভিলের ছোট্ট কলার খামারে আজ লেখা উঠতো, হ্যাপি বার্থডে হিউজি। পাশ থেকে ক্লার্ক বলতেন, হিউজ না তো, ‘দ্যা কিড’।

ধরা ছেড়ে গিয়েছেন ২৭ নভেম্বর, অথচ তিনদিন পরই ছিলো তার বার্থডে। ৬৩ নট আউট না থেকে আউট হয়েই যদি আজ থাকতেন আমাদের মাঝে….

শুভ জন্মদিন ফিল। আপনি চিরদিন নট আউটই থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।

Leave a Reply