একজন ফিনিক্স পাখির গল্প…

রূপকথার ফিনিক্স পাখি চেনেন? মৃত্যুর সময় হলে তার গায়ে আগুন জ্বলে যেত, পুড়ে ছাই হয়ে যেতেন, আবার সেই ছাই থেকে জন্ম নিতো নতুন ফিনিক্স।

আপনি ফিনিক্স পাখি দেখেছেন? আমি দেখেছি? হ্যা, সেই ফিনিক্সটার নাম মাশরাফি বিন মর্তুজা কৌশিক, নড়াইল এক্সপ্রেস, গুরু। ইনজুরির আগুনে যিনি বারবার পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন, ফিরে এসেছেন সেই আগুনের ছাইয়ের স্তুপ থেকে।

২০০১ সালে আবির্ভাবটা গতির ঝড়ে, নিয়মিত বল করেন ১৪৫ কিমি গতিতে, আদর করে তাই নামটা নড়াইল এক্সপ্রেস দিয়ে দিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু আমাদের যে রত্ন সামলানোর বয়স হয়নি, বেশী ব্যবহারে তাই নষ্টই করে দিলাম।

সেই নিউজিল্যান্ড এ ব্যথা নিয়ে বল করা শুরু, আজও করে যাচ্ছেন। তখন অধিনায়ক খালেদ মাসুদ বলতেন, “তুই বল না করলে কে করবে?” আর এখন নিজেকেই নিজের শোনানো বুলি, “মুক্তিযোদ্ধারা গুলি খেয়েও দৌড়েছে, তুই পারবি না কেন? দৌড়া কৌশিক, দৌড়া।” তারপরও কোন এক অদ্ভুতভাবে এই মানুষটা আজও দলের সেরা বোলার, ব্রেকথ্রু লাগলে তারই ডাক পড়ে…

নড়াইল এক্সপ্রেস নামটা থেকে গেছে, ধীরে ধীরে এক্সপ্রেস গতিটা ফিকে হয়ে গেছে, লাইনে থাকাটা কিন্তু হারায়নি! লাইনে থেকে সময়মত সার্ভিস দিয়েছেন প্রতিবার, নিজেকে উজাড় করে, তার শত্রুও বলতে পারবে না কোন ম্যাচে তার ডেডিকেশন ৯৯% ছিলো, অবিশ্বাস্য ডেডিকেশন নিয়ে ম্যাচের পর ম্যাচে বলের পর বল করে গেছেন, আর একটা ইঞ্জুরি পঙ্গু করে দিতে পারে জেনেও বাঘের মত ঝাপিয়ে পড়েছেন, মাশরাফি ভাঙবেন, তবু মচকাবেন না!

২০১১ সালের জানুয়ারি মাসের ১৯ তারিখ, ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ দলে নেই মাশরাফি, কারণটা নাকি ইঞ্জুরি! মাশরাফি সেদিন কাদলেন, ফিটনেস টেস্টে উতড়ে যাওয়া মাশরাফির কান্নায় যুক্ত হলেন শত বাঙালি, কিন্তু অশ্রুজল তো আর দলে জায়গা দেয় না!

বিশ্বকাপের পর অস্ট্রেলিয়া সিরিজে প্রথম দুই ওভারে রান দিলেন ৩, উইকেট নিলেন ১টি। গতি কত ছিলো তার বলের জানেন? ১১০ এর আশেপাশে! যেই জেমি সিডন্স তথাকথিত “আনফিট” মাশরাফিকে বাদ দিলেন, তিনিই অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, “এটা মাশরাফি বলেই সম্ভব!”

অসম্ভব কথাটা যে মাশরাফির সাথে যায় না সেটা আরেকজন লোক জানেন ভালোমতই। লোকটার নাম ডেভিড ইয়াং, বাংলাদেশী ক্রিকেট ভক্ত মাত্রই জানেন, মাশরাফির এখনও বল করতে পারার পেছনে এই লোকটার অবদান কম না! সালটা খুব সম্ভবত ২০০৯, মাশরাফি আবারও ইয়াং এর চেম্বারে। তা ইয়াং প্রশ্ন করলেন, “তা এখন কি করছো?”, মাশরাফির সহজ উত্তর, “ক্রিকেট খেলছি!” ডেভিড উত্তরটা কে ফাজলামো হিসেবে নিয়েই বললেন, “মজা করছো কেন? কি করছো? চাকরি না ব্যবসা?” মাশরাফির উত্তরটা ছিলো,”মজা করবো কেন? ক্রিকেট খেলছি!” ডেভিড ইয়াং সেদিন বুঝে গিয়েছিলেন, এই মানুষটা সাধারণ না, হয়ত মানুষই নন…

৭টা অস্ত্রোপচার আর ১৪টা ইনজুরির পর কেউ ক্রিকেট খেলতে পারে সেটা এই ধরণীর কেউ ভাবতে পারেনি। এন্ড্রু ফ্লিনটফ এক অস্ত্রোপচার এর ধাক্কা সইতে পারেননি, শেন বন্ড দুইটি ইনজুরির পরই বিদায় বলে দেন। এই উদাহরণগুলো কেন দিলাম?

মাশরাফি নামের রূপকথাটার মহত্ত্ব বুঝাতে!

একবার দেবব্রত’দাই খুব সম্ভবত মাশরাফিকে প্রশ্ন করেছিলেন যে আপনার লেভেলের অনেকের সম্পদের পরিমাণ আপনার চেয়ে অনেক বেশী, আফসোস হয় না ভাবলে? মাশরাফি জানালা দিয়ে বাইরে ফুটপাতে শুয়ে থাকা পরিবারকে দেখিয়ে বলেন, আমি তো ওখানেও থাকতে পারতাম, এখানে আছি এটাই কি ভালো না? মাশরাফি নামের রূপকথাটা তাই অদ্ভুত সরল…

রূপকথার আরেকটা অধ্যায় শেষ, টি২০ থেকে অবসর নিচ্ছেন আর একটা ম্যাচ পরেই। বলছেন তিনি নাকি এই ফরম্যাটের জন্য ধীর, রুবেলের জায়গা তিনি আটকে রেখেছেন। কে বলেছে আপনাকে এই কথা? হোক আপনার অপছন্দের ফরম্যাট, তাই বলে নিজেকে কেন ছোট করবেন, এই বলে যে আপনি অযোগ্য? আপনাকে ছাড়া ২০১৮ বিশ্বকাপটা জিততে যে ভালো লাগবে না!

নাহ আর লিখবো না। মাশরাফি নামের রূপকথাটা খুব ভালো না, যত বেশী বলবেন ততই বেশী আবেগের বন্যায় ভাসবেন, দেখুন না, আমিই আর লিখতে পারছি না, কান্না আসছে…

বারবার ইনজুরির আগুন এসে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে আপনাকে, সেই ছাই থেকে বারবার জন্ম নিয়েছেন, আরেকবার জ্বলে ছাই হয়ে গেলেন বোধহয়, বোর্ড আর কোচের ইচ্ছায় হয়ত, হয়ত না, হয়তবা নিজেরই জন্য! আর কতদিন শরীরটার উপর অত্যাচার করা যায়? ওয়ানডেটা ২০১৯ পর্যন্ত খেলার জন্যই টি২০ ছাড়লেন আশা করি, আশাটা অপূর্ণ করবেন না সেই আশায় রইলাম…

বারবার ইঞ্জুরির আগুনে পুড়ে ছাই থেকে উৎপন্ন একটু একটু গতিহীন মাশরাফি নামের ফিনিক্স পাখিটা আরেকবার জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেন, ছাই থেকে ফিনিক্সরূপী নতুন বাংলাদেশ দল জন্ম নেবে, এই আশায়ই বোধহয়…

Leave a Reply