রমন লাম্বা; যিনি থাকবেন আজীবন শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায়।

২রা অক্টোবর, ১৯৮৬! তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী গিয়েছিলেন রাজঘাট মহাত্মা গান্ধীর জন্ম তিথিতে সম্মান জানানোর জন্য। মহাত্মা গান্ধী স্মরণে আয়োজিত ভজন অনুষ্ঠানে রাজীব গান্ধীর উপর আততায়ীরা গুলি বর্ষণ করে। যদিও সেই গুলি লক্ষ্যভেদ করতে পারে নি প্রধানমন্ত্রীকে। এই ঘটনার পরে ভারতের প্রভাবশালী একটি ম্যাগাজিন কার্টুন ছাপায়। যেখানে দুই পুলিশ অফিসারের মধ্যে আলাপ হয় এই রকম;
সিনিয়র পুলিশ অফিসার – ‘ তুমি বলছ, গুলির শব্দ শুনেছ! তাহলে ইনভেস্টিগেট কেন করলে না?
অধস্তন পুলিশ – ‘ আমি ভেবেছিলাম রমন লাম্বা জাস্ট ছয় মেরেছে!’

হ্যা, রমন লাম্বা এমনই ছিলেন। ৯০ দশকের শুরুর দিকের সময়টাতে ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় যে তিনিই ছিলেন। রান এর ক্ষুধা যে তার কি পরিমাণ ছিল তার ছোট্ট একটি উদাহরণ হতে পারে ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমের দুলিপ ট্রফি ফাইনাল! ফাইনাল ম্যাচে লাম্বা করেছিলেন ৩২০ রান। কিন্তু এই রান নিয়েও সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। তাই তো প্যাভিলিয়নে ফিরে এসে মেজাজ হারিয়ে গ্লাস ভাংচুর করলেন। তিনি ছিলেন ক্রিকেটের সিল্ভাস্টার স্টেলন। আশ্চর্যজনক বিষয় হল তার ডাক নামও ছিল র‍্যাম্বো।

১৯৯৪-৯৫ এ হিমাচল প্রদেশের বিপক্ষে ৩১২ রান, ৯৬-৯৭ এ পাঞ্জাবের বিপক্ষে ২৫০ রান এবং একই ম্যাচে ১৯২ এবং ১০১ রান। ৩৭ বছর বয়সে এসে এক বছরে ৭৩.৮৫ এভারেজে ১০৩৪ রান রমন লাম্বার ব্যাটিং মহাত্ম প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট।

বাংলাদেশ ক্রিকেটেও রমন লাম্বা ছিলেন অবিচ্ছেদ্দ একটি অংশ। ১৯৯০ সালে প্রথম বার বাংলাদেশ সফরে আসেন তিনি। হায়দ্রাবাদ ব্লুজ ক্রিকেট টিমের হয়ে খেলেছিলেন বিসিসিবি প্রেসিডেন্ট একাদশের বিপক্ষে। সেই সফরে দুইটি সেঞ্চুরির ইনিংস খেলে জয় করে নেন বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রেমীদের মন। যার ফলশ্রুতিতেই ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশ নেয়ার জন্য ডাক পান তিনি। নাভানা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে ময়মনসিংহ ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলতে আসেন ১৯৯৩ সালে। এর পর থেকে অবশ্য আবাহানি ক্রীড়া চক্রের নিয়মিত সদস্যে পরিণত হন তিনি।

বাংলাদেশে খেলা নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রমন লাম্বার স্ত্রি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “He adored playing in Bangladesh and the consensus opinion was that he breathed fresh air into Bangladesh cricket. He felt very appreciated and free to just relax and play without any consideration of cricket politics or restraints. Throughout his career, Raman’s passion for cricket was always very raw, focused and targeted and therefore his execution and delivery was extremely precise — he felt the Bangladeshi players and board members understood his approach and supported him wholeheartedly. When he was batting he was on a sole mission but otherwise he was a very committed team player and he was very helpful in sharing his strategic and technical knowledge with his team players.”

রমন লাম্বার বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা ছিল আমৃত্যু পর্যন্ত। নিজের জীবনটাও তিনি দিয়ে গেছেন এই দেশের ক্রিকেট এর জন্যই। ঢাকা প্রিমিয়ার লীগের এক ম্যাচে অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাতে জীবন প্রদীপ নিভে যায় রমন লাম্বার। ২০ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ চির প্রতিদ্বন্দ্বী আবাহানি এবং মোহামেডান এর মধ্যে ম্যাচ! বোলিং এর দায়িত্বে স্পিনার সাইফুল্লাহ খান আর ব্যাটিং করছেন স্ট্রাইকে মেহরাব হোসেন অপি। তিন বল পরে আবাহানির অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট লাম্বাকে শর্ট লেগে ফিন্ডিং করতে বলেন। মাত্র তিন বল বাকি থাকায় সতীর্থদের অনুরোধ সত্ত্বেও হেলম্যাট ছাড়াই শর্ট লেগে দাঁড়ান। দুর্ভাগ্য তাঁর সঙ্গী ছিল! সাইফুল্লার একটি শর্ট বল পুল করলেন অপি, আর বলটি সরাসরি আঘাত করে রমন লাম্বার কপালে।

আঘাত খুব গুরুত্বর মনে না হলেও অবশেষে এই আঘাতটাই শেষ করে দেয় রমন লাম্বার জীবন প্রদীপ। আঘাতের পর নিজে হেঁটেই ড্রেসিং রুমে ফিরে যান তিনি। ড্রেসিং রুমে অতিরিক্ত অসুস্থ বোধ করায় দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। হাসপাতালে নেয়ার পর থেকেই কোমায় চলে যান। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এর কারণে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে হেলে পড়ছিলেন তিনি। রমন লাম্বার চিকিৎসার জন্য দিল্লি থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পর্যন্ত আনা হয়! দুই দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর পরিবারের অনুমতিতে ২২ শে ফেব্রুয়ারি লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়া হয়। জীবনাবসান হয় লড়াকু সৈনিকের।

১৯ বছর আগে আজকের এই দিনেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন রমন লাম্বা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতি রমন লাম্বার ভালোবাসার কথা আমরা কখনোই ভুলব না। জীবনের অপর প্রান্তে ভালো থাকুন রমন লাম্বা। রমন লাম্বার মৃত্যু বার্ষিকীতে ক্রিকেট ম্যানিয়াক্স অফ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

Leave a Reply