তোমার চিত্রনাট্য, কে লিখে দেয়?

ইয়ান বোথাম নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরেই একবার সেঞ্চুরি করেছিলেন। তখন তাকে কে যেন জিজ্ঞাসা করেছিলো, “তোমার চিত্রনাট্য কে লিখে দেয়?”

সেই প্রশ্নটা সাকিব আল হাসান কেও করা যায়। বাংলাদেশ ক্রিকেটের বরপুত্র, বিশ্ব মানচিত্রে প্রথম দেখানো, আমরাও বিশ্বসেরা হই!

তা একটা রেকর্ডের কথা সাকিব আল হাসানও হয়ত এত এত রেকর্ডের মধ্যে সযত্নে মনে রাখেন। সেটা এক টেস্টে সেঞ্চুরি আর ১০ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডটা, যেটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে তো তিনি একাই, বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে সাথে আছে শুধু ইয়ান বোথাম আর ইমরান খানের দখলে।

রেকর্ডটা সম্পর্কে বলার আগে ফিরে যাই একটু পিছনে। ২০১৪ সালটা জঘন্য যাচ্ছিলো বাংলাদেশ দলের জন্য। একের পর এক সিরিজ হার, কাছে গিয়েও হার, এশিয়া কাপে আফগানিস্তান এর কাছে হার। ভারতের কাছে দেশের মাটিতে লজ্জাজনক বিদায়, কি ছিলো না বাকি- গ্লানি, আক্ষেপ আর হতাশা! এই সময় আরেকটা ঝড় আসলো, বোর্ডের অনুমতি না নিয়ে সিপিএল খেলতে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ৬ মাসের জন্য নিষিদ্ধ সাকিব আল হাসান। এই ঘটনার কিছুদিন আগেই শ্রীলংকা সিরিজে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির জন্য ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।

বাংলাদেশ দলটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ গেলো সাকিব আল হাসানকে ছাড়াই। হাবুডুবু খেলো, কোন কূল কিনারা না পেয়ে ধবল ধোলাই টেস্ট ওয়ানডে সব জায়গায়ই। খেলা হতো আর সবার মনে একটাই কথা, “ইশ! যদি সাকিব থাকতো!”

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের পরই টনক নড়লো বিসিবির, তুলে নিলো সাকিব আল হাসানের নিষেধাজ্ঞা। তার মানে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরের হোম সিরিজেই খেলছেন সাকিব আল হাসান।

জিম্বাবুয়ে আসলো, ফিরে এসে প্রথম ইনিংসেই ৬ উইকেট। পরের ইনিংসে তাইজুল বিধ্বংসীতায় বিপর্যস্ত জিম্বাবুয়ে, ঢাকা টেস্ট বাংলাদেশের।

এবার খুলনা টেস্ট এর পালা।
কে জানতো, এখানে একটা মহাকাব্য রচিত হবে? যেটা বারবার পড়বে সবাই, মুগ্ধ হবে, আনন্দে উদ্ভাসিত হবে, অনুভব করবে, হাজার বছর মনে থাকবে যে মহাকাব্য, হাজার বছর টিকে থাকবে যে মহা কবিতা!

প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। ৫৬ রান করে মাহমুদুল্লাহ ফিরে গেলেন দলের ১৭৩ রানে, নামলেন সাকিব আল হাসান। প্রিয় বন্ধু তামিমের সাথে করলেন ১৩২ রানের জুটি, ১০৯ করে ফেরত গেলেন তামিম। এরপর মুশফিক, শুভাগতের সাথে ছোট দুটো জুটি। ৩৭৬ রানে যখন সাকিব আল হাসান আউট হলেন, নামের পাশে তখন ১৩৭। সবাই বলছিলো, প্রত্যাবর্তন সিরিজটা অসাধারণ করে তুলছেন মি.৭৫। কেউ তখনও অনুমান করেনি, অসাধারণত্ব কেবল শুরু!

বাংলাদেশ ৪৩৩ রানে অল আউট হওয়ার পর জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং এ নামার পালা। এবার সাকিবের কাজ বলটাকে ঘুরানো, আছড়ে ফেলা নয়! আঘাত তাইজুল শুরুতেই হানলেন, দুই ওপেনার কে তুলে নিয়ে। এরপর আসলেন সাকিব, তুলে নিলেন টেইলর, আরভিন আর চিগাম্বুরার উইকেট। কিন্তু এরপরই গলায় কাটা হয়ে বিধলো হ্যামিল্টন মাসাকাদজা আর চাকাভার জুটি। এটাও ভাঙলেন সেই সাকিব আল হাসানই, ১৫৮ করা মাসাকাদজা কে বোল্ড করে। এরপর ওয়ালার কে তুলে নিয়ে পূরণ করলেন ৫ উইকেট, জিম্বাবুয়ে গুটিয়ে গেলো ৩৬৮তে, ৬৫ রানের লিড বাংলাদেশের, সাকিবের ৫ উইকেট ৮০ রানের বিনিময়ে।

দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশ বলতে গেলে ব্যাটিং বিপর্যয়েই পরলো। শেষমেশ মমিনুল, মাহমুদুল্লাহ আর শুভাগতের ফিফটিতে ৯ উইকেটে ২৪৮ রানে ডিক্লেয়ার করে বাংলাদেশ। ৬ রান করেন সাকিব আল হাসান। জিম্বাবুয়ের সামনে শেষ দিনের সোয়া দুই সেশনে ৩১৪ রান করার লক্ষ্য।

ব্যাটিং নামা জিম্বাবুয়েকে প্রথম ধাক্কাটা দেন তাইজুল, চারিকে আউট করে। এরপর শুধু সাকিব শো, সাহায্য করেন তাইজুল-জুবায়ের। বাংলাদেশের এই স্পিন ত্রয়ীকে সামলাতে গিয়ে হাসফাস করলো জিম্বাবুইয়ান ব্যাটিং লাইনআপ, আর সাকিব আল হাসান রচলেন মহাকাব্য। সিকান্দর রাজাকে দিয়ে শুরু, এরপর তুলে নেন ব্রেন্ডান টেইলরকে, এরপর আবারও গলায় কাটা হয়ে বিধে থাকা হ্যামিল্টন মাসাকাদজকে, এরপর এলটন চিগাম্বুরা। ম্যাচে এর মধ্যেই ৯ উইকেট আর সেঞ্চুরি, রেকর্ডের বরপুত্র কি আরেকটা রেকর্ড করবেন?

অবশ্যই করবেন। তিনি যদি রেকর্ড না করেন তবে আর কে করবে?

মুশফিকুর রহিমের গ্লাভসবন্দী করলেন মুশাংওয়েকে, জিম্বাবুয়ের নবম উইকেট পতন, আর ওইদিকে ইতিহাসে নাম উঠে গেছে মাগুরার সেই শুকনো ছেলেটার, নাম তার সাকিব আল হাসান।

এরপর তাইজুল ইসলাম জিম্বাবুয়ে দলের লেজটা ছেটে দিলেন, তবে স্পটলাইটটা যে দলের জয়ের চেয়ে সাকিব আল হাসানের উপর বেশী, তা বোঝাই যাচ্ছিলো।

এক ম্যাচে ১৪৩ রান দুই ইনিংসে, ১৩৭ আর ৬, দুই ইনিংসে ৫/৮০ আর ৫/৬৪ মিলে হয়ে গেছে ১০/১৪৪, দিনশেষে সাকিব আল হাসানের নামের পাশে আরেকটা রেকর্ড, এক টেস্টে সেঞ্চুরি আর ১০ উইকেট।

এমন এক উচু পর্বত, যাতে পা রেখেছেন এর আগে শুধুমাত্র ইয়ান বোথাম আর ইমরান খান। সেখানে আমাদের সাকিব আল হাসান, গর্ব কি হবে না?

এরকম রাজসিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে যদি আমি এখন একটা গল্প লিখতাম তবে আপনি নিঃসন্দেহে আমার গল্পটাকে বস্তাপচা বলে ফেলতেন আর বলতেন এভাবে ফেরা সম্ভব নাকি!

সম্ভব, অবশ্যই সম্ভব। সাকিব আল হাসানের পক্ষেই সম্ভব। এভাবে ফিরে আসা সবার দ্বারা হয় না। এভাবে রেকর্ডের পর রেকর্ড করা ওই একজন কে দিয়েই হবে, ওটা সবাই পারে না। সাকিব আল হাসান আমাদের অনেকদিনের সুপারস্টার এর আক্ষেপ মিটিয়েছেন, অনেক কিছুই এনে দিয়েছেন।

তা সাকিব আল হাসান কে তো আমরা প্রশ্ন করতেই পারি,
“তোমার চিত্রনাট্য, কে লিখে দেয়?”

Leave a Reply