শেন ওয়ার্নঃ হারিয়ে যাওয়া হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প শুনেনি এমন কাউকে খুজে পাওয়া দুষ্কর। রুপকথার সেই বাঁশির সুর শোনার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। তারপরও আমরা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারি সেই বাঁশির সুর কতটা মধুর ছিল। হয়ত হ্যামিলনের সেই বাঁশিওয়ালা বুঝতে পেরেছিলেন ক্রিকেটে বুঁদ হয়ে থাকা এমন এক প্রজন্ম আসবে যারা তার বাঁশির সুর শোনার জন্য আফসোস করবে। তাই তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে নিবেদন করেছিলেন এমন কোন ক্রিকেটারকে যেন পাঠানো হয় যিনি বাইশ গজে বাঁশির সুর তুলবেন; সেই হারিয়ে যাওয়া বাশির সুর। যে সুরে মজে থাকবে লাখো ক্রিকেট ভক্ত। আর সেই ক্রিকেটার লক্ষ কোটি বছর তার কীর্তিতে অমর করে রাখবেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার বাঁশির সুর। সৃষ্টিকর্তা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার চাওয়া অপূর্ণ রাখেননি। তিনি বাইশ গজে এমন এক ক্রিকেটারকে পাঠিয়েছেন যার সুরের মূর্ছনার কাছে হার মেনেছে সকল চাওয়া-পাওয়া। যার জাদুর ছোয়ায় লেগ স্পিন সম্পূর্ণ এক শৈল্পিক এবং কার্যকর অস্ত্রে পরিনত হয়েছিল, আমি সেই রগচটা এবং বাকপটু অজি ক্রিকেটার শেন ওয়ার্নের কথাই বলছি।

এমনিতেই লেগস্পিনকে বলা হয় গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেটের সুন্দরতম অংশ। লেগস্পিনারদের জাদুর ছোঁয়ায় বুঁদ হয়ে থাকে কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী। আবদুল কাদির থেকে শুরু করে হালের ইয়াসির শাহ, রাশিদ খানেরা বাইশ গজে বল হাতে সুরের মূর্ছনায় আন্দোলিত করেন কোটি ভক্তের প্রান। একজন লেগস্পিনার হয়েও, শেন ওয়ার্ন ছিলেন প্রথাগত লেগস্পিনারদের চেয়ে বেশি কিছু।

একটা কথা প্রচলিত আছে লেগস্পিনার তৈরি করা যায় না, বরং লেগস্পিনারেরা জন্ম নেন। অমিত প্রতিভাবান শেন কেইথ ওয়ার্ন ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সালে জন্মেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন তিনি। স্কুল ক্রিকেটেই প্রতিভার কারণে বৃত্তি পেয়েছিলেন। বয়স যখন মাত্র ১৬, পুরো অস্ট্রেলিয়া জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। অল্প বয়সেই ইউনিভার্সিটি অফ মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পান। তবে ছোটবেলায় কালজয়ী এই লেগস্পিনার লেগ স্পিন এবং অফ স্পিন, দুটোতেই সমান পারদর্শি ছিলেন। ছোটবেলায় ব্যাট হাতেও খারাপ ছিলেন না। লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। কিছুদিন পর তিনি সেন্ট কিল্ডা ক্রিকেট ক্লাবে যোগ দেন। সেখানে তাকে পেয়ে বসে ফুটবলের নেশা। তখন ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি ফুটবলও খেলতেন । সেন্ট কিল্ডা ফুটবল ক্লাবের হয়ে অনুর্ধ্ব-১৯ ফুটবল টুর্নামেন্টও খেলেন খামখেয়ালি স্বভাবের ওয়ার্ন। তবে ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেটে তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, সেটা বুঝতে খুব বেশিদিন সময় নিলেন না। সেন্ট কিল্ডা ক্লাব ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন ১৯৯০ সালে। এরপরের গল্প শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। নিজেকে চেনার। বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করার।

শেন ওয়ার্নের যখন আবির্ভাব তখন স্পিন বোলিংকে ভাবা হত বর্ণহীন, ছন্দহীন। ক্রিকেটবিশ্বে তখন পেসারদের দাপট। ওয়াসিম, ওয়াকারেরা ব্যাটসম্যানদের জন্য রীতিমত আতংক। ব্যাটসম্যানেরা সেই তুলনায় স্পিনারদের বল খেলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। ক্রিকেটের বর্ণহীন, ছন্দহীন স্পিনকে ওয়ার্ন রাঙিয়ে দিয়েছিলেন আপন তুলিতে। মরা পিচেও অভাবনীয় টার্ন করানোর এক আশ্চর্য ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন, আর তা কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়তই ব্যাটসম্যানের নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছেড়েছেন। ওয়ার্ন সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন টেস্ট ক্রিকেটে। ১৪৫টি টেস্টে ২৫.৪১ গড়ে শিকার করেছেন ৭০৮টি উইকেট। ইনিংসে ৫ উইকেট ৩৭বার এবং ম্যাচে ১০ উইকেট শিকার করেছেন ১০বার। তার খেলা ১৪৫ ম্যাচের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ৯২টি ম্যাচে জিতেছে। এই ৯২ ম্যাচে মাত্র ২২.৪৭ বোলিং গড়ে ৫১০ উইকেট শিকার করেছেন তিনি। একমাত্র বোলার হিসাবে নিজ দলের জয় পাওয়া ম্যাচগুলোতে ৫০০ উইকেট শিকার করেছেন। পেস এটাক নির্ভর অজিদের হয়ে জয় পাওয়া ম্যাচগুলোতে এত বড় অবদান রাখা শেনের অসাধারণত্বকে তুলে ধরবে। নানা জটিলতায় একদিনের ক্রিকেট খুব বেশি খেলতে পারেননি। তবে যতদিন খেলেছেন কখনো পার্শ্বনায়ক হয়ে থাকেননি। বল হাতে সব সময় ছিলেন অধিনায়কের মূল ভরসা।

৯৯-এর বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন এই জাদুকর। ৯৯-এর বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারও উঠেছিল তার হাতে।

ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা বলটি এই জাদুকর তার শৈল্পিক ডান হাত দিয়েই ছুড়েছিলেন। সেটা ছিল মর্যাদাপুর্ন এশেজে ওয়ার্নের প্রথম বল। দুয়েক পা দৌড়ে বল ছুঁড়লেন। বল পিচ করল লেগ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরে। ব্যাট হাতে ছিলেন গ্যাটিং। বল যদি না ঘুরে তাহলে লেগ স্ট্যাম্পের পাশ দিয়ে কিপারের গ্লাভসে যাবে আর ঘুরলে প্যাড না হয় ব্যাটে লাগবে। এই বল নিয়ে ভয় পাওয়ার তেমন কিছু নেই। কিন্তু বল মাটিতে পড়ার পরেই ঘটল ভিন্ন ঘটনা, গ্যাটিং কিছু বুঝে উঠার আগেই শেন ওয়ার্নের বলটি স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি লাফিয়ে আঘাত হানল অফ স্ট্যাম্পের মাথায়। অস্ট্রেলিয়ার উইকেটরক্ষক ইয়ান হিলি যখন শুন্যে লাফিয়ে উদযাপন করছেন, তখন গ্যাটিং অবাক দৃষ্টিতে বাইশ গজের দিকে তাকিয়ে।

শেনের ক্যারিয়ার হতে পাড়ত আরো অনেক বেশি সমৃদ্ধ। খামখেয়ালিপনা তার রক্তেই মিশে ছিল। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন রগচটা স্বভাবের। তাই কখনো অজিদের দলনেতার দায়িত্ব পাননি। শেনকে বলা হয় কখনো জাতীয় দলে অধিনায়কত্ব না করা সেরা ক্রিকেট মস্তিস্কের অধিকারী। এছাড়া ক্যারিয়ারে অনেকবার বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন শেন ওয়ার্ন। ক্যারিয়ারের শুরুতে বাজিকরদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করে দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছিলেন। ২০০০ সালে ইংল্যান্ডের এক সেবিকাকে অরুচিকর বার্তা পাঠিয়ে বেশ সমালোচিত হয়েছেন। একবার ধূমপান করার সময় কিছু তরুণ তার ছবি তুললে মারপিট করেও বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন। সবকিছু ছাপিয়ে ২০০৩ সালের বিশ্বকাপের কদিন আগে ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে ক্রিকেট থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। যার কারণে তার আর বিশ্বকাপ খেলা হয়নি। এইসব কারনে তিনি মুরালিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। তবে প্রতিভার দিক দিয়ে তিনি মুরালির চেয়ে এগিয়ে ছিলেন একথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

ক্রিকেটের এই জীবন্ত কিংবদন্তী ক্যারিয়ারে সন্মাননাও পেয়েছেন অনেক। ১৯৯৪ সালে উইজডেন ক্রিকেটার অব দি ইয়ার, ২০০০ সালে উইজডেন ক্রিকেটার অব দি সেঞ্চুরি, ২০০৫ সালে বিবিসি স্পোর্টস পারসোনালিটি অব দি ইয়ার, ২০০৬ সালে সাউথহ্যামটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি।

শুধু পুরস্কার বা স্ট্যাট একজন শেন ওয়ার্নকে তুলে ধরতে পারবে না। ওয়ার্নের খেলা না দেখে থাকলে ওয়ার্ন কত বড় মাপের ক্রিকেটার ছিলেন তা বোঝা বেশ কষ্টসাধ্য। ওয়ার্ন একজনই ছিলেন। ওয়ার্নের মত আরেকজনকে ক্রিকেট বিশ্ব কখনোই পাবে না। শুরুতেই বলেছিলাম হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার কথা। এখন যদি আপনাকে বলা হয় সরাসরি মাঠে বসে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার বাঁশির সুর অথবা সেরা সময়ের শেন ওয়ার্নের লেগ স্পিন আপনি দেখতে পারবেন। তাহলে কোনটিকে আপনি বেছে নিবেন? আমি কিন্তু বাইশ গজের বাঁশিওয়ালা শেন ওয়ার্নকেই বেছে নেব।

Leave a Reply