কেন হারিয়ে যান রাসেল নাজমুলেরা?

সৈয়দ রাসেলের কথা মনে আছে? ছয় ফুট এক ইঞ্চি লম্বা ছেলেটা। স্লো মিডিয়াম ফাস্ট বল করত। যখন বাংলাদেশের কাছে প্রতিটি জয় ছিল সোনার হরিণ সেই সময় বাংলাদেশের অনেক জয়ের নেপথ্য নায়ক ছিলেন সৈয়দ রাসেল। টেস্টে খুব বেশি ভালো করেননি। ৬ টেস্টে মাত্র ১২ উইকেট। তবে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তিনি দারুন সফল ছিলেন। ৫২ ওয়ানডেতে ৬১ ও ৮টি-টোয়েন্টিতে ৪ উইকেট। রাসেল উইকেটের জন্য নয়, বরং অপরিহার্য ছিলেন নিয়ন্ত্রিত বোলিং এর জন্য। সৈয়দ রাসেল জাতীয় দলের হয়ে কী করেছেন, দলের জন্য কতটা উপকারী ছিলেন সেটা পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝানো যাবে না।

ইদানীংকালে মুস্তাফিজ, তাসকিনদেরকে যেভাবে গাইড করা হয়, যত্ন নেওয়া হয় সাত-আট বছর আগেও এমনটা ছিল না। সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত ছিলেন পেস বোলারেরা। রাসেল দীর্ঘদিন কাঁধের ইনজুরি নিয়েই খেলেছেন। ২০০৭ বিশ্বকাপের পর থেকেই ব্যাথাটা বেড়ে যেতে লাগল। বিসিবি থেকে প্রথম দিকে কোন সাহায্য পাননি। ক্রিকেটই একমাত্র রুটিরুজি বলে ইনজুরি নিয়েও খেলা চালিয়ে যেতে হয়েছিল। ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে বিসিবির দয়া হল। সেরা সময় পেরিয়ে এসেছেন বলেই ভারত থেকে অপারেশন করিয়ে আনা হল। অথচ অন্যসব ফাস্ট বোলারদের অপারেশন অস্ট্রেলিয়া – ইংল্যান্ডের মত দেশে হয়ে থাকে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! অপারেশনের পর আর বল হাতে আর মাঠে নামা হয়নি অমিত প্রতিভাবান রাসেলের। অবশেষে জানা গিয়েছিল অপারেশন সফল হয়নি; আবার অপারেশন করাতে হয়েছিল। কিন্তু এবার আর বিসিবির দয়া হল না। বিভিন্ন সময়ে সংবর্ধনা, সিরিজ জয়ের উপহার হিসেবে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদেরকে লাখ লাখ টাকা দিলেও ক্যারিয়ারের স্বর্ণসময়কে পেছনে ফেলে আসা সৈয়দ রাসেলের পেছনে আর অর্থ ব্যয় করতে চায়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। মাশরাফির আর্থিক সহায়তাই চিকিৎসা করিয়ে এ যাত্রা মাঠে ফিরলেও ইনজুরি এখন পেছন ছাড়েনি। প্রথমে ক্যাম্প আর এখন গ্রোয়েন ইনজুরি ভোগাচ্ছে।

আরেক অভাগা ক্রিকেটার হলেন নাজমুল হোসেন। নামটি হয়তো শুনে থাকবেন। না শুনে থাকলেও দোষের কিছু নেই। নাজমুলরা কখনো লাইমলাইটে থাকেন না, থাকেন লাইনের পেছনে সারিতে। একসময় নিরবে হারিয়ে যান। অসম্ভব রকমের পরিশ্রমী এই ক্রিকেটার টেস্ট খেলেছেন মাত্র দুটি, দুটি টেস্টের মাঝে ডিফারেন্স ছিল মাত্র সাত বছর! ৩৮টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে লাল সবুজ জার্সি গায়ে ৪৪ উইকেট তার। তবে আশ্চর্য হল বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় জয়গুলোতে মাঠে ছিলেন নাজমুল। ২০০৫ কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়া বধে, ২০০৬ বগুড়াতে শ্রীলঙ্কা বধে,২০১০ মিরপুরে নিউজিল্যান্ড বধে তার ভুমিকাও কম ছিল না। তিনিও অনেকটা রাসেলের মত নিয়ন্ত্রিত বোলিং করতেন। গোল বোলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও নিজের ভাগ্যের চাকাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারেননি।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত বোলার ছিলেন তালহা জুবায়ের। স্রেফ ইনজুরির কাছে হার মেনে ক্যারিয়ার লম্বা হয়নি। শরিফের চেয়ে ভালো রিভার্স বাংলাদেশের কোন পেসার কখনো করতে পারেনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে এখনো বল হাতে ঝড় তুললেও জাতীয় দলের দরজাটা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কেন তারা অপাংক্তেয়? এর উত্তর কে দিতে পারবে? বোর্ড কিছুতেই এর দায় এড়াতে পারে না। নতুন কেউ উঠে আসলে পুরাতনদেরকে ছুড়ে ফেলতে হবে এই নীতি থেকে আমরা যতদিন না বেরিয়ে আসতে পারব আমাদের ভিত্তি ততদিন শক্ত হবে না। বিসিবিকে এগিয়ে আসতে হবে, এগিয়ে আসতে হবে ক্রিকেট সংগঠকদেরকে। রাসেল, নাজমুল, শরীফ, তালহার মত যেন আর কেউ হারিয়ে না যায় সেই দিকে নজর দিতে হবে।

Leave a Reply