শুভ জন্মদিন ম্যাকাবে

অনেকদিন আগে জ্যাকি চ্যানের একটি চলচ্চিত্র দেখেছিলাম। বেশ কিছু কারণে সেই চলচ্চিত্রের আবেশ এখনো রয়ে গেছে। জ্যাকি একটি রাজ্যের সেনাপতি। রাজসভার ষড়যন্ত্রে রাজার পক্ষের লোকগুলো সবাই বিপক্ষে চলে যায়। সেনাপতি শুধু সামান্য কিছু বিশ্বস্ত সৈনিক নিয়ে রয়ে যান রাজার পক্ষে। বিশাল সেনা বাহিনীর সাথে লড়াই করার জন্য সামান্য কয়েকজন সৈন্য যথেষ্ট নয়। তবুও আমৃত্যু লড়াই করে যান তারা। মৃত্যুর আগে সৈনিকদের একজনের সংলাপ ছিল – সেনাপতি আপনার পাশে দাঁড়িয়ে, আপনার পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করা ছিল আমার জন্য সম্মানের।

খেলার সাম্রাজ্যে যদি এভাবে দেখতে যাই তাহলে কেমন হতে পারে? ফুটবলে পেলে, ম্যারাডোনা কিংবা হাল আমলের মেসি কিংবা রোনালদোর পাশে খেলাটাই অন্য যে কোন খেলোয়াড়ের জন্য সম্মানের। ক্রিকেটে কারা থাকতে পারেন এই তালিকায়। ক্লাইভ লয়েড, শচিন কিংবা লারা! আর সেই সেনাপতি যদি হন স্বয়ং ব্র্যাডম্যান তাহলে কেমন হয়! আর একটু যোগ করি, সেনা নয় যদি সেনাপতিই বলেন আপনার পাশে খেলতে পারাটা আমার জন্য সম্মানের, তাহলে কেমন হয়? হ্যা, ব্র্যাডম্যান একজন খেলোয়াড়ের ইনিংস দেখে বলেছিলেন, “তোমার এই ইনিংসের মত যদি আমি একটি ইনিংস খেলতে পারতাম, তাহলে নিজেকে গর্বিত ভাবতে পারতাম।”

১৯৩২ অ্যাসেজ সিরিজ। ইংল্যান্ড দল সফর করছে অস্ট্রেলিয়া। অজিদের প্রধান অস্ত্র ডন ব্র্যাডম্যান অবশ্য এই ম্যাচ খেলছেন না। ডন না খেললেও অস্ট্রেলিয়া দল যথেষ্ট শক্তিশালী। ২২ বছরের তরুণ অজি খেলোয়াড় অনেকটাই নির্ভার। সাধারণত ছয় নাম্বারে ব্যাট করে থাকেন। তাই আরও একটু বেশি নিশ্চিন্ত হয়েই সিডনি গ্রাউন্ডে মা বাবার সঙ্গে ফ্রন্ট সিটে বসেই খেলা উপভোগ করতে লাগলেন। যতটা নির্ভার হয়ে খেলা উপভোগ করতে শুরু করেছিলেন, ঠিক ততোটাই দুশ্চিন্তা আচ্ছন্ন করেছিল মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই। অজিদের পরাস্ত করার জন্য ব্রিটিশরা পেতেছিল বডি লাইন বোলিঙের মহা ফাঁদ! হ্যারল্ড লারউড এবং বিল ভচ এর এক একটা বল যেন আগুনের গোলা হয়ে আঘাত করছিল অজিদের ব্যাটিং দুর্গে। মাত্র ৮২ রান তুলতেই প্রথম সারির ৩ উইকেটের পতন। পাঁচ নাম্বারে তিনি ব্যাট করলেও তখন পর্যন্ত আশার আলো দেখানোর মত কিছুই যে করেননি তিনি! পূর্বের ১৫ টেস্টে ৬০৭ রান। কোন সেঞ্চুরি নেই, এভারেজ ৩০ এর নিচে। উল্লেখ করার মত মাত্র ৪ টি অর্ধ শতকের ইনিংস। অজি সমর্থকরাও হয়ত তার কাছে বেশি কিছু আশা করতে পারেননি। বিপদের সময় কাউকে না কাউকে তো নেতা হতেই হয়। তিনি তাই করে দেখালেন!

সেই দিন ইংলিশ বোলার যে কতটা ভয়ঙ্কর ছিল তার একটা প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে তার কথা থেকেই। ড্রেসিং রুমের দিকে যাবার আগে কানে কানে তার বাবাকে বলে গেলেন, ” আমি যদি আজ আহত হই তবে মা’কে যেন সিমানা প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে বাঁধা যেন দেয়া হয়।” যদিও সীমানা প্রাচীর আর ডিঙ্গাতে হয়নি। তবে বলকে সীমানার বাইরে যেতে হয়েছিল অনেকবার। ভাগ্যদেবীও হয়ত সহায় হয়েছিল তার উপর।

যে বডি লাইন বোলিং এর কারণে দলের সেরা ব্যাটসম্যান আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরেছে। সেই বলগুলোকেই হুক আর পুলের মাধ্যমে আছড়ে ফেলেছিলেন বাউন্ডারির বাইরে। দিন শেষের আগেই দেখা পেলেন সেই মহা মূল্যবান সেঞ্চুরির। প্রথম দিনের খেলা শেষে অজিদের স্কোর বোর্ডে তখন ২৯০ রান ৬ উইকেটে। ১২৯ রান নিয়ে অপরাজিত তিনি। দ্বিতীয় দিনেও তার ব্যাট থেকে আসতে লাগল মহামূল্যবান রান।

প্রথম ইনিংসে ৩৬০ রানে অল আউট। ২৩৩ বলে ২৫টি চারের মাধ্যমে ১৮৭ রানে তিনি তখনো অপরাজিত। যদিও সেই টেস্ট ম্যাচ ইংল্যান্ড জিতেছিল ১০ উইকেটে। লড়াই করার মত সংগ্রহ জমা করার পিছনে তার অবদানই যে মুখ্য!

১৯৩২ এর অ্যাসেজ সিরিজের পর থেকে অবশ্য তাকে আর পিছে ফিরে দেখতে হয়নি। সমহিমায় তিনি ছিলেন উজ্জ্বল। পারফর্মেন্স দিয়ে নিজেকে নিয়ে এসেছেন কাপ্তান ব্র্যাডম্যান এর ডেপুটির আসনে। তবে একটি জিনিস পরিবর্তন হয়নি! অস্ট্রেলিয়া যখনই বিপদের মুখে তখনই হেসে উঠেছে তার ব্যাট। ১৯৩৮ সাল আরো একটি অ্যাসেজ, এবার অবশ্য ইংলিশদের আতিথিয়তা নিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। টেন্টব্রিজে প্রথম টেস্টেই রানের পাহাড়ের নিচে চাঁপা পরল আজিরা। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ ৮ উইকেটে মাত্র ৬৫৮ রান। ১১১ রান তুলতেই দুই অজি ব্যাটসম্যানের বিদায়। মাত্র ৫১ রান করে প্যাভিলিয়নে ফিরছেন ব্র্যাডম্যান। এমন পরিস্থিতিতেই মাঠে নামলেন তিনি। উইকেটে এসেও সঙ্গীদের কাছ থেকে তেমন কোন সহায়তাই পেলেন না। ১৯৪ রানেই ৬ উইকেটের পতন। অগত্যাই হয়ত সিদ্ধান্ত নিলেন আক্রমণাত্মক খেলা ছাড়া আর বিকল্প নেই। শেষ ব্যাটসম্যান হিসাবে আউট হবার আগে তুলে নিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি। ২৩২ রান তুলতে খেললেন মাত্র ২৭৭ বল। ৩৪টি চার একটি ছয় দিয়ে সাজানো সেই মহাকাব্যিক ইনিংস! এই ইনিংস দেখে ব্র্যাডম্যান এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে, ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলছিলেন, এই ইনিংস দেখে রাখো, এমন ইনিংস আর কখনোই দেখতে পাবে না। আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরত আসার সময় উপস্থিত দর্শকদের কাছ থেকেও পেয়েছিলেন গার্ড অফ অনার।

এমন অভাবনীয় ব্যাটিং সফলতার পরও এই সিরিজটাই ছিল তার ক্যারিয়ারের শেষ সিরিজ। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের কারণে আর আন্তর্জাতিক কোন ম্যাচ খেলা হয়নি তার। মাত্র ৩৯টি টেস্ট খেলা এই খেলোয়াড়ের অর্জন হতে পারত আরও দীর্ঘ। ৩৯ টেস্টে ৪৮.২১ এভারেজে করেছিলেন ২৭৪৮ রান। পার্ট টাইম বোলার হিসাবেও পেয়েছেন ৩৬ টি উইকেট। ১৯১০ সালের ১৬ই জুলাই জন্ম নিয়েছিলেন এই অজি তারকা। শুভ জন্মদিন স্ট্যানলে জোসেফ ম্যাকবে!

Leave a Reply