নাটকে এবার নায়ক রাজশাহী কিংস

রাজশাহীর ইনিংসের ২০তম ওভারের ২য় বলের আগে ক্লোজ ইন ক্যামেরায় দেখানো হলো ড্যারেন স্যামির অবাক করা হতাশামাখা মুখ।দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে কি বুঝালেন,তার আউট হওয়াটা উচিৎ হয় নি চার বল আগে,নাকি আরো একটি বেদনার গল্প রচিত হচ্ছে,সেটাই বুঝতে পেরে সেই মাথা নাড়ানো।

যা-ই বুঝান না কেনো,একটা বিষয় নিশ্চিত,আবারো তীরে এসে তরি ডুবানোর চিন্তা রাজশাহী প্লেয়ারদের মাথায় না এসেই পারে না।শেষ ওভারে ৯ রান টি২০ তে ডালভাত মনে হলেও রাজশাহীর প্লেয়াররা তো জানেন,তাদের জন্য এটা নারীর মন বোঝার চেয়েও কঠিন।

অথচ কিছুক্ষণ আগের সমীকরণটাই কি এমন ছিলো???১৮৩ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে শুরুতেই জুনায়েদ সিদ্দিকীকে হারালেও রাজশাহী সমর্থকরা মনে মনে খুশিই হয়েছিলেন।সাব্বির রহমান নামবেন,এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে এবার বিপিএলের একমাত্র সেঞ্চুরিয়ানকেই তো দরকার তখন।

কিন্তু দলীয় ৩১ রানের মাথায় তিনিও বিদায় নিলে চাপে পড়েই যায় রাজশাহী।

দাঁড়ান,দাঁড়ান,এই চাপ শব্দটা শুনলে আপত্তি করতে পারেন মুমিনুল হক।এবারের বিপিএলকে যিনি সব চাপের সাথে ‘টেস্ট প্লেয়ার’ তকমাও উড়িয়ে দেওয়ার মিশন হিসেবে নিয়েছেন।সেই মিশনে আগের ইনিংসগুলোর সাথে যোগ করুন আজকের ৪২ বলে ৫৬।৮ টি চারের সাথে প্রসন্নের বলে লং অন দিয়ে মারা একটি বিশাল ছক্কা।

তবুও তিনি ম্যাচের পার্শ্বনায়ক।নায়ক তো একাই ছয় ছক্কায় ইনিংস সাজিয়ে ম্যাচ বের করে নেওয়া সামিত প্যাটেল।মুমিনুল যেখানে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে গড়ে তুলেন ১০০ রানের পার্টনারশিপ।অথচ দুইজনেরই ম্যাচটা হতে পারতো ভুলে যাওয়ার মতো।

টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামার পর ঢাকার মেহেদি মারুফের আরো একটি ঝোড়ো শুরু।কিন্তু গত ম্যাচগুলোর সাথে ব্যতিক্রম হলো,আজ সাঙ্গাকারাও তার বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখাতে শুরু করলেন।দারুণ কিছু শট খেলে পাওয়ারপ্লেতে এনে দিলেন ৫১ রান।

সাঙ্গাকারা ফিরতে পারতেন তখনই।কিন্তু পয়েন্টে সামিত প্যাটেল ক্যাচ মিস করলে সু্যোগ পান ইনিংস বড় করার।সেটাও সুযোগ হয়েই থাকতো,যদি না মুমিনুল এক্সট্রা কাভারে তার ক্যাচ মিস না করতেন।আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই সাঙ্গা তুলে ফেলেন তার এবারের বিপিএলে ১ম ফিফটি।

রানরেট বাড়ানোর চেষ্টায় সাঙ্গাকারা দলীয় ১২১ রানে কিংবা তার আগে মোসাদ্দেক আউট হলে মনে হচ্ছিলো,মেহেদি মারুফের আজকের ঝড়টা বৃথাই যাবে আজ।সেই দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে ১৩৮ রানে আউট ম্যাথু কোলও।তবুও পরের ২৩ বলে সাকিব আর সেকুগে প্রসন্নের ছোট দুটি কার্যকরী ঝড়ে ঠিকই পৌঁছে যায় ১৮৩ এর লড়াই করার পুঁজিতে।

কিন্তু সেই রানও কম মনে হচ্ছিলো মুমিনুল আর সামিত প্যাটেলের ব্যাটে।তারা দলীয় ১৩১ ও ১৫৪ রানে তারা আউট হলেও সমীকরণ রেখে যান ২৫ বলে ২৯ দরকার রাজশাহীর,উইকেট হাতে ৪টি।কোন দল ফেভারিট এটা তো এখন চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়।

কিন্তু,দলটার নাম যে রাজশাহী।সাসপেন্স না আনলে যাদের খেলা জমে না।সেই সাসপেন্স দিতেই কিনা,পরের ওভারে ৬ বলে ১২ রান করে আউট উমর আকমল।

তখনো ভয় ছিলো না।ড্যারেন স্যামি তখনো ক্রিজে।কিন্তু ভয়টা হরর মুভিতে রূপ নেয়,১৯ তম ওভারের মধ্য সময়ে তিনিও ডিজে ব্রাভোর বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরের পথ ধরলে।রান-বলের সমীকরণ ৯ বলে তখন ১১ দেখালেও রাজশাহীর জন্য যা ডিঙি নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সাধ।

সেই সাধকে সাধ্যের বাইরে রাখতে ২০তম ওভারের ১ম বলেই আউট এক টেস্ট সেঞ্চুরিতেই ব্যাটসম্যান বনে যাওয়া আবুল হাসান রাজু।আগের দুই ওভারে ২৫ রান দেওয়ার পরও ম্যাথু কোলের উপর সাকিবের আস্থা রাখার ফাটকাটা তখন কাজে লেগেই গেলো বলে মনে হচ্ছিলো।৩৫ রান খরচায় ৩ উইকেট পাওয়া ডিজে ব্রাভো কিংবা দারুণ ফর্ম ধরে রেখে আজকেও ২ উইকেট নেওয়া মোহাম্মদ শহিদকে আগেই খরচ করে ফেলার সিদ্ধান্তও তখন সঠিক বলেই ভাবা হচ্ছিলো।

যেমন সঠিক বলে মনে হচ্ছিলো,প্রথমেই বলা ড্যারেন স্যামির ম্যাচ হারার শঙ্কায় সেই অভিব্যক্তি।

কিন্তু,সাসপেন্সের শেষেও সাসপেন্স থাকে।

হারের প্রস্তুতি নেওয়া রাজশাহীকে নামার পর প্রথম বলেই চার এনে দিয়ে আশা দেখালেন ফরহাদ রেজা।পরের বলে সিঙ্গেল নিয়ে দায়িত্ব দিলেন রাজশাহীর ম্যানেজমেন্টের কাছে বোলার পরিচয় পাওয়া মেহেদি মিরাজ।আরো রোমাঞ্চের আশায় থাকা দর্শকদের হতাশায় ডুবিয়ে পরের বলেই এক্সট্রা কাভার দিয়ে চার মেরে খেলাই শেষ করে দিলেন মিরাজ।যেই শট রাজশাহীকে পয়েন্ট টেবিলে ৬ নাম্বার থেকে উন্নতি না ঘটালেও ম্যানেজমেন্টকে একটা বার্তা পৌঁছে দিলো,১৯ উইকেট শুধু বোলাররাই নেয় না,মিরাজের মতো অলরাউন্ডাররাও নেয়।

যেই শটে মুগ্ধ হয়ে ড্যারেন স্যামি হাঁটু গেড়ে মুখে হাত দিয়ে কি এটাই ভাবছিলেন,ইশ,ওই ম্যাচগুলোতে মিরাজকে নামাতাম!ঢাকা ডিনামাইটসের সান্ত্বনা তখন একটাই,পয়েন্ট তালিকায় তারা নাম্বারেই বহাল আছে।

Leave a Reply