প্রসঙ্গঃ নাজমুল হাসান পাপন।

বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি ছয় মাস পর মেয়াদ শেষ হলে নতুন করে আর সভাপতি পদের জন্য নির্বাচন করবেন না। এই ঘোষনা আসার পর দেশের অনেক ক্রিকেট ফ্যান খুশি হয়েছেন। বিশেষ করে নাসির, বিজয়, নাফীসের ফ্যানরা। আমি নিজে শাহরিয়ার নাফীসের একজন বড় ফ্যান। তবে আমার মতে পাপন বিসিবির ইতিহাসে সবচেয়ে সফল বোর্ড সভাপতি। কেন সেটার ব্যাখ্যা করি।

পেছনের থেকেই যাই, অনেকে বলে থাকেন পাপন ক্রিকেটের কেউ না। এটা সঠিক না। বিসিবি সভাপতি হবার আগে নব্বই এর দশকে পাপন টানা ১১ বছর “আবাহনী ক্লাব” এর সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে আবাহনীর হাত ধরেই প্রথম জয়সুরিয়া, রামান লাম্বা (ঢাকা স্টেডিয়ামে বল লেগে নিহত হন), ওয়াসিম আকরামরা প্রথম খেলতে আসেন। পাপনের সময়। সুতরাং ক্রিকেটের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তার অন্য অনেকের চেয়ে ভালো ছিলো।

সভাপতি হিসেবে দ্বায়িত্ব নেন ২০১২ সালে। সেই সময় বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো ডিসিপ্লিন আর ফিটনেস। মনে আছে সেই সময় তামিম ইকবালের ওজন অনেক বেড়ে গিয়েছিলো, মাশরাফির ফিটনেস অতটা ভালো ছিলোনা। ইনজুরি ম্যানেজমেন্ট ভালো হতোনা বিসিবির। সবচেয়ে সমস্যা ছিলো সাকিব, তামিম, রিয়াদ, মাশরাফির মতো সিনিয়র প্লেয়াররা অনুশীলনে নিয়মিত ছিলেন না। যেটা সেসময় প্রায় সব পত্রিকায় নিয়মিত এসেছে। দলের ভেতর কিছুটা সিনিয়র, জুনিয়র গ্রুপের তৈরী হয়। পাঁচজন প্লেয়ারের বহুল আলোচিত “থিংক ট্যাংক” যুগ তখন। অধিনায়কের একার সিদ্ধান্ত না দল চলতো পাঁচ জনের ইচ্ছায়। সাকিব, তামিম, রকিবুল, মুশফিক, রিয়াদ। এই পাঁচজন বনাম বাকিরা দ্বন্দে ২০১৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ক্রিকেটে বাংলাদেশ সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় চলে যায়। হেরে বসে আফগানিস্তান, হংকং, নেদারল্যান্ডস এর কাছেও। সেখান থেকে ঘুরে দাড়ানোর জন্য প্রথমে নিয়োগ দেয়া হয় নিউ সাউথ ওয়েলস এর এবং সিডনি থান্ডার্সের সফল কোচ হাথুরুসিংহকে। কড়া করা হয় ডিসিপ্লিন। অনুশীলন বাধ্যতামূলক করা হয় তামিম, সাকিব, রিয়াদদের। ফলাফল এখন দেখা যায়, তামিম, রিয়াদ অনেক ওজন কমিয়েছে, মাশরাফি ইতিহাসে সবচেয়ে লম্বা সময় ইনজুরি ছাড়া আছে। দলে সর্বজন শ্রদ্ধেয় হিসেবে অধিনায়ক করা হয় মাশরাফিকে। বাকিটা সবাই জানেন।

ডিসিপ্লিন ফিরিয়ে আনতে এবং সবার সামনে উদাহরন তৈরী করার জন্য বোর্ডের অনুমতি ছাড়াই সিপিএল খেলতে যাওয়া সাকিব আল হাসানকে দেশে ফেরত আসার জন্য বলা হয়। বোর্ডের অনাপত্তি পত্র ছাড়া কোন দেশের কোন প্লেয়ার অন্য লীগে খেলতে যেতে পারেনা। সেসময় সাকিবের বিভিন্ন মন্তব্য এবং ডিসিপ্লিন ভাঙার কারনে কোচের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে সাকিবকে নিষিদ্ধ করা হয়। মূলত এইখান থেকেই দেশে পাপন হেটার্স তৈরী হয়। একজন প্লেয়ারের ফ্যানদের মাধ্যমে। যদিও সাকিবের না থাকাটা খুব সমস্যা একটা তৈরী করেনি। কারন সাকিব ছাড়াই নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয়বারের মতো ০-৩ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয়। আমি মনেকরি অন্যদের জন্য এটা একটা কঠোর বার্তা ছিলো যে ডিসিপ্লিন ভাঙলে দেশের সেরা খোলায়াড় হলেও রক্ষা নাই। আর মানেন আর নাই মানেন ওইটা সাকিবের ভুল ছিলো। সাকিবের বিতর্কিত মন্তব্য নতুন করে আর লিখলাম না।

পাপন দ্বায়িত্ব নেবার পর ২০১২-২০২০ FTP তে বাংলাদেশের মাত্র ৩৩ টি টেস্ট ছিলো। পরে সংশোধিত FTP করা হয় ২০১৪-২০২৩ পর্যন্ত যেখানে বাংলাদেশ ৬৪ টি টেস্ট পায়। এর কিছুটা ভূমিকা মোস্তফা কামালের, কিছুটা পাপন সাহেবের। সবচেয়ে বেশি কষ্ট মনেহয় করেছেন পাপন। তিনি FTP এর বাইরে MPA (Members’ Perticipation Agreements) চুক্তি করেছেন ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ড এর সাথে। FTP আর MPA এর পার্থক্য আছে, FTP আইসিসির, এর আইনগত ভিত্তি নাই, অর্থাৎ কোন দেশ অন্য দেশে সফর না করলে কিচ্ছু করার নাই। আর MPA হয় দুই দেশের, এর আইনি ভিত্তি আছে, কোন দেশ না এলে অন্যদেশকে ক্ষতিপূরন দিতে হয় আর্থিক। যেমন গতবছর ইংল্যান্ড না এলে বিসিবিকে আর্থিক ক্ষতিপূরন দিতে বাধ্য থাকতো।

FTP তে ভারতের সাথে আমাদের দুইটা সিরিজ ছিলো। ২০১৪ আর ২০১৫ সালে ঘরের মাটিতে। MPA আওতায় পাপন আরো দুটি সিরিজ আদায় করেন একটা ওদের মাটিতে প্রথম সফর (২০১৭) আর অন্যটা ২০২০ সালে পূর্নাঙ্গ সিরিজ বাংলাদেশে। ভারতের সাথে দুটি অতিরিক্ত সিরিজ মানে যেকোন বোর্ডের জন্য আর্থিক লাভ।

অস্ট্রেলিয়ার সাথে ২০১৫ সালে দুইটা টেস্ট আদায় করেন যেটা এই বছর আগস্ট মাসে হবে। আইনি ভিত্তি থাকায় অস্ট্রেলিয়া আসবে অন্যথায় ক্ষতিপূরন দিতে হবে। FTP তে ২০২০ পর্যন্ত একটাই সিরিজ ছিলো ২০১৭ তে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে (3 ODI, 2 Tests)। পাপন অতিরিক্ত একটা আদায় করেছেন ২০২১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে।

ইংল্যান্ডের সাথে ২০১০ সালের সিরিজের পর একটা মাত্র সিরিজ ছিলো ২০১৬ সালে আগের FTP তে। ইংল্যান্ড ২০২০ সাল পর্যন্ত যে FTP করেছে তাতে তারা বাংলাদেশকে আর ডাকবে না। তবে ECB চেয়ারম্যানের সাথে একাধিক মিটিং এর পর অতিরিক্ত তিনটা সিরিজ এর জন্য MPA হয়েছে ইংল্যান্ড এর সাথে। একটা সিরিজ হবে ২০২০ সালের আগেই বাংলাদেশে। বাকি দুইটা ২০২৩ সালের ভেতর যার একটা অবশ্যই ইংল্যান্ড এর মাটিতে হবে।

সবচেয়ে সফলতা এসেছে নিউজিল্যান্ড এর সাথে। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট সাতটা সিরিজ হবে তাদের সাথে। চারটা তাদের দেশে, তিনটা আমাদের দেশে। এর একটা অতি সম্প্রতি হয়ে গেল। বাংলাদেশ আবার নিউজিল্যান্ড যাবে ২০১৯, ২০২১ এবং ২০২২ সালে। নিউজিল্যান্ড আসবে ২০১৯, ২০২০ এবং ২০২৩ সালে।

পাপন সাহেবের অন্যতম প্রধান সফলতা তিন টেস্টের সিরিজ আয়োজন করতে পারা। বাংলাদেশ পাপন আসার আগে মাত্র দুইবার তিন টেস্টের সিরিজ খেলেছিলো (২০০৩ আর ২০০৭ সালে)। আর ২০১৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত আটবার তিন টেস্টের সিরিজ খেলবে। যার ভেতর ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ড এর সাথেই দুইটা।

এছাড়া আইসিসির বিভিন্ন মিটিং এ বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো ভুমিকা রেখেছেন একমাত্র পাপন। উপরের সবগুলা সিরিজ পাপন আয়োজন করেছে ২০১৪ সালে “বিগ থ্রি” ফর্মুলার পক্ষে ভোট দেয়ার সময়। আর এখন যখন সবগুলা সিরিজ চূড়ান্ত, আইনি ভিত্তি আছে তখন আবার ৪ ফেব্রুয়ারীর সভায় বিগ থ্রি ফর্মুলার বিপক্ষে ভোট দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের সাথে! পাপন যে একজন দক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তি এখান থেকে সেটা বোঝা যায়। আখেরে বিসিবির কোথাও কোন লস নাই।

পাপনের সবচেয়ে বড় ভালো কাজ আমি বলবো নতুন যে অর্থনৈতিক প্রস্তাব আইসিসি করেছে সেটা যে কমিটির তৈরী তার সদস্য পাপন। গুরুত্বপুর্ন এই কমিটির প্রস্তাব মানা হলে ভারতের মোড়লগিরি কমে যাবে অনেক। এটা বিসিবির জন্য সাহসী কাজ ছিলো। হয়তো সভাপতি পদে আর থাকবেন না বলেই সাহস নিয়েছেন যাবার আগে কিছু করে যাবার।

এছাড়া “টু টায়ার” টেস্ট প্রস্তাব বাতিলের পক্ষে সব সময় সরব ছিলো পাপন। ভারতকে ম্যানেজ করে শ্রীলংকা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে মিলে রুখে দিয়েছে ওই প্রস্তাব।

এর বাইরে ২০১৪ টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১৬ এশিয়া কাপ সফলভাবে আয়োজন এবং আগামী বছর বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব হবে বাংলাদেশে।

পাপনের আমলে বাংলাদেশ ক্রিকেট সবচেয়ে ভালো সময় কাটিয়েছে, বড় বড় সিরিজ জিতেছে। যদিও অনেকে বলে পাপন আর মাশরাফির কপাল ভালো তারা বেস্ট টিম পেয়েছে। প্রশ্ন হলো বেস্ট টিম কম্বিনেশন কিভাবে হলো?

ঘরোয়া ক্রিকেটের মান এবং পারফর্ম করা প্লেয়ার গত দুই বছরে অনেক বেড়েছে। ক্লাব ক্রিকেট, ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়মিত হয়েছে।

জাতীয় লীগের পাশাপাশি ২০১৩ সাল থেকে দেশের দ্বিতীয় প্রথম শ্রেনীর টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ চালু হয়েছে।

বাংলাদেশের কোন স্টেডিয়ামের মালিক বিসিবি না, হয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অথবা জেলা ক্রীড়া সংস্থার থেকে ভাড়া নেয়া। এই জন্য ঢাকার পূর্বাচলে ৭৫ হাজার দর্শক ধারন ক্ষমতার স্টেডিয়াম বানানোর কাজ শুরু করা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এরই ভেতর কাজ ৩০% হয়ে গেছে।

সাফল্য এসেছে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি তরুন ক্রিকেটার এই সময়েই জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন। সৌম্য সরকার, মোসাদ্দেক, সাব্বির, মুস্তাফিজ, মিরাজ, তাসকিন, রাব্বী এরাই পাঁচ বছর পর দেশের সেরা ক্রিকেটার হবে। হিথ স্ট্রিকের মাধ্যমে তরুন পেসারদের তুলে আনাটাও প্রশংসা পাবে।

সমালোচনা যে নাই তা না, মাঝেমাঝেই লম্বা বিরতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাথে নিয়মিত “এ” দলের সফর আয়োজন না করা অন্যতম প্রধান ব্যর্থতা পাপনের।

নাসিরের বাদ পড়া নিয়ে সবচেয়ে মুন্ডুপাত হয় পাপনের। আমার আগের কথা মনে আছে, ২০১৩-২০১৪ তে নাসিরকে মানুষ গালমন্দ করা শুরু করেছিলো। ফর্ম ভালো ছিলো না। সেই অফ ফর্মের সুযোগেই সাব্বিরের দলে আসা। সাব্বির টিকে যাওয়ার ফলে নাসিরের জন্য ফেরাটা কঠিন হয়েগেছে। এরপর সাব্বির ৩ নাম্বারে আসার পর মোসাদ্দেকের ৭/৮ নাম্বারে রান পেয়ে যাওয়া আরো সমস্যা হয়েছে নাসিরের জন্য। ৭/৮ নাম্বারে ওয়ানডেতে মোসাদ্দেক আছে যার স্ট্রাইক রেট, ঘরোয়া ক্রিকেটে রেকর্ড নাসিরের চেয়ে বেটার, আর টেস্ট ম্যাচে ৮ নাম্বারে বোলার হিসেবেই মিরাজ খেলতেছে। সুতরাং নাসিরকে ফিরতে হলে ব্যাট এবং বলে এদের চেয়ে অনেক বেশি রান বা উইকেট নিয়েই ফিরতে হবে। এটাই বাস্তবতা।

নাফীসের বয়স এবং পজিশন সমস্যা। ফর্মে থাকলে তরুনরাই আগে সুযোগ পায়। জাতীয় দলে অনেক ওপেনার। নাফীস বলেছে তার জন্য ফেরাটা কঠিন যদি তামিম, সৌম্য, ইমরুল কেউ বাদ না যায়। তবে আমার বিশ্বাস নাফীস আবার ফিরবেন।

বিজয়ের সমস্যাটাও একই রকম, টপ অর্ডারে জায়গা ফাঁকা না থাকা। বিজয় কখনোই ১-৩ এর বাইরে খেলে নাই। সুতরাং এখানে ফাঁকা না পেলে সম্ভব না। তাছাড়া তার টেস্ট রেকর্ড ভালো না। তবে বয়স পড়ে আছে, ফেরার সম্ভাবনা প্রবল।

যাইহোক, আমার বিচারে কেউ যদি নাসির, বিজয়, নাফীসের অন্ধভক্ত না হয় তাহলে পাপনের সমালোচনা করার কারন দেখিনা আমি। আমার মতে সে একজন সফল সভাপতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত থাকতেই পারে।

কোন দেশের কোন বোর্ড সভাপতিই সবার মন যুগিয়ে চলতে পারেনি। তাছাড়া সবাইকে খুশি করা তার কাজনা।

তাছাড়া জিল্লুর রহমানের ছেলে, আবাহনী ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইত্যাদি কারনে সবারই তাকে মান্য করে। সম্মান করে। নতুন কেউ আসলে হয়তো তাকে এভাবে মান্য করবেনা। শেয়ার বাজার নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর লোটাস কামালের অবস্থা একটা হাস্যকর অবস্থায় ছিলো বিসিবিতে। আবার দূর্জয় যদি পরের প্রেসিডেন্ট হয় তাহলে কয়জন তাকে মানবে? ক্রিকেটের পাশাপাশি ক্রিকেটের রাজনীতির জ্ঞানটাও থাকতে হবে নাহয় ধরা খাবে পদে পদে।

এই এখন যারা নতুন প্লেয়ারদের নেয়ায় পাপনকে গালি দেয় তারাই আবার বলবে না পাপন ঠিক করেছিলেন, যখন এই নতুনরাই দলের হাল ধরবে। এটাই নিয়ম।

যাইহোক পাপনকে নিয়ে গঠনমূলক কোন কথা থাকলে শুনতে চাই। কেন ভালো লাগে বা কেন লাগেনা? ভবিষ্যৎ সভাপতি হিসেবে কাকে চান?

  • লেখক – Mazed Zohan Diaz
ম্যানিয়াক্স ডেস্ক
ক্রিকেট ভালোবাসি, কেননা বাংলাদেশকে ভালোবাসি।

Leave a Reply