জয়ের অনুপ্রেরণা চাই, চাপ নয়

বহু বছর পর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলতে গিয়েই বাজিমাত করেছে লাল সবুজের দল, টুর্নামেন্ট ফেভারিট অস্ট্রেলিয়া আর অধিকাংশ টুর্নামেন্টের ব্ল্যাক হর্স নিউজিল্যান্ডকে টপকে সেমিফাইনালে উঠে। সেমিতে প্রতিপক্ষ ভারত, যাদের সাথে সাম্প্রতিক ইতিহাসটা খুব সুন্দর নয়!

ভারত পাকিস্তান লড়াইটা বছর দুয়েক ধরে অস্তমিত, পাকিস্তানের অধঃপতনে ভারত এখন এক সময়ের বিশ্বের সবচেয়ে আগুন ঝরানো ম্যাচে কেমন ব্যবধানে জিতবে সেই হিসেব করে মাঠে নামে। আর এই একই সময়ে এশিয়ান পরাশক্তি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ; র‍্যাংকিং এ পাকিস্তান শ্রীলংকাকে পেছনে ফেলা তারই প্রমাণ। তাই এখন এশিয়ান মর্যাদার লড়াইটা সেই নীল সবুজই আছে, তবে এখনকার সবুজটা লাল সবুজ।

২০১৫ বিশ্বকাপের আগে পর্যন্ত ভারতের সাথে ক্রিকেট ময়দানে মোটামুটি সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কই ছিলো বাংলাদেশের। কিন্তু মেলবোর্নের কোয়ার্টার ফাইনালে আম্পায়ারদের বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং জায়ান্ট স্ক্রিনে ভারতকে উৎসাহ জাগানিয়া স্লোগানের পর থেকে সম্পর্কটা এখন সাপে-নেউলে সম্পর্কে বদলে গেছে। এরপর এশিয়া কাপ ফাইনাল ও টি২০ বিশ্বকাপে হারের পর সম্পর্কটা আর “সৌহার্দপূর্ণ” নেই, অন্তত দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে!

যাই হোক, ১৫ জুন এজবাস্টনের সেমিফাইনালের আগে, দুঃখিত হলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, ভারতই ফেভারিট। কারণটা আর কিছুই নয়, টিম ব্যালেন্স। বাংলাদেশ দলে টপ অর্ডারে এক তামিম ছাড়া রান পাচ্ছেন না কেউ, মুশফিকও গত দুই ম্যাচে ঠিক তার লেভেলে খেলেননি। সাকিব মাহমুদুল্লাহ ছন্দে আছেন, তবে যাই হোক, আবার টপ অর্ডার কলাপ্স করলে তারা আবার আগের ম্যাচের মত অতিমানবিক খেলে আবার দলকে জিতিয়ে ছাড়বেন, সেই কথা ভাবলে আপনি বোকামির সপ্তম স্বর্গে বাস করছেন। মোসাদ্দেককে নার্ভাস মনে হচ্ছে, মুস্তাফিজও ঠিক বল হাতে উইকেট বের করতে পারছেন না! কি মনে হচ্ছে? এই দল সেমিফাইনালে কিভাবে!!

খুব ভালোভাবেই, তামিম ছন্দে আছেন, সৌম্য আর সাব্বির দুজনই ক্লাসি ব্যাটসম্যান, তাদের জন্য রান করা কোন ব্যাপার না, মুশফিক তো আমাদের মি.ডিপেন্ডেবল, তার উপর ভরসা রাখা যায় সবসময়ই। সাকিব মাহমুদুল্লাহ দারুণ ছন্দে আছেন, মোসাদ্দেক তার মেধা দিয়ে ল্যাক অফ কনফিডেন্স দূর করতে পারেন, আর আমি বারবারই বলে আসি, অস্ট্রেলিয়ার পর আমাদের সম্মিলিত পেস ব্যাটারিই সেরা। এবার নিশ্চয়ই ভাবছেন, আরে ইন্ডিয়া তো এই দলের কাছে পাত্তাই পাবে না! তাই না?

সমস্যাটা হচ্ছে এই ভাবনাটাই। আমরা অনেকেই খুব উল্লাসে মত্ত, ভারতকে পাওয়া গেছে, এইবার ফাইনাল খেলবোই। জ্বি, আপনি অবশ্যই আশা করতে পারেন, আশা করাটা কখনই দোষ না। দোষটা হচ্ছে, আপনাদের এই আশাকে চাপ বানিয়ে দেওয়া! এখনই যে আমরা মাশরাফিদের চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে দিচ্ছি, এটা যে তাদের উপর নিদারুণ চাপ, তা কি আমরা কখনও ভাবি?

মাশরাফি তো একরকম বিরক্ত হয়ে বলেই দিলেন এখনই চ্যাম্পিয়ন না বানিয়ে দিতে! এই বিরক্তি আসাটাই কি স্বাভাবিক না? ২০১৫ কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ২০১৬ এশিয়া কাপ ফাইনাল থেকে এই যে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, আমরা আগেভাগেই জয়ী ঘোষণা করে দিচ্ছি! তারা তো মানুষ, তাদের উপর এসব কথা প্রভাব ফেলে তো নাকি!!

ক্রিকেট খেলাটা যতখানি না হাতের খেলা, তার চেয়ে অনেক বেশী মাথার খেলা! কিন্তু সেই মাথায়ই যখন আপনি বিশাল চাপের বোঝা নিয়ে নামবেন, তখন আপনার মাথা সেই বোঝা সামলাতে গিয়েই হয়রান হয়ে যাবে, সে এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু দূরে থাক, স্বাভাবিক কর্মকান্ডই করতে পারে না।

এটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ – দক্ষিণ আফ্রিকা! র‍্যাংকিং এ শীর্ষ দল, কিন্তু আইসিসি টুর্নামেন্ট এলেই, বিশেষ করে নক আউট ম্যাচগুলো এলেই কেমন যেন ছন্নছাড়া এই দল! যেই দলকে তারা অনায়াসে অন্য সময় হারায়, তাদের কাছেই অদ্ভুতভাবে হেরে বসে তারা! ফিল্ডিং এ তাদেরকে বিশ্বের সেরা দল বলা হলে অত্যুক্তি করা হবে না, অথচ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই তাদের ফিল্ডিং নেমে আসে সাধারণ পর্যায়ে, হাত ফসকে যায় একের পর এক ক্যাচ, সাথে ম্যাচটাও। কেন?

ওই যে, চাপ! তারা শুনতেই থাকে তারা চোক করে, চোক করবো না, চোক করা যাবে না, এই চাপটা যখন তাদের মাথায় চেপে বসে, তখন আসলে তাদের সাধারণ পারফরমেন্সটা তারা দিতে পারে না, ফলাফল আমরা প্রতিটা টুর্নামেন্টেই দেখি!

ঠিক এই জিনিসটা আমরাও আমাদের দলের সাথে করছি, তাদের আগেই জয়ী ঘোষণা করে। আমাকে আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে কি জয়ের আশা করবো না?

কেন করবেন না? অবশ্যই করবেন, হাজার বার করবেন। কিন্তু প্লিজ জয়ের আশা করার আগে ওদের জয়ী বলে রায় দিয়ে দিবেন না। দুটো আলাদা জিনিস। একটা ইচ্ছা, আরেকটা আদেশ! মানুষ অনুরোধ খুব খুশীমনে পূরণ করে, আদেশ জিনিসটা ঠিক মানতে পারে না!

জয় আমরা সবাইই চাই, আমাদের চেয়ে বেশী ওরা চায়, যারা মাঠে নামবে। তাই তারা দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে, আমাদের মত ভার্চুয়াল জগতে বসে টাইপ করে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেয় না, অথবা হারিয়ে দেওয়ার আগেই চেঁচামেচি করে না হারিয়ে দিয়েছি এই ভেবে!

জয়ের জন্য অনুপ্রেরণা দিন, চাপ নয়।
মাঠে যখন তারা নামবে, জয়ের জন্যই।

আশা করি,
দেখা হবে বিজয়ে!

Leave a Reply