ওয়েলিংটন টেষ্ট থাকবে প্রেরণা হয়ে

দুই বছর পর বাংলাদেশ ঘরের বাইরে, বলা ভালো মিরপুরের বাইরে ক্রিকেট খেলতে গেলো। ২২ জন ক্রিকেটার নিয়ে দল আগেভাগে অস্ট্রেলিয়াতে ক্যাম্প করলো। নিউজিল্যান্ড এর কন্ডিশনের মূল উপাদান যেখানে বাতাস সেখানে ক্যাম্পটা কতোটা কাজে দিলো প্রশ্নটা থেকেই যায়।
ওয়ানডে আর টি টিটুয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশের প্রতিটা ম্যাচেই মোমেন্টাম পাওয়াটা প্রাপ্তি আর বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিককে হারানোটা আফসোস। তবে বেসিন রিজার্ভে প্রথম টেষ্টে সকল হতাশাকে বাংলাদেশ পেছনে ফেলে আসতে পেরেছে বলেই আমি অন্তত বিশ্বাস করি, অপ্রত্যাশিত হারটার ক্ষত বুকে নিয়েই বলছি।

তৃতীয় দিন, এমনকি চতুর্থ দিন শেষেও এই টেষ্টের নিয়তি ছিলো ড্র, অলৌকিক কিছু না হলে এই টেষ্ট ড্র হবে। অলৌকিক না হলেও একেবারে অপ্রত্যাশিত কিছু হয়েছে বলেই তো হাতের মুঠো থেকে টেষ্ট ম্যাচটা বেরিয়ে গেলো। রচিত হলো আরেকটি আফসোসের গল্প, সাথে গৌরবের ও কি নয়?

ওয়েলিংটনে সাকিব – মুশফিকের ধ্রুপদী ঝুটির বিশ্বরেকর্ড এদেশের ক্রিকেট প্রেমীদের মনে থাকবে অনেক দিন। সাকিবের ডাবল আর মুশফিকুর রহিমের দেড়শ রানের ইনিংস দুটি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে সাদা ক্রিকেটের পোশাকে। আবার একই সাথে সবচেয়ে বেশী রান করে টেষ্ট হেরে যাওয়া তালিকায় শত বছর পর অজিদের হটিয়ে শীর্ষে উঠার টেষ্ট হিসেবেও ওয়েলিংটন মনে থাকবে। যতোবার মনে পড়বে, ততবার আপনি গর্বিত হবেন।
কেননা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে লাল সবুজ পতাকা সামনে রেখে জীবন বাজি রাখার উদাহরণ আপনাকে গর্বিত করবেই।
দেড়শত রানের ইনিংসটি খেলার মাঝপথেই অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম আঙুল ভেঙেছেন। তারপর আর কিপিং গ্লাভস টা পড়তে পারেননি। এই টেষ্টের টার্নিং পয়েন্ট এটাই। মুশফিক না থাকায় খুলনা টেষ্টে বদলি হিসেবে কিপিং করার অভিজ্ঞতা নিয়ে নেমে পড়লেন ইমরুল কায়েস। অতিরিক্ত ঘামেন বলে হ্যামস্ট্রিং আর ক্র‍্যাম্প করার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। দেড়শ ওভারের মতো কিপিং করেছেন, বারবার উঠতে বসতে হয়েছে তাকে, যার চর্চাটা একেবারেই নেই কায়েসের।

তারপরেও কায়েসকে ওপেনিং এ না পাঠালে ভালো হতো এই কথা আমরা বলেই যাবো, তবে টিম মেনেজমেন্ট ভেবেছে দিনের শেষ সেশনইতো, ইমরুল হয়তো পারবেন। একটা রান আউট ঠেকাতে গিয়ে যে লুটিয়ে পড়লেন আর দাঁড়াতে পারলেননা। এম্বুলেন্স হয়েছে মাঠ ছাড়ার সাথী।

বেসিন রিজার্ভে এম্বুলেন্স ঢুকেছে দুই ধপা। আরেকবার অচেতন মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে যেতে। ভেঙে যাওয়া আঙুল নিয়ে মুশফিককে নামতে হয়েছিলো সাব্বিরকে সাপোর্ট দিতে। কেননা এই টেষ্ট বাঁচাতে অন্তত দেড় সেশন ব্যাট করা জরুরী ছিলো, আর লিডটাকেও আড়াইশো ছাড়াতে হবে। কিন্তু দুটো থেকেই বাংলাদেশ অনেক দূরে। মুশফিক নেমেছেন আর কিউই পেসাররা বডি লাইন বরাবর একের পর এক বাউন্সার ছুড়ে গেছেন। বলা ভালো মুশফিকের আহত জায়গা লক্ষ্য করে। সেটা ক্রিকেটীয় স্পিরিটের সাথে কতটুক যায় সেই বিতর্ক হতেই পারে, তবে মুশফিক একবারের জন্য ও ক্যাচ তুলে দেয়ার মতো খেলেননি, জীবন গেলেও না। তেমনই এক বাউন্সারে আঙুল নয় মাথায় আঘাত পেয়ে, দেশের জন্য লড়তে লড়তে অচেতন হয়ে এম্বুলেন্সে উঠেছেন।

তারপর ইমরুল কায়েস যখন খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠে নামেন তখন হারের ভয় নয়, গর্ব হয়। প্রথম বলেই বাউন্সার লিভ করতে গিয়ে যখন ইমরুল বসে আবার উঠতে গিয়ে লুটিয়ে পড়েন তখন নোনাজল চোখের কোনে জমা হয়। তারপরেও প্রফেশনাল কিউই পেসারদের বাউন্সারগুলোকে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থেকে যখন তিন তিন বার বাউন্ডারি লাইন পার করেন, তখন প্রথম ইনিংসের লিডটা আরেকটু বড় করতে না পারার আফসোস, দ্বিতীয় ইনিংসে সাকিব, মিরাজের উইকেটের আফসোস পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ম্যাচটা ওখানেই জিতে গেছে।

এই লড়াকু মানসিকতটা অনেক দিন উদাহরণ হয়ে থাকবে আর অজস্র বিজয় উপহার দেবে।

Leave a Reply